রাস্তার বাঁকে আমতলার সেই নাপিত

  • 09 Jan
  • 01:31 PM

আব্দুল্লাহ আল মামুন 09 Jan, 21

সর্বশেষ পল্লীকবি জসিম উদ্দীনের বাঙ্গালির হাসির গল্পে নাপিতের কেরামতির কথা পড়েছিলাম। নাপিত রাজার ঘাড়েও বসাতে পারে কষে থাপ্পর, আবার তার জৌলুস আয়নাতে বাঘকেও বন্দি করেতে পারে।

গ্রামের মেঠোপথ ধরে রেললাইন পেরুলে তিন রাস্তার মোড়ে বাজারটা, সেখানে যে বিশাল আকৃতির আম গাছ রয়েছে, তলায় ছোট্ট একটি সেল্যুন।

আর সেখানে দুজন লোককে দেখা যায় খুব মনযোগ দিয়ে চুল ছাটতে। দেখে মনে হয় বিষাদ ছুঁয়ে যেতে পারে না কখনো তাদের। মনের মাঝে রাজ্যের যত সুখ। পূবাল হাওয়ার তালে তালে গুনগুন করে গেয়ে যাচ্ছেন গান। কিংবা দোকানে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের সাথে পেড়ে বসেছেন গল্পের ঝুলি। সেই সাথে গভীর মনযোগে মানুষের চুল কেটে যাচ্ছেন দু'জন।

সেলুনে রাখা আছে পত্রিকা। একজন পড়ে যাচ্ছেন জোরে জোরে, কোথায় কি ঘটেছে আজ। আর মনযোগী শ্রোতা হয়ে সবাই শুনে যাচ্ছেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। হঠাৎ বসে থাকা কেউ একজন পাঠকের কথা শুনে মন্তব্য করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে পরিবেশটাকে একটু সতেজ করতে চান।
কেউ হয়তো বহুরুপী আলাপনে মাতিয়ে রাখছেন সেল্যুনটাকে। কেঁচির ঘচ্ ঘচ্ থামিয়ে একটু পর পর হ্যাঁ, হুম শব্দে সবার তাল মিলাচ্ছেন দুই ভাই।

কোন প্রকার ঝগড়া বিবাদ, কিংবা হিংসা বিদ্বেষ ছাড়াই দুই যুগ ধরে এই দুই ভাই এক ছাদের নিচে মিলেমিশে কাজ করে যাচ্ছেন।
ঝড় কিংবা বৃষ্টি, বৈরি আবহাওয়াতেও তাদের দুই ভাইয়ের দোকানে আসার রুটিনটাও দুই যুগ পরেও রয়েছে অক্ষুণ্ণ।

লোক মুখে শুনতে পাওয়া যায় দুই ভাইয়ের পরম মিলের কথা, কখনো নাকি পেশাগত কাজ নিয়ে মনমালিন্য হতে দেখা যায়নি তাদের।
মানুষের সাথে খুব সহজে মিশে যাওয়ার সহজাত প্রবৃত্তি যেন তাদেরকে বিশেষ গুনে গুণান্বিত করেছে।

বলছিলাম টাংগাইলের ভূঞাপুরের নিকলা বাজারের ছোট্ট একটি সেলুনের গল্প। এই দোকানে দুই ভাই কাজ করেন, বড় ভাই প্রতিষ চন্দ্র শীল এবং আশিশ চন্দ্র শীল।

আশিশ চন্দ্রশীলকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলেন, ' ছোট থেকেই এই পেশায় রয়েছি। এখানেই দুই ভাই কাজ করে যাচ্ছি তখন থেকে।
আমাদের কাছে মানুষজন আসে। আমাদেরকে ভালোবাসে। পড়ালেখা শিখে দেশের সেবা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে সুযোগ হয়নি। তাতে কি হয়েছে আমরাও তো মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছি, এটা কম কিসের!
শুধু ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারই দেশের সেবক নয়, আমরা চাষা, কামার, কুমাড়, সমাজের অবহেলিত শ্রেনীর সবাই দেশের জন্য কাজ করছি। আমি এই পেশাকে সন্মান জানাই। মৃত্যু পর্যন্ত এভাবেই মানুষের সেবা দিয়ে যেতে চাই।'

বড় ভাই প্রতিষ শীল বলেন, ' আমি প্রথমে একটা সুয়েটার মিলে কাজ করতাম। এরপর এই পেশায় এসেছি। এখন এটা ভালোলাগায় রুপান্তরিত হয়েছে। মানুষের সাথে মিশতে পারছি অনেক কাছে থেকে, এজন্য সবাই আমাদেরকে ভালোবাসে। আর দিনশেষে মানুষের ভালোবাসাটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।'

গ্রামের মানুষের সুযোগ হয় না শহুরে জীবনের চাকচিক্যপূর্ণ কোন সেল্যুনে গিয়ে হেয়ার স্টাইল করতে। এখানে কম টাকায় স্বল্প আয়ের মানুষগুলো তাদের চাওয়া-পাওয়া খুব সহজেই মেটাতে পারেন।
গ্রামে বসবাসরত মানুষের কাছে এটাই সুন্দর সাবলীল হওয়ার একমাত্র জায়গা।