খুলনা-৬ সংসদ সদস্যকে কাঁদা ছোড়ায় বিব্রত প্রধানমন্ত্রীও, তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি

  • 17 June
  • 09:21 PM

মোঃ ইকবাল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি 17 June, 21

খুলনার কয়রা উপজেলার দশালিয়া এলাকায় স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমে ভেড়িবাঁধ সংস্কারকালে খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ আক্তারুজ্জামান বাবুকে উদ্দেশ্য করে কাঁদা ছুঁড়ে মারার খবর প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। এতে বিব্রত হয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও। অবশ্যই পরে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘটনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন আক্তারুজ্জামান বাবু এমপি।

তবে এ ঘটনার নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানের গুরুত্ব অনুধাবন করছেন আ’লীগের হাইকমান্ড। সে লক্ষে গত সোমবার পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয়া হয়। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনের নির্দেশও দেয়া হয়েছে এ কমিটিকে।

সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ইয়াস’র প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছাসে উপকুলীয় ভেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে লোকালয়ে নোনা পানি প্রবেশ করে। টেকসই ভেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনেও পুরণ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ উপকুলবাসী।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, খুলনা জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি এ্যাড. এম এম মজিবুর রহমানকে আহবায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটিতে সদস্য করা হয়েছে, জেলা আ’লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সরফুদ্দিন বিশ্বাস বাচ্চু, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম খালেদীন রশিদী সুকর্ণ, দপ্তর সম্পাদক এম এ রিয়াজ কচি ও সদস্য অসিত বরণ বিশ্বাস’কে।

জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. সুজিত অধিকারী স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়েছে, “আ’লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির খুলনা বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক মৌখিক নির্দেশক্রমে জানানো যাচ্ছে যে, গত ১ জুন কয়রা উপজেলার মহেশপুর ইউনিয়নের নদী ভাঙনে স্বেচ্ছাশ্রমে ভেড়িবাঁধ নির্মাণের সময় খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য জেলা আ’লীগের সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু কাজ পরিদর্শন/তদারকির জন্য যাওয়ার পর উক্ত স্থানে সৃষ্ট ঘটনা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় বাংলাদেশ আ’লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ সৃষ্ট ঘটনায় উদ্বিগ্ন ও বিব্রতবোধ করেছেন।

সে কারণে উলে­খিত অনাকাঙ্খিত ঘটনার সাথে কারা সরাসরি জড়িত এবং ঘটনার অন্তরালে কারা, কেন এবং কি কারণ তা অনুসন্ধান পূর্বক পত্র প্রাপ্তির সাত কর্মদিবসের মধ্যে আ’লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের (খুলনা বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত) নিকট জমা দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হল।”

সূত্র জানিয়েছেন, কয়রা উপজেলা আ’লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের রাজনীতি টেকসই ভেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে ক্ষুব্ধ উপকুলবাসীকে উসকে দিয়েছে কি না, মূলতঃ সে বিষয়টিই তদন্তের বিষয়।জানা গেছে, কয়রা শাখার সভাপতি জি এম মহসিন রেজার সাথে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে স্থানীয় আ’লীগের একটি বড় অংশের প্রকাশ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ। এর সাথে যোগ হন জেলা আ’লীগের এক নেতা। আবার মহারাজপুর ইউনিয়নে আসন্ন ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন মোঃ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। এ ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান উপজেলা আ’লীগের সভাপতির সহোদর জিএম আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু মনোনয়ন পাননি।

কয়রা উপজেলা আ’লীগের সভাপতি জি এম মহসিন রেজার নেতৃত্বাধীন একটি অংশ স্থানীয় সংসদ সদস্য মোঃ আক্তারুজ্জামান বাবুর সহচার্যে থাকলেও উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি অংশের দূরত্ব স্থানীয়দের কাছে দৃশ্যমান। ফলে কয়রা উপজেলা আ’লীগের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এ তদন্ত কমিটির সামনে ফুটে উঠবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয় নেতৃবৃন্দের। তবে এসব বিষয় কোন মন্তব্য করতে রাজি নন তারা।

খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ আক্তারুজ্জামান বাবুকে লক্ষ্য করে কাঁদা ছুঁড়ে মারার ঘটনায় এখনি কোন মন্তব্য করতে চাইছেন না কেন্দ্রীয় আ’লীগের গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি।তবে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা আ’লীগের দপ্তর সম্পাদক এম এ রিয়াজ কচি এ প্রতিবেদক’কে বলেছেন, কেন্দ্র থেকে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছে। তবে তদন্তের বিষয় কোন মন্তব্য না করে তিনি কমিটির আহবায়ক এম এম মজিবুর রহমানের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

এ ব্যাপারে কমিটির আহবায়ক ও খুলনা জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি এড. এম এম মজিবুর রহমান বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৪ দিনের মধ্যে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। তদন্তে কারা কাঁদা ছুঁড়লো এবং কেন ছুঁড়লো এ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হবে। তবে তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উঠে আসবে।

প্রসঙ্গত, কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের দশহালিয়া এলাকায় কপোতাক্ষ নদের ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামত স্বেচ্ছাশ্রমে কাজের স্থলে গত ১ জুন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একটি ট্রলার নিয়ে যান খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ আক্তারুজ্জামান বাবু। বাঁধে কাজ করা উত্তেজিত জনতা সংসদ সদস্যকে দেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা কাঁদা ছুড়ে মারতে থাকেন সংসদ সদস্যকে বহন করা ট্রলারের দিকে।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ট্রলার নিয়ে চলে যান এমপি বাবু। মাইকে উত্তেজিত মানুষকে শান্ত হওয়ার আহবান জানান একজন ঘোষক। কিন্তু প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে উত্তেজনা বিরাজ করে বাঁধ এলাকায়। তবে বাবুকে ট্রলার নিয়ে ফিরে যেতে দেখে হাততালি দিয়ে ওঠেন অনেকেই। তবে কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসেন সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু। পরে এলাকাবাসীর সঙ্গে বাঁধ নির্মাণ কাজেও অংশ নেন তিনি।