স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল

  • 07 Apr
  • 06:56 PM

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 07 Apr, 21

স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে মন ভালো থাকে না। আর মন ভাল না থাকলে কোন কাজই সঠিকভাবে করা হয়ে ওঠে না। তাই যেকোনো কাজের পূর্বশর্ত হলো স্বাস্থ্য ভালো রাখা। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী স্বাস্থ্য বলতে বোঝায় শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক কল্যাণবোধ। শুধু  দুর্বলতার অনুপস্থিতিকে স্বাস্থ্য বলে না। আবার ১৯৮৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সংজ্ঞা পরিবর্তন করে বলে স্বাস্থ্য দৈনন্দিক জীবনে একটি সম্পদ। এটা বেঁচে থাকার কোনো উদ্দেশ্য নয়। সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে স্বাস্থ্য একটি ইতিবাচক ধারণা যা শারীরিক ক্ষমতা অর্জনের উদ্ভুদ্ধ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় স্বাস্থ্য বলতে কেবল মাত্র রোগ বালাই থেকে মুক্তি নয়। এখন স্বাস্থ্য বলতে বোঝায় সব ধরনের বাধা বিপত্তি কাটিয়ে উঠে সুন্দরভাবে শারীর ও মন পরিচালনা করা। স্বাস্থ্য বলতে আধুনিক সময়ে এসে সব রকমের বাধা বিপত্তি কাটিয়ে ওঠা বোঝালেও একজন ব্যক্তির অবস্থান তার স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। একজন রোগব্যাধি সম্পূর্ণ মানুষের অনেক সম্পদ থাকলেও তার অবস্থান সমাজের অনেক নিচে। আধুনিক যুগে বিভিন্ন রোগব্যাধি নানারকম চিকিৎসা বের হয়েছে এবং মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই স্বাস্থ্য বলতে এখন শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি নতুন নতুন বাধা-বিপত্তি এবং দূর্বলতা সাথে খাপ খাইয়ে সুস্থভাবে জীবনযাপন কে বোঝায়।

স্বাস্থ্য যেহেতু শরীর ও মনের সাথে জড়িত তাই স্বাস্থ্য কে আমরা দু'ভাবে দেখতে পারি। একটি শারীরিক স্বাস্থ্য অপরটি মানসিক স্বাস্থ্য। শারীরিক স্বাস্থ্য বলতে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে সঠিকভাবে কাজ করাকে বুঝায়। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তের সুস্থতা জরুরি। তাই আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুস্থ রাখতে পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম ও বিশ্রামের প্রয়োজন। এছাড়াও কিছু স্বাস্থ্যবিধি আছে যেগুলো সঠিকভাবে মেনে চললে স্বাস্থ্য ঠিক রাখার সম্ভব। একজন মানুষকে শারীরিকভাবে সুস্থতার পাশাপাশি মানসিকভাবেও সুস্থ রাখা জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্য বলতে একজন মানুষের আবেগিক, সামাজিক ও মানসিক সুস্থতা কে বোঝায়। শারীরিক সুস্থতা মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর নির্ভর করলেও মানসিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে মানুষের নিজের উপর। মানুষ নিজেকে হাসিখুশি, মানসিক চাপ থেকে মুক্তি ও মানসিক দুর্বলতা কাটিয়ে তোলার মাধ্যমে নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে পারে। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব না হলে নিজেকে সুখী রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে গড়ে তোলা হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্ষতবিক্ষত মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার তাগিদে ১৯৪৬ সালে নিউইয়র্কে ৬ টি দেশের প্রতিনিধি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় জুন-জুলাইয়ের দিকে। ২২-শে জুলাই সংস্থাটির গঠনতন্ত্র স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের ৭-ই এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গঠিত হয়। ১৯৫০ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য  সংস্থা নিয়মিতভাবে ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল উদ্দেশ্য জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে প্রচার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তর অবস্থিত সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সংক্রামক ব্যাধি নির্মূল, স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, স্বাস্থ্য শিক্ষা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য উন্নয়ন, গবেষণা, স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন, স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টি, মহামারি প্রতিরোধ, শিশুর রোগ প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিরোধ ইত্যাদি লক্ষ্য বাস্তবায়নে শুরু থেকে কাজ করে আসছে।

বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকা অপরিসীম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ করে থাকে। এর মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস অন্যতম এবং এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্ব যক্ষা দিবস, রোগপ্রতিরোধ সপ্তাহ বিশ্ব, ম্যালেরিয়া দিবস, বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস, বিশ্ব রক্তদাতা দিবস, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ও বিশ্ব এইডস দিবস প্রতিটি মানুষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। মূলত দিবসগুলো উদযাপনের মাধ্যমে জনসাধারণ বিষয়গুলি সম্পর্কে অবগত হয় এবং কি কি সচেতনতা গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়ে জানতে পারে। এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমস্ত বিশ্বের মানুষের স্বাস্থ্যের পরিসংখ্যান সরবরাহ করে। যেখান থেকে অসম্পূর্ণ কাজ এবং ব্যর্থতা জায়গাগুলো দৃষ্টিগোচর হয়। এর ফলে আরো যথোপযুক্তভাবে সংস্থাটি জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কাজ করতে পারে। ১৯৪৮ সালে সংস্থাটি গঠিত হওয়ার পর থেকে নজিরবিহীন সাফল্য দেখিয়েছে এবং নেতৃত্ব স্থানীয় ভূমিকা রেখেছে। গুটিবসন্ত, পোলিও ভ্যাকসিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবদান অপরিসীম।

বর্তমানে সংক্রামক রোগ নিয়ে বিশেষ করে এইচআইভি, ম্যালেরিয়া,ইবোলা,যক্ষা এবং ক্যান্সারের ও হৃদরোগ এর মতো অসংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরু থেকে এ পর্যন্ত বড় বড় চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়েছে এবং সফলতার মুখ দেখতে সক্ষম হয়েছে। জনগণের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সংস্থাটি বদ্ধপরিকর আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে আশা করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য রক্ষা করা সংস্থাটির প্রধান কাজ হলেও বর্তমানে করোনা ভাইরাস সাধারণ মানুষসহ সংস্থাটিকে করেছে আশাহত। ২০২০ সালে শুরু হওয়া করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এ জনস্বাস্থ্য এখন হুমকির মুখে। ভাইরাসটি ইতোমধ্যে কেড়ে নিয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ বিশ্বজুড়ে আক্রান্ত করেছে কোটি কোটি মানুষকে। এমতাবস্থায় মানব স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে। ২০২১ এ এসেও যখন করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় আসার কোনো লক্ষণ নেই তখন মানুষ নিমজ্জিত হচ্ছে হতাশা। আর হতাশা থেকে দেখা দিচ্ছে স্বাস্থ্য সংকট। দীর্ঘ মেয়াদী করোনা পরিস্থিতিতে যখন করোনা রোগী দিয়ে হাসপাতাল ভর্তি ঠিক সে সময়ে সাধারণ  চিকিৎসার জন্য মানুষ ঠাই পাচ্ছে না হাসপাতালে। আক্রান্তের সংখ্যায় সাধারণ মানুষ প্রহর গুনছে কবে মুক্তি পাবে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে। কিন্তু এদিকে সব আশার আলো নিভিয়ে দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা  রয়টার্সের প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানান দেয় প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস হয়তো কখনোই পৃথিবী থেকে চিরতরে যাবেনা। এবং সংস্থাটি সতর্ক করে আরো বলেছেন এইচআইভির মতো ভাইরাসটি স্থায়ী হতে পারে। আরো বলেছে বিশ্বজুড়ে সব মানুষকে এটির সাথে লড়াই করে বাচতে হবে। এর আগে আরো পাঁচবার সংস্থাটি জিকা,ইবোলা,পোলিও,সোয়াইনফ্লু নিয়ে জরুরী অবস্থা জারি করেছিলো। কিন্তু সংস্থাটির মতে এতোসব ব্যাধির মধ্যে করোনা ভাইরাস সবচেয়ে মারাত্মক। পূর্বে যেহেতু সংস্থাটির নজিরবিহীন সাফল্য রয়েছে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তাই ৭-ই মার্চের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে সংস্থাটির কাছে আমাদের প্রত্যয় থাকবে করোনা ভাইরাসের মোকাবিলা করে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা।

লেখক: রুকাইয়া মাহজাবিন
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।