'স্বপ্ন তাদের অনেক বড় হওয়ার'

  • 15 Mar
  • 08:38 PM

ইসমাত জাহান জিনিয়া,রাবি প্রতিনিধি 15 Mar, 20

কষ্ট গুলোকে বুকের ভিতর লালন করেই বেড়ে উঠছে তারা। স্বপ্ন তাদের অনেক বড় হওয়ার। তাই তাদের স্বপ্নের ধারগুলো আরো মসৃন করতে পরিশ্রম করে চলেছেন কিছু মানবিক মানুষ।
“মা গো, তোমায় ছাড়া ঘুম আসে না মা। আজ তোমার কোলে মাথা রেখে বড্ডো ঘুমোতে ইচ্ছে করে। আজ তুমি নেই বলে কেউ আর আদর করে খাইয়ে দেয় না।”- এক বুক শুন্যতা নিয়ে নিরীহ নয়নে এভাবেই তাকিয়ে আছে মেয়েটি। কষ্ট গুলোকে এভাবেই ক্লান্ত চোখের ইশারায় প্রকাশ করার চেষ্টায় সে ভাবছে, এই অসুস্থ্যতায় মা থাকলে হয়তো পরম যত্নের সাথে মলম লাগিয়ে দিতেন। হয়তো সারারাত জেগে তার সেবা করতেন।
জ্বরে কাতরাচ্ছে মা হারা ছয় বছরের ছোট্ট সুমাইয়া। বিছানার চারপাশে তার সমবয়সী আরো অনেক মেয়েরা তাকে ঘিরে বসে আছে। ডাক্তার ওষুধ দিয়েছেন। সবাই তার মনে শক্তি যোগাচ্ছে যে সে দ্রুতই সুস্থ্য হয়ে উঠবে। কিন্তু তারপরেও কোথায় যেন কি নেই। চারিদিকটা বড় শুন্যতায় ছেয়ে গেছে। সুস্থতা ফিরে এলেও মা বাবা তো আর ফিরে আসবে না। পৃথীবির সমস্ত সুখ এনে দিলেও এই শুন্যতা, এই অভাব বোধ কখনোই পুরন হবে না।
কারো বাবা নেই, কারো মা নেই, কারো বা আবার কেউই নেই এই পৃথিবীতে। মা বাবার এই তীব্র অভাব বোধ নিয়েই বেড়ে উঠছে দাওয়াতুল ইসলাম এতিম খানার ৩১ জন শিশু। মাত্র চারশতক জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রাজশাহী জেলার মতিহার থানার বিনোদপুরে অবস্থিত এই এতিম খানা শুধুমাত্র মেয়ে শিশুদের জন্য নির্মিত।
এতিম খানার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক দম্পতি সাইফুল ইসলাম ও সখিনা বেগম আনুষ্ঠানিক ভাবে ২০১৩ সাল থেকে এই এতিমখানার কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৩ সালে ২০ জন কে নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে মোট ৩১ জন শিশু এখানে থাকছে। পাঁচ বছর বয়স থেকে এখানে মেয়েদেরকে ভর্তি নেওয়া হয়। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মীত এই এতিমখানার শিশুদের ভরোন পোষনের কাজ চলে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি বর্গের অনুদানে।
সাইফুল ইসলাম পেশায় ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা এবং তার স্ত্রী একজন গৃহিণী। সাইফুল ইসলাম বলেন,“এতিম শিশুদের জন্য একটি এতিমখানা তৈরির পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই ছিলো। ওরা এখানে থাকছে, পড়াশুনা করছে। আমি চাই ওরা একদিন বড় হবে। মানুষের মত মানুষ হবে। হয়তো আমি ওদের মা বাবাকে ফিরিয়ে দিতে পারব না কিন্তু একটা ভালো পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করবো। যাতে করে ওদের মুখে একটু হলেও হাসি ফোটাতে পারি। ওদের মুখের হাসি দেখে সমস্ত দুঃখ ভুলে যাই। ওদের সাথে প্রতিদনই দেখা করতে যাই। ছোট দের ক্লাসও নেই।”
পৃথীবিতে সব থেকে সুন্দর জিনিসটি হচ্ছে শিশুদের মুখের হাসি। তাদের হাসিতে থাকে না কোন কুটিলতা। থাকে না কোন জটিলতা। তাদের অমায়িক হাসি দেখে যে কারো মন ভালো হয়ে যাবে এক নিমিষেই। এই হাসিগুলোকেই আরো প্রাণবন্ত করতেই নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এই দম্পতি।
বাস্তবতা বড়ই কঠিন। আর তার চেয়েও কঠিন এই পৃথীবির নিয়ম। নানা প্রতিকুলতায় বেড়ে ওঠা এসব শিশুরা বড় হয়ে যেন নিজেদের কাজের ব্যবস্থা নিজেরাই করতে পারে সেজন্য তাদের কারিগরী শিক্ষা দেওয়া হয়। সপ্তাহে তিনদিন তাদের সেলাইয়ের কাজ, কম্পিউটারের কাজ, ক্র্যাফটরে কাজ এছাড়াও আগ্রহ অনুযায়ী কিছু সৃজনশীল কাজ শেখানো হয়।
সখিনা বেগম জানান, “ তাদের বেশির ভাগের মা বাবা নেই। জীবীকার তাগিদে কোথাও যেন তাদের ঠকতে না হয় তাই তাদের কথা চিন্তা করেই এই প্রশিক্ষণের উদ্যোগ। প্রশিক্ষণের কাজ আমি আর আমার ছোট মেয়ে তাসলিমা মিলেই করিয়ে থাকি। এতিমখানার ঠিক পাশেই দাওয়াতুল ইসলাম ট্রাস্টের একটি কক্ষে ১৯ টি সেলাই মেশিনে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নানা রকম সৌখিন কাজ সেখানো হয়। ১২ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের এ কাজ শেখানো হয়।”
দশ বছর বয়সী মণি। তাকে জিজ্ঞাস করা হলো তার কোথায় থাকতে বেশি ভালো লাগে। উত্তরে সে বলল, “ আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাই এতিমখানাতেই ভালো লাগে। বাবাকে কখনো দেখিনি, মায়ের চেহারাও তেমন মনে নেই, শুনেছি আমার খালা আমাকে এখানে রেখে গিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে খালার বাড়িতে যাই। কিন্তু এখানে থাকতেই আমার বেশি ভালো লাগে।”
বছরে দুই ঈদের ছুটিতে তাদের কেউ কেউ বাড়িতে যায় মা অথবা বাবার সাথে ঈদ করতে কিন্তু যাদের মা বাবা কেউ নেই, যাওয়ার মতো কোন বাড়ি নেই তারা ছুটিতে এখানেই রয়ে যায়। এই আপনালয়েই তারা একে অপরের সুখ দুঃখের সাথি হয়ে রয়ে যায়। কাটিয়ে দেয় ঈদের ছুটিগুলো।
এতিমখানায় মেয়েদের দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন চারজন গৃহ শিক্ষিকা। তারা প্রতি সপ্তাহে পালাক্রমে এই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। রান্নার জন্য দুজন খালা রয়েছেন। গৃহশিক্ষিকা জরিনা বানু বলেন,“ একদম ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই মেয়েদের আরবি শিক্ষা দেওয়া হয়। ছোটদের কায়দা বই আর বড়দের আমপাড়া কিংবা কোরআন পড়ানো হয়। আমিই মূলত তাদের ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে থাকি।”
সকালের নাস্তা করেই সাড়ে সাতটা থেকে শিশু থেকে চতুর্থ শ্রেণীর মেয়েরা এতিমখানা মাদ্রাসার শ্রেণীকক্ষে বসে পরে। তারপর আবার সাড়ে আটটার সময় পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণীর পাঠদান শুরু করা হয়। আটটি শ্রেণীকক্ষ বিশিষ্ট এতিমখানা মাদ্রাসায় রয়েছে আটজন শিক্ষিকা। তারা নিয়মিত পাঠদান করে থাকেন। জরিনা বানু আরো জানান,“ মেয়েদের শিক্ষার মান উন্নত করতে তাদের জন্য প্রাইভেট টিউটরেরও ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিন চারটায় দুজন শিক্ষিকা এসে সবাইকে পড়ান। দশজন শিশু থেকে চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী আর ২১জন পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণীর। তাদের দুই কক্ষবিশিষ্ট শোবার ঘরে মোট ২৭টি খাট আছে। গৃহ শিক্ষিকাদের থাকার ব্যবস্থা আছে আলাদা ভাবে।”
অসহায়, দরিদ্র এসব শিশুদের জীবনে এই এতিমখানাই তাদের একমাত্র নিজের ঠিকানা । অকালেই যেন তারা ঝরে না পরে, তাদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, শত কষ্টের মাঝেও তাদের মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তোলর জন্য তাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে এতিমখানা কর্তৃপক্ষ। ওরা যেন আর দশটা শিশুর মতই মাথা উঁচু করে সমাজে বড় হতে পারে সেজন্যই এই নিরলস প্রচেষ্টা।