‘শ্রাবণের ডায়েরী’

  • 22 July
  • 10:18 AM

আব্দুল্লাহ আল মামুন 22 July, 20

“কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা
একখানি ছোট খেত, আমি একেলা-
চারদিকে বাকা জল করিছে খেলা”
রবীন্দ্রনাথের সোনার তরীর এই পঙক্তির সাথে ক’জন-ই বা অপরিচিত! ঠিক যেন কৃষান তার পাকা ধান কেটে গোলায় ভরার আগেই এবার বর্ষা এসে গেল। চারদিকে পানি থৈ থৈ। ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পরছে কিনারায়। দিনরাত অঝড় ধারায় টুপটুপ করে আসমান ভেঙ্গে টিনের চালে ঝুম ঝুম করে থুবড়ে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা।
আর দোচালা ঘরের নিচে বসে রোমান্টিক যুগল হেডফোন ছেড়ে আনমনে শুনে যাচ্ছে-
“আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম,
শুধু শ্রাবণ সন্ধ্যা টুকু তোমার কাছে চেয়ে নিলাম।”

শ্রাবণ মাসে সবচেয়ে বড় ঢল নামে আমাদের এই সুজলা সুফলা মমতা রসে আদ্র সহানুভূতিতে সিক্ত সোনার বাংলাদেশে। নদী ফুঁসে এই সময়ে পানি দান করেছে গ্রাম গঞ্জের বিল ঝিলে। বন্যার পানিতে প্লাবিত দেশের প্রত্যেকটি গ্রাম। দীর্ঘদিন যাবৎ শুকিয়ে মাটি ফেঁটে চৌচির হয়ে পতিত পড়ে থাকা বিল ঝিল যেন যৌবন ফিরে পেয়েছে সহসা বানের পানিতে।

এই সময়টাতে বড়রা ব্যস্ত জাল নিয়ে মাছ ধরায়। কিন্তু গ্রামের সেই দস্যি ছেলেরাও কি তাই করবে, হা হা হা মোটেও না। চারদিকে পানি পেয়ে বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছ্বাস আর প্রাণচাঞ্চল্যে তাদের যোগ হয়েছে ভিন্ন মাত্রা। গ্রামের ছেলেদের যেন নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে, আর সেই প্রাণে যমুনার পানি যেন ঢেউয়ের তালে বহিয়ে দিচ্ছে আনন্দ এবং চঞ্চলতা। বসে নেই গ্রামের প্রাইমারী স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ ইউনিভার্সিটির ছাত্ররাও। স্কুল কলেজ বন্ধ তাই সারাদিন শুয়ে বসে থেকে কুড়ে বনে যাওয়ার থেকে বিকেল বেলায় ছোট বড় মিলে নতুন পানিতে কলা গাছ কেটে ভেলা ভাসাতে মন্দ নয়। এই ভেলার সাথে গ্রামের তেলে জলে বড় হওয়া প্রত্যেকটি মানুষেরই প্রাণের সম্পর্ক। ওই যে লিখার প্রথমেই বল্লাম না, “নতুন পানির ছোয়ায় প্রাণ চাঞ্চল্যে রঙ্গিন হয় অলস সময়”। পানির কলকল শব্দে কংক্রিটের রাস্তাটায় অন্য মাত্রা যোগ করে। এবং সেইসাথে আমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ১০বছর আগের শৈশব আর কৈশরের মাঝামাঝি। সারাদিন ভেলা চালিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বাবার শাসন, সেই অতীতটাই যেন আজকে বর্তমানে রুপ নিয়ে হাজির হয়েছে আমাদের সামনে। শত স্মৃতি আর হাজারো দস্যিপনার সাক্ষী হয়ে কলা গাছের ভেলা আজও কাছে টানে। এইতো সেদিন সবে ২য় শ্রেণিতে পড়ি, পুকুড়ে ভেলা চালাতে গিয়ে মরতে বসেছিলাম, ভাগ্যিস বাবা ছিলো সেখানে। সে যাত্রায় বেঁচে ফিরেছিলাম। শখের ভেলা দেখে স্মৃতিপটে ভেসে উঠে ডজন খানেক অতীত, বিলের এপাড় থেকে ওপারে পাল্লা দিয়ে যাওয়া আসার মজাটা ছিলো অন্যরকম।

বানের পানির সাথে পাল্লা দিয়ে অনেকেই ব্যস্ত মাছ ধরায়। রাস্তার পাশে বাঁশের খুঁটি গেড়ে কালো পানিতে জাল ফেলে মাছ আহরণে মননিবেশ করেছে কয়েকজন। আবার তারই পাশে বরশী নিয়ে মাছ ধরবে বলে বসে রয় গুটি কতেক।
ওদিকে পানি বন্দী মানুষেরও ঢের কষ্ট, দুঃখের যেন শেষ নেই। ঘরের ভিতর হাঁটু পানি নিয়ে দিনপার করা জনপদের ভোগান্তির যেন অন্ত নেই। সহায় সম্বল বলতে কারো দু-একটি পালের গাঁই কিংবা দু’চারটে ছাগল। বন্যা হওয়ার আগে হয়তো এরা দিব্যি সোজাসাপ্টা একটা হাসি দিয়ে দুধেভাতে বেলা পার করে দিতো। কিন্তু হায় অদৃষ্ট, আল্লাহ তাদের এ কোন পরিক্ষায় ফেল্লেন। গবাদিপশু নিয়ে পরেছেন তারা বিপাকে, না দিতে পারছে আশ্রয় আর না দিতে পারছে খাদ্যের যোগান। ওদিকে এগুলো বিক্রি করে যে হালকা হবেন সে উপায়ন্তও আপাতত দেখতে পাচ্ছে না উদ্বাস্তু জনপদ। তবে এ শ্রাবনে কোরবানীর ঈদটা কদিন পরেই, যদি কোন ক্রেতা সাধারণ এর মাঝে নসিবগুণে বাড়ি আসেন, তবে তাদের একটা উপায় হবে বৈকি।

সে যাইহোক আমার শ্রাবণের ডায়েরী তো লেখা শেষ হলো। কিন্তু পাঠক আপনাদেরও যেন এবারের শ্রাবণের ডায়েরীটা পূর্ণতা পায়। কিভাবে পূর্ণ করবেন এবারের শ্রাবণের ডায়েরী সেটা হয়তো আমার আগের লেখা “কোরবানীতে জেগে উঠুক মানবতা” পড়লেই কিছুটা আন্দাজ করতে পারবেন।