‘যে ছোয়া রয়ে যায় আজীবন’

  • 13 May
  • 01:37 PM

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 13 May, 21

মেঘলা আকাশ, বসন্তের কৃষ্ণচূড়া দুলিয়ে বহমান শীতল বাতাস, ঠিক কিছুক্ষন পরই বৃষ্টি বিলাসে একটি সবুজ পাখি। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতে তার ছোট্ট কোমল পাখা দুটি ঝাপটিয়ে প্রকৃতির পরম স্নেহের আবেশ টুকু নিজের করে নিচ্ছে।

প্রতিটি মুমিন মুসলিমের চাওয়াটাও যে এর ব্যতিক্রম নয়। সেও জান্নাতের সবুজ পাখি হয়ে আল্লাহ্ তায়ালার মেহমান হিসেবে অনন্তকাল জান্নাতের অসীম আকাশে পাখা ঝাপটাবে। পরম করুণাময় আল্লাহ মুসলিমদের জান্নাতে যাওয়া সহজ করার জন্যেই প্রতিবছর রমাদান নামক একটি মাসের নেয়ামত দান করেছেন।

“রমাদান” একটি উত্তম, বরকতপূর্ণ ও গুনাহ মাফের মাস। আখিরাতে বিশ্বাসী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই রমজানের রয়েছে সর্বোত্তম শিক্ষা। কেননা রোজা রাখা হয় কেবল আল্লাহর জন্যেই। অন্য এবাদতে লৌকিকতার মনোভাব আসলেও রমজানের সিয়াম পালনে থাকে না কোনো লৌকিকতা। কেবল আল্লাহর ভয়েই মুমিন সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল পানাহার এবং নফসের প্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকে। আর রমজানের প্রধান শিক্ষা হচ্ছে মানুষকে আল্লাহর ভয়ে আখিরাতের পথে ধাবিত করা এবং ইমানকে পুনরায় উদ্দীপ্ত করা।

রমজান অতিদ্রুতই শেষ হয়ে যায়। এই করোনা মহামারীতে সবাই যেখানে গৃহ বন্দী অবস্থায় সেখানে আল্লাহ্ তার বান্দাদের কাছে টেনে নেবার এক সুযোগ দিয়েছিলেন। সেটিও শেষ হয়ে গেলো। রমজান চলে গেলেও রেখে গিয়েছে রমজানের শিক্ষা। যে শিক্ষা আরো একটি বছর আল্লাহর ভয়ে, আল্লাহর প্রতি ভালবাসায় তার বিধান ও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন আদর্শকে সামনে রেখে জীবনকে উপভোগ করার শক্তি জোগাবে। আর যদি ব্যক্তি, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনে রমজানের শিক্ষা বাস্তবায়িত হয় তাহলে নৈরাশ্য, দুর্নীতি, দুর্বলের প্রতি নির্যাতন সহ সকল অনিয়মের ইতি ঘটবে।

রমজান মাস গোপনে করা পাপাচার থেকে বিরত থাকা শিক্ষা দেয়। কেননা গোপনে করা গুনাহ মানুষের সকল আমল ধ্বংস করে দেয়। আর রোজার মহত্ব এবং এর পবিত্রতা রক্ষার্থেই রোজা অবস্থায় মিথ্যাবাদী মিথ্যা বলে না, ঘুষখোর ঘুষ খায় না, চাঁদাবাজ চাঁদা বাজী করে না, অন্যায়কারী অন্যায় করতে লজ্জা বোধ করে। কেননা এই সকল পাপ রোজাকে নষ্ট করে দেয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এমন অনেক রোযাদার আছে তাদের রোজা দ্বারা শুধু পিপাসায় লাভ হয়” ( মেশকাত: ১৯১৭ )রোজার অন্তর্নিহিত মূল উদ্দেশ্য হলো যাবতীয় অশ্লীলতা বর্জন করা, মিথ্যা বলা থেকে বেঁচে থাকা, কারো বিরুদ্ধে অপবাদ রটানো এবং গীবত শেকায়েট করা হতে দূরে থেকে কৃচ্ছতা বর্জন করা ও সর্বোপরি স্বীয় প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রনে রাখা। সুতরাং কেও যদি রোজা রেখে এসব গুণাবলী অর্জন করতে সচেষ্ট না হয়ে উপরন্তু সেসব মন্দের মধ্যে লিপ্ত থাকে, তাহলে সে রোজা রেখেও সত্যিকার অর্থে রোযাদার হতে পারলো না; বরং সারাদিন পিপাসায় কষ্ট করলো এবং রোজার ফলাফল হতে বঞ্চিত হলো। তাই সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ সারাদিন কষ্ট করে রোজা রেখে রমাজর ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবার ভয়ে এই সকল গর্হিত পাপাচার থেকে নিজেদের বিরত রাখার অনুশীলন অব্যাহত রাখে।

তাই রমজান মাস কে গুনাহ থেকে বেচেঁ থাকার অনুশীলনের মাস বলা হয়। প্রকৃত সফল তো ঐ ব্যক্তি যে রমজান মাস পেলো আর নিজেকে পবিত্র করে নিলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি রমজান মাসে আল্লাহর সন্তোষ ও তার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে রোজা রাখবে আল্লাহ্ তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মাফ করে দেবেন” ( বোখারী: ২৬৩৭ )

রমজান আসেই মূলত মুসলিমদের নেক আমল গুলোকে শাণিত করতে। তাই এই মাসে সবাই যার যার জায়গা থেকে নেক আমল করতে থাকে। ধনীরা গরিবদের অর্থ দিয়ে, খাবার দিয়ে, পোশাক দিয়ে সাহায্য করে থাকেন। যাকাত ওয়াজিব হয়েছে এমন বিত্তশালীরা তাদের যাকাতের অংশ দিয়ে দুঃস্থ এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। এই মাসে পথশিশু, বস্তিবাসী, ফুটপাতে প্লাস্টিকের ছাউনির নিচে খুব কষ্টে দিন পার করা মানুষগুলোর রোজা রাখা আরো সহজ করার জন্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে তাদের সাহরী ও ইফতারের ব্যবস্থা করা হয় হা পুরো রমাদান জুড়ে অব্যাহত থাকে। রমজান মাসে মানুষ তার ক্ষমতা, তার রাগ সংবরণ শিক্ষা পায়। তাই সমাজে সম্য বিরাজ করে।

যে যুবক তার ভবিষ্যত নিয়ে ব্যস্ততার অজুহাতে আল্লাহর সামনে সেজদায় লুটে তার অসহায়ত্ব প্রকাশের অবকাশ পেতো না সে ও এই মাসটাই মসজিদের প্রথম কাতারে ইমাম সাহেবের ঠিক পেছনে আল্লাহর সামনে মাথা নত করে। যে যুবক তার যৌবনের শক্তি দিয়ে সব অপকর্মের মাঠ গুলো দাপিয়ে বেড়াতো সেও মাথায় টুপি এবং মুখে দাড়ি নিয়ে নবীজী সাঃ এর সুন্নাহর পাবন্দী করে। যে যুবক নেশা করে শরীরের সব শক্তি নষ্ট করছে সে ও সারাদিন নেশা ছুঁয়েও দেখে না। যারা অনৈতিক কাজের মাধ্যমে সমাজকে নষ্ট করতে ব্যস্ত সেও একটা মাস ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে নৈতিকতার আদর্শের সৈনিক বনে যায়।তাই রমজান পরবর্তী প্রত্যাশা এই ছোয়া রয়ে যাক আজীবন। রমাজনের বাইরেও এই শিক্ষা অনুশীলন হলে সমাজে থাকবে না অন্যায়, থাকবে না ধনী গরীব অসামঞ্জস্যতা। সুবিধা বঞ্চিতরা তাদের কষ্ট অনেকাংশেই ভুলে যাবে, নিম্ন শ্রেণীর মানুষের প্রতি উচ্চ শ্রেণীর সহানুভূতি সৃষ্টি হবে। সমাজ চলবে সাম্যের মানদণ্ডে।

আর রোজার কোনো বিশেষ সাওয়াব নেই কেননা আল্লাহ বলেন “রোজা শুধু আমার জন্যে আর এর প্রতিদান আমি নিজে” ( মুসলিম: ২৭৬০ ) আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হলো বেশি বেশি তার এবাদত বন্দেগী করা এবং ফরজ বিধান গুলো খুব যত্নের সাথে আদায় করা এবং নবীজী সাঃ এর সুন্নাহর অনুসরণ করা।

তাই প্রতিটি মুমিনের তামান্না হওয়া উচিত রমজানের প্রকৃত শিক্ষা ব্যক্তি জীবনে অনুশীলনের মাধ্যমে জান্নাতের জাফরান কোমল জমিনে আজীবন বাস। যেখানে বৃষ্টিস্নাত নরম জমিনের শীতলতায় আর জান্নাতী সুরের টানে জান্নাতী মেহমান আল্লাহ্ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিবেশী হয়ে অনন্তকাল পার করে দেবে।


লিখেছেনঃ
মোস্তাফিজুর রহমান
শিক্ষার্থী, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।