পরকীয়ার জেরে নিজ সন্তানদের বিষ প্রয়োগে হত্যা

  • 02 Dec
  • 11:56 AM

ডেস্ক নিউজ 02 Dec, 20

পরকীয়ার জেরে নিজ সন্তানকে বিষ খাওয়ায়ে হত্যা করলো মা। নিষ্ঠুর পৃথিবীতে সবাই যেনো একেকজন দজ্জাল রুপী ভয়ংকর পিশাচ।
জানা যায়,গত ১৫ বছর পূর্বে হবিগঞ্জ জেলার রাজিউরা ইউনিয়নের চারিনাও গ্রামের মেয়ে মোছাঃ ফাহিমা আক্তার এর বিয়ে হয় মোঃ সিরাজুল ইসলাম এর সাথে। তাদের সংসারে আলোকিত করে আসে ১ম পুত্র সন্তান মোঃ তোফাজ্জল হোসেন। ভালোই চলছিল তাদের সুখের সংসার। এরই মধ্যে তাদের সংসারে আসে জমজ সন্তান মোঃ রবিউল ইসলাম সূর্য এবং মেয়ে সাথী আক্তার। মোছাঃ ফাহিমা আক্তারের স্বামী মোঃ সিরাজুল ইসলাম একজন টমটম চালক ছিল। জমজ সন্তান দুটি জন্মগ্রহণের পর বৃদ্ধি পায় তাদের সাংসারিক ব্যয়। যা সিরাজুল ইসলামের পক্ষে বহন করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। সেজন্য তাদের জীবনে নেমে আসে দারিদ্রের কালো ছায়া। স্বামী সিরাজুল ইসলামকে সাহায্য করার জন্য স্ত্রী ফাহিমা আক্তার শায়েস্তাগঞ্জ এর ওলিপুরস্থ প্রাণ আরএফএল কোম্পানীতে চাকুরী নেয়। এভাবেই ভালোই চলছিল তাদের সংসার।

প্রতিবেশী আক্তার হোসেন এর খারাপ নজর পড়ে ফাহিমা আক্তার এর উপর। ফাহিমা কোম্পানীতে আসা যাওয়ার পথে বিভিন্নভাবে তাকে বিরক্ত করতে থাকে প্রতিবেশী আক্তার হোসেন। তাকে দিতে থাকে নানারকম কুপ্রস্তাব। কোনোভাবেই ফাহিমাকে রাজি করাতে পারেনি আক্তার হোসেন। এবার ভিন্ন পথ বেছে নেয় আক্তার হোসেন। ফাহিমার কাছে পৌছানোর জন্য সিঁড়ি হিসেবে বেছে নেয় তার স্বামী সিরাজুলকে। সিরাজুল এর সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে থাকে প্রতিবেশী আক্তার। আক্তার হোসেন প্রতিনিয়ত সিরাজুল এর বাড়িতে আসা যাওয়া করতে থাকে। এই আসা যাওয়ার একটা সময় আক্তারের লোভনীয় রঙ্গিন ফাঁদে পা দেয় ফাহিমা আক্তার। এভাবেই গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক। আক্তার হোসেন মোছাঃ ফাহিমাকে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন দামী দামী উপহার দিতে থাকে। আক্তার হোসেন বিভিন্ন সময় ফাহিমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। যার বাধা হয়ে দাড়ায় সিরাজুল ও ফাহিমার তিনটি সন্তান। একটি সময় আক্তার হোসেন সিরাজুলকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য রাজি করায় ফাহিমাকে। ফাহিমা এবং আক্তার হোসেন শহরে আসে সিরাজুলকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য। তখনই ফাহিমার চোঁখে ভেসে ওঠে তার সন্তানদের প্রতিচ্ছবি। কোনো এক অদৃশ্য মায়ায় ফিরে আসে ফাহিমা। ফিরে আসার পর ডিভোর্স দিতে না পারায় আক্তার হোসেন ফাহিমার উপর উত্তোজিত হয়। গত ১৭/১০/২০১৯ খ্রিঃ তারিখে ঘটনার আগের দিন বৃহস্পতিবার ফাহিমা প্রতিদিনের মত সকালে কোম্পানীতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘুম থেকে ওঠে তার বাড়ির পাশের টিউবওয়েলে আক্তারের সাথে দেখা করে। তখন আক্তার হোসেন ফাহিমাকে নিয়ে শায়েস্তাগঞ্জ এর ওলিপুরস্থ আরএফএল কোম্পানীর উদ্দেশ্যে সিএনজি যোগে রওয়ানা করে। পথিমধ্যে আক্তার হোসেন ফাহিমাকে বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। ফাহিমা বলে আমার তিন সন্তান রেখে আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না। তখন আক্তার বলে তোমার তিন সন্তান এর ব্যবস্থা আমি নিচ্ছি। তারপর তারা দুইজন পরামর্শ করে কিভাবে বিষ পান করিয়ে সিরাজুল এর তিন সন্তানকে হত্যা করা যায়। তারপর তারা একটি বিষের বোতল কিনে এবং আক্তার হোসেন ফাহিমাকে বলে এই বিষয়ে কাউকে না জানানোর জন্য। গত ১৮/১০/২০১৯ খ্রিঃ রোজ-শুক্রবার ঘটনার দিন তাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সিরাজুলকে আক্তার হোসেন তার টমটম দিয়ে রিজার্ভ ভাড়ায় পাঠিয়ে দেয়। বিকালের দিকে আক্তার হোসেন সিরাজুল এর বাড়িতে এসে ফাহিমাকে ডাকে এবং ফাহিমাকে বলে পাশের দোকান থেকে দুইটি লিঁচুর ড্রিংক কিনে আনার জন্য। ফাহিমা তার কথা মত দুইটি লিঁচুর ড্রিংক এনে দেয়। আক্তার হোসেন সিরাজুল এর বাড়ির পিছনে গিয়ে দুইটি লিঁচুর ড্রিংক এর মধ্যে বিষ মিশায়। কিছুক্ষণ পর আক্তার হোসেন সিরাজুল এর তিন সন্তানকে ডেকে এনে ছোট মেয়ে সাথী আক্তারকে একটি লিঁচুর ড্রিংক পান করায় এবং বড় ছেলে তোফাজ্জল এবং ছোট ছেলে রবিউল ইসলামকে এক বোতল লিঁচুর ড্রিংক পান করায়। সাথে সাথে তারা মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে। তারপর ফাহিমা ও তার খালা শ্বাশুরী তাদেরকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে আসে। তখন কর্ত্যবরত ডাক্তার সাথীকে মৃত ঘোষণা করে এবং দুই ছেলেকে সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে প্রেরণ করেন। এই ঘটনায় হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার মামলা নং-২১ তারিখ-২৪/১১/২০১৯ খ্রিঃ একটি হত্যা মামলা রুজু হয়। এই মামলার প্রেক্ষিতে এজাহার নামীয় প্রধান আসামী ফাহিমা আক্তারকে গত ২৯/১১/২০২০ খ্রিঃ তারিখে ০৩ (তিন) দিনের রিমান্ডে আনা হয়।
থানার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, মোঃ রবিউল ইসলাম পিপিএম-সেবা হবিগঞ্জ সদর সার্কেল, হবিগঞ্জ এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও নেতৃত্বে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ, মাসুক আলী, তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই/নাজমুল হক ও মহিলা সদস্য সহ একটি টিম ০৩ দিন জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে সে লোমহর্ষক হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা দেন। এই ঘটনার সার্বিক বর্ণনা দিয়ে অদ্য ০১/১২/২০২০ খ্রিঃ তারিখে দোষ স্বীকার করে। সে ১৬৪ ধারায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট জনাব তৌহিদুল ইসলাম এর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জজবানবন্দি দেন।