করোনায় মৌসুমি ফল বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

  • 11 June
  • 11:37 PM

আব্দুল্লাহ আল মুবাশ্বির, হাবিপ্রবি প্রতিনিধি 11 June, 21

দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী যেমন হতাশায় ভুগছেন,ঠিক তার বিপরীতে কিছু শিক্ষার্থী চেষ্টা করছেন করোনাকালীন অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে। এসব শিক্ষার্থীরা অনলাইনে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে গড়ে তুলেছেন সফল অনলাইন বিজনেস প্লাটফর্ম। অনলাইন এসব প্লাটফর্মেই চলছে মৌসুমি ফল বিক্রির হিড়িক। উত্তরবঙ্গের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) এমন তিনজন তরুণ উদ্যোক্তার গল্প শুনবো আমরা। শুনবো তাদের সফল মৌসুমি উদ্যোক্তা হয়ে উঠার গল্প। যারা অনলাইন প্লাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে মৌসুমি ফল আম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ ব্যাচের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো: তাওসিয়াদ হাসান জীবন বলেন, শুরুটা হয়েছিলো খানিকটা মজার ছলেই। লকডাউনে আর দশটা মানুষের মতোই আমারও অলস সময় কাটছিলো। এদিকে এর মধ্যেই হাড়িভাঙ্গা আমের মৌসুম চলে আসে। আমার বাড়ি হাড়িভাঙ্গার জন্মস্থান রংপুরের পদাগঞ্জে হওয়ায় অন্য সবার মত বংশপরম্পরায় আমাদেরও দু'তিনটা আমের বাগান রয়েছে। আমের ফলনও আল্লাহর রহমতে বেশ ভালো। তো একদিন বন্ধুদের আমের ব্যবসার কথা বললে তারা অনীহা প্রকাশ করলেও আমি আগ্রহ না হারিয়ে অনলাইনে একটি পোস্ট করলাম। আর অবিশ্বাস্যভাবে তাতে ব্যাপক সাড়াও পেলাম। তাই দেরি না করে 'খাঁটি আম ' নামে ফেইসবুকে একটি পেইজ খুলে হাড়িভাঙ্গা আমের আপডেট দেয়া শুরু করলাম। পোস্ট করার পর থেকেই যথারীতি নিয়মিত আমের অর্ডার আসতে শুরু হলো। ক্রেতারা কীটনাশক মুক্ত সুমিষ্ট আম পেয়ে যেমন খুশি, তাদের নির্ভেজাল ভাল আম দিতে পেরে আমিও তেমন আনন্দিত। তবে কুরিয়ার খরচ বেশি হওয়ার কারণে মাঝে মধ্যে কিছু ক্রেতা আম কিনতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। এরপরও পুরো মৌসুমে প্রতিদিন দেশের কোন না কোন জেলায় আম পাঠাচ্ছি। এবার পুরাতন ক্রেতারা আম পোক্ত হবার আগে থেকেই ফোন করে খোঁজ নিচ্ছেন কবে নাগাদ আম নামবে। ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগার। আশা করছি এবার গত বছরের তুলনায় ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জনের পাশাপাশি নিজের ব্যবসাটাকেও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

১৭ ব্যাচের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী মো: মিরাজুল আল মিশকাত বলেন, এ মহামারিতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। নিজেদের বাগান থাকায় খুব সহজে পাইকারি দামে উন্নতমানের আম সরবরাহ করতে পারি। অতি অল্প সময়ের মাঝেই ক্রেতাদের কাছে আম পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। লালমাটিতে রোপন করা গাছ থেকে হাড়িহাঙ্গা আমের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায়। প্রতিবছর প্রায় ছয় হাজারের অধিক মণ আম আমাদের পারিবারিক বাগান থেকে উৎপাদিত হয়। ব্যক্তিগত ভাবে কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছি। পক্ষান্তরে প্রতিবন্ধকতার কথা বলতে গেলে শুরুতেই বলতে হয় যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কথা। সেই সাথে রংপুর থেকে যদি রাজশাহীর মতো ট্রেন যোগাযোগ সরকার চালু করতো তাহলে অনলাইনে ভালো ব্যবসা করা যেতো। উত্তরের আমঘর ফেসবুক পেজে আমের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য দিয়ে থাকি। সবমিলিয়ে বেকার সময়টা আম বিক্রির ব্যস্ততাই কাটছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ ব্যাচের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মো: নাসির হোসাইন বলেন, দীর্ঘ ১৫ মাস বাড়িতে বসে অলস সময় পার করছিলাম। তেমন কোনো কাজ ছিলো না। তবে বাসায় ওয়াইফাই থাকার সুবাদে সারাদিন অনলাইনে থেকে শুধু শুধু সময় নষ্ট হতো। হঠাৎ একদিন দেখলাম আমার একজন বন্ধু ফেইসবুকে আম আর লিচু বিক্রির পোষ্ট দিয়েছে। রাতে ঘুমানোর সময় আমিও চিন্তা করলাম এরকম একটি বিজনেস প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করানো যায় কিনা। যদিও ব্যবসা সংক্রান্ত আমার তেমন কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিলো না। তবে নিজের উপর অনেকটা আত্মবিশ্বাস ছিলো। সেই আত্নবিশ্বাসের সুবাদেই কোনো ব্যবসায়িক সহযোগী না নিয়ে নিজেই অনলাইনে আম বিক্রির মৌসুমি ব্যবসা শুরু করলাম। যদিও প্রথম দিকে একটু কষ্ট হচ্ছিলো। কষ্ট হলেও ফেইসবুকে আমার আমের মান,পরিচিতি এবং প্রতি কেজিতে মূল সংক্রান্ত পোস্টগুলো প্রতিদিন করতাম। আলহামদুলিল্লাহ মাত্র একদিনেই ৯০০ কেজির মতো আম বিক্রি হয়েছে। প্রতিদিনই খুচরা অর্ডার থাকে ১৫০-২০০ কেজির মতো। তবে এখন আমি আর আমার কুমিল্লার একজন বন্ধু দু'জন মিলে একদিন পরপরই ৩০-৩৫ ক্যারেট আম পাইকারি দরে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করে আসি। তবে অনলাইনের মাধ্যমে আমের অর্ডার পেয়ে কুরিয়ার সার্ভিসে আম বিক্রি করলে একটু ডেলিভারি সংক্রান্ত সমস্যা পোহাতে হয় হয়। যেমন কুরিয়ার সার্ভিসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আম পাঠালে আম যেমন নষ্ট হবার ভয় থাকে তেমনি গ্রাহকের হাতে কখন আম পৌঁছবে সেই চিন্তা থেকেই যায়। তবে সব কিছু মিলিয়ে ব্যবসা ভালোই চলছে। ইনশাআল্লাহ সামনে পরিকল্পনা রয়েছে নিজেই একটি আমের বাগান কিনে ফেলার। এজন্য এ বছর শুধু অভিজ্ঞতা নিচ্ছি।