কান্তজির এবং নয়াবাদ মসজিদে স্বর্ণালী বিকেল

  • 09 Jan
  • 12:11 PM

আব্দুল্লাহ আল মামুন 09 Jan, 21

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারী কিংবা মার্চে কোন এক কাজে কয়েকদিনের জন্য দিনাজপুর শহরে যেতে হয়েছিলো। থাকুক না সে কথা। দিনাজপুর জেলাটার সাথে জীবনানন্দের রুপসী বাংলার মাঝে খুব মিল রয়েছে, আমি বোধ হয় সেদিনই জীবনানন্দকে বাস্তবে উপলব্ধি করেছিলাম। যখন শীত দেশ থেকে প্রায় বিদায় নেবে নেবে ভাব, যেকোন সময় ভৌদৌড় দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মহুর্ত।

দিনাজপুর শহর পেরিয়ে বিশমাইল, সেখান থেকে অটোযোগে চলে গেলাম কাহারোলের তেভাগা চত্ত্বরে। তিন রাস্তার মোড়ে ইলা মিত্রের তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত সেই ফলক দাড়িয়ে রয়েছে। চারদিকে বিস্তৃত সবুজের লুকোচুরি, তার মাঝ দিয়ে অজগর সাপের মতো পেঁচিয়ে রাস্তা চলে গেছে সামনে যত দূর দৃষ্টি যায়।

অজানা, অচেনা জায়গা, চারপাশে দোকানগুলি যেন আমার দিকে অবাক তাকিয়ে রয়েছে অবাক দৃষ্টিতে। লোকমুখে অনেক গল্প শুনেছি কান্তজির মন্দিরের। আজকে বাস্তবিকই আমি এসে উপস্থিত হলাম কান্তনগরে। মনের মাঝে সুপ্ত বাসনা বিখ্যাত কান্তজির মন্দিরটা দেখার। আজ তার সাক্ষী হতেই এতদূর ছুটে আসা।

আমাকে সব কিছু ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন লিখন দা। লিখন দা'র সাথে এই প্রথম দেখা হলো, এর আগে অবশ্য তার সাথে ফেইসবুকেই পরিচয় হয়েছিলো।

তেভাগা চত্ত্বর থেকে সোজা পশ্চিম দিকে ঢেপা নদী পেরিয়ে মিনিট দশেক হেঁটে পৌছে গেলাম কান্তজির মন্দিরে। চারপাশে বিশাল আকৃতির বট গাছের নীচে বার্ষিক মেলা বসার জন্য রয়েছে বিস্তৃত প্রান্তর। একটু ভেতরের দিকে প্রবেশ করতেই দেখা মিললো শত বছর ধরে দাড়িয়ে থাকা সেই কান্তজির মন্দিরের।

প্রবেশ করেই দেখা মিললো দর্শনার্থীদের। মন্দিরের সামনেই একটা চিনামাটির ফলকে লেখা আছে এর ইতিহাস ঐতিহ্যের সংক্ষিপ্ত তালিকা। পোড়ামাটির তৈরী কান্তজির যেন এভাবেই যুগ যুগ ধরে দর্শনার্থীদের মনের খোরাক মেটাতে দাড়িয়ে রয়েছে নিজ ঐতিহ্যে।

মন্দিরের উত্তর পাশটায় পতিত জমিতে পড়ে রয়েছে পরিত্যক্ত মন্দিরের অংশ বিশেষ। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে সেটিও নাকি কান্তজির মন্দিরেরই একটা অংশ!

মন্দির দেখার এক পর্যায়ে লিখন দা হঠাৎ বলে উঠলেন, 'কিরে মামুন! চলো নয়াবাদ মসজিদ দেখে আসি। সেটিও সমসাময়িক সময়েরই সৃষ্টি।'
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আজ কি সম্ভব নয়াবাদ যাওয়া?
লিখন দা আরেকটু অবাক করে দিয়ে বলে উঠলেন, আরে হেটে যেতে বিশ মিনিট লাগবে চলো।

কালক্ষেপণ না করে রওনা দিলাম নয়াবাদ মসজিদের উদ্দেশ্যে। সেখানে যাওয়ার সময় পথের চারপাশে দাড়িয়ে থাকা বিস্তৃত লিচু বাগান যেন আমাকে আজও পিছু টানে। খোলামেলা প্রাঙ্গনে সবুজের লুকোচুরি খেলা। তার মাঝ দিয়ে মেঠোপথ চলে গিয়েছে নয়াবাদ মসজিদ পর্যন্ত। সবুজ ফসলি মাঠ পেরিয়ে কখন যে নয়াবাদ মসজিদের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলাম বুঝতেই পারলাম না।

শ্যাওলা পরা দেয়াল আর গম্বুজ তিনটা তার শত বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে দাড়িয়ে থেকে আগন্তুকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।
মসজিদটিকে দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না, অনেক পুরনো কারুকার্যে রচিত এর ভিত্তিপ্রস্তর।

চারপাশে হালকা উচু বাউন্ডারি, এবং গেটে দাড়ানো দু'পাশে দুটি নারিকেল গাছে যেন মসজিদের শোভা বর্ধনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। শতবর্ষ ধরে দিনাজপুরকে অনন্য করে রেখেছে এইসব ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলে।

সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ফিরে যাওয়ার তাগিদে আবার সেই ঢেপা নদীর তীর ধরে চলে এলাম তেভাগা চত্ত্বরে।

লিখন দা চলে গেলেন তার গন্তব্যে আর আমি ফিরে এলাম দিনাজপুর শহরে। স্মৃতিপটে রয়ে যাবে আজীবন কান্তজির মন্দির। হাজারবার পিছু টানবে ঐতিহ্যের সাক্ষী নয়াবাদ মসজিদ।