‘শরণার্থীদের স্বার্থে বিশ্বনেতাদের কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি’

  • 20 June
  • 01:46 PM

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 20 June, 21

শরণার্থী বা উদ্বাস্তু হলো একজন ব্যক্তি যিনি নিজ ভূমি ছেড়ে অথবা আশ্রয়ের সন্ধানে অন্য দেশে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করেন। জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রতা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আদর্শগত কারণে সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতাই এর প্রধান কারণ। এই শরণার্থী সমস্যা বিশ্বের অন্যতম বড় একটি সমস্যা৷ এই সমস্যা নিরসনের জন্য প্রতিবছর একটি দিবস পালন করা হয় বিশ্বনেতাদের সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। যেনো তারা এই বিষয়ে ভাবে এবং এই উদ্বাস্তুদের তাদের নিজ ভূমিতে ফিরতে সাহায্য করে৷ বিশ্ব শরণার্থী দিবস বলতে বোঝানো হয় প্রতি বছর জুন মাসের ২০ তারিখ, যা বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের অমানবিক অবস্থানের প্রতি আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের সচেতনতা সৃষ্টির জন্য পালন করা হয়।

২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৫৫/৭৬ ভোটে অনুমোদিত হয় যে, ২০০১ সাল থেকে জুন মাসের ২০ তারিখ আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস হিসেবে পালন করা হবে। ১৯৫১ সালে অনুষ্ঠিত শরণার্থীদের অবস্থান নির্ণয় বিষয়ক একটি কনভেনশনের ৫০ বছর পূর্তি হয় ২০০১ সালে।২০০০ সাল পর্যন্ত ২০ জুন আফ্রিকান শরণার্থী দিবস নামে পরিচিত ছিল এবং বিভিন্ন দেশে তা পালন করা হত। জাতিসংঘ পরবর্তীকালে নিশ্চিত করে যে, অর্গানাইজেশন অফ আফ্রিকান ইউনিটি বা ওএইউ যে ২০ জুনকে আফ্রিকান শরণার্থী দিবস হিসেবে পালন করত তার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস হিসেবে ২০ জুনকে পালন করা হবে।

১৯৫১ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক শরণার্থীদের মর্যাদা বিষয়ক সম্মেলনের অনুচ্ছেদ ১এ-তে সংক্ষিপ্ত আকারে শরণার্থীর সংজ্ঞা তুলে ধরা হয়। একজন ব্যক্তি যদি গভীরভাবে উপলদ্ধি করেন ও দেখতে পান যে,তিনি জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আদর্শ, সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় তাকে ঐ দেশের নাগরিকের অধিকার থেকে দূরে সরানো হচ্ছে; সেখানে ব্যাপক ভয়-ভীতিকর পরিবেশ বিদ্যমান এবং রাষ্ট্র তাকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে ;তখনই তিনি শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হন।১৯৬৭ সালের সম্মেলনের খসড়া দলিলে উদ্বাস্তুর সংজ্ঞাকে বিস্তৃত করা হয়। আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক সম্মেলনে যুদ্ধ এবং অন্যান্য সহিংসতায় আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক নিজ দেশত্যাগ করাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।এই সংজ্ঞায় শরণার্থীকে প্রায়শই ভাসমান ব্যক্তিরূপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সম্মেলনে গৃহীত সংজ্ঞার বাইরে থেকে যদি যুদ্ধের কারণে নির্যাতন-নিপীড়নে আক্রান্ত না হয়েও মাতৃভূমি পরিত্যাগ করেন অথবা, জোরপূর্বক নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হন - তাহলে তারা শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।যিনি শরণার্থী বা উদ্বাস্তুরূপে স্থানান্তরিত হন, তিনি আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে পরিচিত হন। আশ্রয়প্রার্থী ব্যক্তির স্বপক্ষে তার দাবীগুলোকে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত হতে হবে।২০০৬ সালে দক্ষিণ লেবাননে অবস্থানকারী লেবাননীয় শরণার্থী ৩১ ডিসেম্বর, ২০০৫ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান, ইরাক, সিয়েরালিওন, মায়ানমার, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান এবং ফিলিস্তিন বিশ্বের প্রধান শরণার্থী উৎসস্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।আইডিপি অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শরণার্থী ব্যক্তি এসেছে দক্ষিণ সুদান থেকে, যা প্রায় ৫ মিলিয়ন।

জনসংখ্যা অনুপাতে সবচেয়ে বেশি আইডিপি রয়েছে আজারবাইজানে। সেখানে ২০০৬ সালের তথ্য মোতাবেক প্রায় আট লক্ষ শরণার্থী অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।১৯৯১-৯২ সালে আড়াই লক্ষাধিক মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থী বার্মার (বর্তমান: মায়ানমার) সামরিক জান্তার নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তাদের অনেকেই বিশ বছর যাবৎ বাংলাদেশে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে দু'টি ভাগে ভাগ করেছে। শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থানকারী স্বীকৃত রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের সাথে মিশে যাওয়া অস্বীকৃত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে। কক্সবাজারের নয়াপাড়া এবং কুতুপালং এলাকার দু'টি ক্যাম্পে ত্রিশ হাজার রোহিঙ্গা বাস করছে।আরাকান রাজ্য থেকে গত কয়েক মাসে রোহিঙ্গাদের উপর ব্যাপক নির্যাতনের ফলে তাদের বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। কঠোর নিবন্ধিকরণ আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ, ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ, বার্মার বৌদ্ধদের অবস্থানের জন্য জোরপূর্বক উচ্ছেদকরণ, ২০০৬ সালের শেষ পর্যায়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় আরাকানের ৯টি মসজিদের আশেপাশে অবকাঠামোগত প্রকল্প গ্রহণ এর জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হয়। রোহিঙ্গা সমস্যা এখন বাংলাদেশের জন্য একটা বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার এর নির্যাতন এ যখন বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা শরনার্থী এদেশে আশ্রয় নেয়। তখন বিশ্ব নেতারা একটু নড়ে চড়ে বসেছিল। মিয়ানমারের উপরে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে, যেনো তাদের নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়৷ কিন্তু দেখাগেছে কিছুদিন পরেই তাদের সব পদক্ষেপ নিস্তেজ হয়ে যায়।

জাতিসংঘের ৭ম প্রেসিডেন্ট কফি আনান 'আনান কমিশন ' নামে রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনের জন্যে একটি কমিশন গঠন করেন। যাদের উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গাদের মায়ানমার এ ফিরিয়ে দেওয়া৷ কিন্তু ২০১৮ সালে তার মৃত্যুর পর এই কমিশন আর কোন আশার আলো দেখে নি৷ সবসময় ই দেখা গেছে যে সমস্যার শুরুতে বিশ্বনেতারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই তারা আর এসব বিষয়ে মাথা ঘামান না।
আবার যে দেশে শরনার্থীরা সে দেশের জন্যেও তারা একরকম হুমকিস্বরুপ । শরনার্থীদের জীবনমান খুবই নিম্নমানের। তাদের অতি কষ্টে অনাহারে বাস করতে হয়৷ অর্থ আয়ের কোন উপায় নেই৷ বিভিন্নস্থান থেকে আসা অনুদান নিয়েই তাদের বেচে থাকতে হয়৷ তাই দেখা যায় এই নিম্নমানের জীবন থেকে উপরে উঠতে তারা অবৈধ পথ অবলম্বন করে। দেখাযায় যুবতী মহিলারা দেহ ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়। তাছাড়াও জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যাবস্থা শরনার্থী শিবিরে তেমন থাকে না৷ তাছাড়াও মাদকের বিষাল ব্যাবসা, নারীপাচার, আসেপাশের এলাকায় ডাকাতি এই ধরনের সমস্যা নিত্য সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে৷ এছাড়াও দেখা গেছে যে স্থানীয় পুলিশ, আনসার ক্যাম্পে তারা হামলা চালিয়েছে। তাদেরক্যাম্পে তারা হামলা চালিয়েছে।

তাদের মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে যা দেশ ও শরনার্থী শিবিরের সাধারণ মানুষ সবার জন্যেই আতঙ্ক। এসব থেকে মুক্তির উপায় একটাই এইসব শরনার্থীদের তাদের নিজের দেশে ফেরত পাঠাতে হবে, তাদের জীবনের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করে। যখনই দেখা যায় শরনার্থীদের দেশে ফেরানোর কথা উঠে ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে কেও না কেও ভেটো দেয়। বা নির্যাতনকারী দেশের পক্ষে থাকে৷ তাই দেখা যায় সেসব দেশ ও চাপ অনুভব করে না৷ বিশেষ করে সামরিক অথবা একনায়কতন্ত্র রক্ষায় বিশেষ কোন জাতিকে উদ্বাস্তু হতে হয়৷ এই উদ্বাস্তু সমস্যা নিরসন করতে হলে সব বিশ্বনেতাদের এক হতে হবে৷ পৃথিবীতে সবাই মানুষ এবং একজন মানুষ হিসেবে সবার সমান অধিকার আছে৷ তাই পৃথিবীর সব মানুষকে এক হয়ে শরনার্থীদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে হবে৷ বিশ্বনেতাদের সবাইকে এক গলায় আওয়াজ তুলতে হবে৷ তাদের মতামতের ভিন্নতার জন্যেই এই সমস্যাগুলো ঝুলেই থাকে, নিরসন হতে হতেও হয়ে উঠে না৷ তাই বিশ্বনেতাদের ঐক্য প্রয়োজন। জাতিসংঘের ও উচিৎ এই বিষয়ে গুরুত্ত দেওয়া৷ সর্বোপরি বিশ্বনেতাদের জাতি মত ভেদাভেদ ত্যাগ করে ঐক্য গঠনও ও মানুষ হিসেবে উদ্বাস্তুদের তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মানসিকতাই পারে উদ্বাস্তুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে।

-
আহাদ মোহাম্মদ তাহমিদ
শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।