যে বাস্তব গল্প সাহিত্যকেও হার মানায়

  • 31 Aug
  • 10:58 PM

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 31 Aug, 21

প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় হাজারো গল্পের সম্মুখীন হই আমরা। কিন্তু এমন অনেক গল্প আমাদের অগোচরেই রয়ে যায় যা আমাদের নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়। এমনই এক বাস্তব গল্প জানবো আমরা।

১৯৭৬ সালে ২৬ অক্টোবর পটুয়াখালী জেলার অন্তর্গত বর্তমান আমতলি উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নে জন্ম হয় এক শিশুর। শিশুটির পিতা কুকুয়া হাসপাতালে ঝাড়ুদারের চাকরি করতেন, মা ছিলেন গৃহিণী। শিশুটি ছিল তার বাবা-মায়ের ৫ জন সন্তানের মধ্যে ২য় সন্তান। কিন্তু শিশুটির জন্মের পর তার মা খেয়াল করলেন শিশুটির দুটি চোখে লালচে ভাব। উদ্বিগ্ন হয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে তারা বললেন, ও এখন অনেক ছোট। ওর চোখে ছানি পড়েছে। কিশোর বয়সে অপারেশন করলে ও সুস্থ হয়ে যাবে।

কিন্তু সেই লালচে ভাবই দিনকে দিন শিশুটির অসহনীয় যন্ত্রণায় পরিণত হলো। মাত্র ৩ মাস বয়স থেকেই শুরু হলো সন্তানের কষ্ট লাঘবের জন্য শিশুটির মায়ের রাতজাগা নির্ঘুম দিনের গল্প।

১১ বছর বয়সে বাচ্চাটিকে নিয়ে যাওয়া হলো বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজে। ডাক্তাররা বললেন, ১৬/১৭ বছর বয়সে অপারেশন করানো যাবে। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাসে তা আর সম্ভব হলোনা। মাত্র একজনের আয়ে যখন দিন আনে দিন খায় অবস্থা, সেখানে এত বড় অপারেশন ছিল কেবলই স্বপ্ন।

১৯৮৭ সালে বাচ্চাটির বাবা বদলি হলেন পটুয়াখালী সদর হাসপাতালে। সন্তানদের খাবারের যোগান দিতে বাচ্চাটির মা-ও ঝাড়ুদার হিসেবে যোগ দিলেন উক্ত হাসপাতালে। বাচ্চাটি ততদিনে বুঝে গেছে এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে সে অক্ষম। কিন্তু তার উপলব্ধি শক্তি ছিল অসামান্য। ১৯৯০ সালের দিকে পটুয়াখালী লতিফ স্কুলের অভ্যন্তরীণ শিশু সদন যেখানে দৃষ্টিহীন বাচ্চাদের পড়ানো হত সেখানে,ভর্তি করা হলো বাচ্চাটিকে। সেই বিদ্যালয় থেকেই ব্রেইল পদ্ধতিতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণ করলো বাচ্চাটি। কিন্তু ভাগ্য এবারও তার সহায় ছিলনা। পিতামাতা দুজন যখন আহারের জন্য সংগ্রাম করছেন তখন ভাই-বোনরা পড়াশুনা থেকে প্রায় ঝড়ে পড়ার মত অবস্থা। শুরু হলো কিশোর বয়সেই জীবন সংগ্রাম।

জীবন সংগ্রামের সাথীও পেয়েছিলেন করুণাময় সৃষ্টিকর্তার কৃপায়। ভালবাসা আছে বলেই হয়তো পৃথিবী এত সুন্দর। পাশাপাশি বাসায় থাকার সুবাদে বন্ধুত্ব হয়েছিল এক কিশোরীর সাথে। মেয়েটির বাবা নেই৷ তিন সন্তান নিয়ে মেয়েটির মায়েরও চলছিল বেঁচে থাকার সংগ্রাম। বন্ধুত্ব আস্তে আস্তে পরিণত হলো সেই দৃষ্টিহীন কিশোরের প্রণয়ে। জীবন সঙ্গী কোনোদিন দেখতে পাবেনা জেনেও পারিবারিক ভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন তারা। শুরু হলো দুজনের একসাথে পথচলা।

জীবনসঙ্গীকে নিয়ে শুরু করলেন চায়ের দোকান। ১৯৯৬ সালে তাদের ১ম পুত্র সন্তান হলো। কিন্তু সুখ? সে আর হলোনা। কিছু উর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গের কারণে চায়ের দোকানটি চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হলোনা।
নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন বাবা মায়ের আয়ের ওপর। ২০০০ সালে ২য় সন্তানের জনক হলেন দৃষ্টিহীন লোকটি। কন্যা সন্তান হলো তাদের।

কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র নন তিনি। যখন যা সম্ভব ছিল, কখনো বাদামের ব্যবসা কিংবা কাঠের ব্যবসা ইত্যাদি করে পড়াশোনা চালিয়ে গেলেন সন্তানদের। সন্তানদের স্কুলের ফিও ঠিক করে দিতে পারেননি কিন্তু তাদের অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন তিনি। তার অনুপ্রেরণায় আজ তার পুত্রসন্তানটি স্নাতক পাশ এবং মেয়েটি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।

হয়তো জীবনের পুরো সংগ্রামের গল্প লিখলে একটি বই লেখা সম্ভব,কিন্তু পৃথিবীকে না দেখা এই লোকটি বারবার মনে করিয়ে দেয়, হাল ছেড়োনা। সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে- এমনটাই প্রত্যাশা তার।
ভালো থাকুক সকল মানুষ, বেঁচে থাকুক মানবতা।