‘সফলদের অনুসরণ করতে হবে, অনুকরণ নয়’

  • 22 July
  • 11:43 AM

ইফতেখার ইসলাম তুষার 22 July, 20

ছোটবেলা থেকেই বাসায় পড়ালেখার অনুকূল পরিবেশ পেয়েই বড় হয়েছি। বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হওয়ার সুবাদে আমার পড়াশুনা তদারকির দায়িত্ব ছিল তাঁরই। যখনই আপু বাসায় থাকতো আমার সব দুষ্টামি বন্ধ হয়ে যেতো, আর পড়ার টেবিলেই তখন বেশি সময় কাটতো।

ক্লাস ৪ এর শেষদিকে কুমিল্লা জিলা স্কুলে ভর্তির জন্য আমাকে সামসুল হক স্যারের কাছে কোচিংয়ে দেয়া হল। তখনই প্রথম নিজ স্কুলের বাইরের জগতটা দেখা। বিভিন্ন স্কুল থেকে আসা বন্ধুদের সাথে পরিচয়। ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে যা টেনশন সব আমার বাবা-মায়েরই ছিল। আর আমি অপেক্ষায় ছিলাম পড়াশুনার এই তীব্র চাপ থেকে মুক্তির! যাই হোক, রেজাল্টের পর দেখলাম আমার বন্ধুরা সব প্রথম দিকে আর আমি ৫০তম। স্বাভাবিকভাবেই আমারও ইচ্ছা হলো তাদের মতোই সামনের সারিতে যাওয়ার। আর তখন থেকেই পুরনো ‘পড়াশোনার চাপ থেকে মুক্তির আশা’ ছেড়ে দিয়ে উল্টো পড়াশোনার প্রতি আরো ভালোভাবে মনোযোগ দেওয়া শুরু করি। এরই ধারাবাহিকতায় ক্লাস ফাইভ ও এইটে টেলেন্টপুলে বৃত্তি এবং বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম/দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি।

ধর্মসাগরের পাড়ে অবস্থিত কুমিল্লা তথা বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কুমিল্লা জিলা স্কুল। অসংখ্য দেশবরেণ্য মেধাবীর পদচারনায় মুখর প্রায় দুইশত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলের নির্মল বায়ুতে রয়েছে কিশোরদের মেধা অঙ্কুরে বিকশিত হবার সুবর্ণ সুযোগ। সত্যিই এই স্কুলে পড়ার সুযোগ লাভে আমি ধন্য এবং গর্বিত। স্কুল জীবনে পেয়েছি নাঈম স্যার, শহিদুল্লাহ স্যার, কামরুজামান স্যার, গোলাম মোস্তফা স্যার, হাফিজ স্যার, শাহজাহান স্যার, চমন আরা আপা, মুহসিনা আপা সহ অসংখ্য গুণী শিক্ষকদের, যাদের কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। কেননা, আমার শিক্ষাজীবনের শেকড় যে এখানেই রচিত!

স্কুলজীবন শেষে ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হই। তখন ফিজিক্স পড়তে খুব ভালো লাগতো কিন্তু বায়োলজিতে তেমন আগ্রহ পেতাম না। আর ঠিক একারণেই সেসময় মনস্থির করে ফেলি ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার। এজন্যে মেডিকেলে আর ভর্তি পরীক্ষা দেয়া হয়নি।

বুয়েটে যাওয়ার পর আমার জীবনটা অন্যরকম হয়ে যায়। এখানে সবাই প্রচন্ড মেধাবী, পাশাপাশি সবাই ছিল নিজেদের স্কুলের ফার্স্ট-সেকেন্ড বয়। যাই হোক, বুয়েটের পাঁচ বছরের শিক্ষা জীবনে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি প্রসারিত হয়। বুয়েট থেকে বের হবার পর দেখলাম, নিজের যা রেজাল্ট তাতে শিক্ষকতা ছাড়া বাকি সব কিছুতেই মোটামুটি চেষ্টা করা যায়। পরিবারের কাছাকাছি থাকার জন্য সিদ্ধান্ত নিলাম, বিদেশে যাবো না। আর আমাদের দেশেই এখন প্রকৌশলীদের জন্য অসংখ্য চাকরীর সুযোগ রয়েছে। একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দেশের বড় বড় ব্রিজ কিংবা হাইওয়ে প্রোজেক্টে কাজ করার ইচ্ছা ছিল আগে থেকেই। কিন্তু দেখলাম এই ধরণের সুযোগ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসে তুলনামূলকভাবে বেশি। আমিও ভাবলাম, চেষ্টা করে দেখি ক্যাডার হতে পারি কিনা!

বিসিএসের পড়া শুরু করে বুঝলাম, এ এক অন্যরকম পরীক্ষা! এখানে মেধার সাথে সাথে প্রচুর ধৈর্যের প্রয়োজন। ধৈর্য ধরে এর পেছনে প্রায় তিন বছর লেগে ছিলাম। প্রথম প্রথম বন্ধুদের অন্য চাকরীতে যাওয়া দেখে একটু হতাশা কাজ করলেও আমি জানতাম, আমি কি চাই। তাই কখনও হাল ছাড়িনি। বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা দেয়ার পরে ভাইভার জন্য তেমন পড়া লাগে না। তাই চিন্তায় ছিলাম সময় কী করে কাটাবো। সৌভাগ্যক্রমে তখনই রেলওয়ে থেকে ‘পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে’ যোগদানের চিঠি আসে। তাই লিখিত পরীক্ষা দিয়েই এখানে যোগদান করি এবং বর্তমানে এখানেই কর্মরত আছি। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে দেশের মানুষের কল্যাণে এভাবেই আমি অবদান রাখতে চাই।

প্রকৌশল পেশাটাকে ভালবেসেই ক্যাডার চয়েজে প্রশাসন, পুলিশের আগে সড়ক ও জনপথ এবং গণপূর্ত কে রেখেছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, হতাশ হতে হয়নি। জীবনের প্রথম বিসিএস পরীক্ষাতেই সড়ক ও জনপথে দ্বিতীয় স্থান লাভ করি। সরকারী কর্ম কমিশনে এখন পর্যন্ত ২ টি বিসিএস ও ৩ টি নন ক্যাডার ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় অংশ নেই। আলহামদুলিল্লাহ কোনটিতেই আটকাতে হয়নি। এই জীবনে আজ পর্যন্ত যা কিছু ক্ষুদ্র অর্জন তা থেকে একটা শিক্ষাই পেয়েছি - লক্ষ্যে অবিচল থেকে লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় থাকলে দেরিতে হলেও বিজয় সুনিশ্চিত।

অনুজদের প্রতি উপদেশ থাকবে সফলদের অনুসরণ করার, অনুকরণ নয়। তুমি নিজে যা পড়তে ভালবাসো কিংবা যে পেশায় যেতে চাও, সেখানেই যাওয়ার চেষ্টা করো। ‘সবাই যাচ্ছে, তাই আমিও যাবো’ এমন মানসিকতা যেন না থাকে। তাহলেই জীবন অনেকখানি উপভোগ্য হয়ে উঠবে। নিজের পেশার প্রতি সম্মান এবং আবেগ কাজ করাটা খুব জরুরী। আর সবসময় চেষ্টা করবে মানুষের সাথে হাসিমুখে ভালোভাবে কথা বলতে কারণ দিন শেষে মানুষ তোমার কাজ থেকে ব্যবহারটাকেই বেশি মনে রাখবে।"