মেস ভাড়া নিয়ে ঝামেলায় জবি শিক্ষার্থীরা

  • 04 June
  • 09:08 AM

মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ, জবি প্রতিনিধি 04 June, 20

পুরো বিশ্বজুড়ে চলছে অদৃশ্য একশক্তি ও আতংকের রাজত্ব যার নাম করোনা ভাইরাস (কোভিট -১৯)। পৃথিবী আজ থমকে দাঁড়িয়েছে, চারিদিকে কোটি কোটি মানুষের আর্তনাদ ও মৃত্যুর মিছিল। মহামারি করোনাভাইরাস মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে ধস নামিয়ে দিয়েছে। উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো হয়ে যাচ্ছে মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্তরা পড়ে যাচ্ছে নিম্নবিত্তের কাতারে। আর নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষদের কি অবস্থা তা সবারই জানা সব ধরনের আয় উপার্জন পুরোপুরি বন্ধ। এ-ই পরিস্থিতিতে বাসার মালিক ও কতিপয় মেস ব্যবসায়ীদের তোপের মুখে পড়েছে একমাত্র অনাবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় নিরীহ শিক্ষার্থীরা।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ুয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। যাদের পড়াশুনার খরচ থেকে শুরু করে থাকা-খাওয়া, হাত খরচ সবই চলে টিউশনি বা খণ্ডকালীন চাকরি করে। কিন্তু সম্প্রতি নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বন্ধ হয়ে যায় তাদের এই উপার্জনের পথ। ফলে দেশের এই সংকটকালে বিপাকে পড়েন এসব স্ব-উপার্জিত শিক্ষার্থীরা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ১৪ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমি ফার্মগেট এ হোস্টেল এ থাকি। ভাড়া ৫৮০০ খাওয়া থাকাসহ। আব্বু ব্যাবসা করে, ঠিকাদারি, বিল পাস হয় নাই, খএউ অফিস বন্ধ ছিল, তার ওপর ঘুষের আনাগোনা। হোস্টেল ম্যানেজার কে বলা হইছে, আমি এসে টাকা দিবো। কিন্তু ওনারা শুনতে নারাজ। টাকা তাদের চাই। বার বার ফোন দিয়ে বলতেছে টাকা দিতে।

এইদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১৪ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মিথিলা দেবনাথ ঝিলিক বলেন, ‘সম্প্রতি করোনাভাইরাসের কারণে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ দিন বন্ধ আছে। আবার কবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে সেটিও এখন নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই টিউশন করে জীবিকা নির্বাহ করে। এখন আমাদের টিউশনসহ অন্যান্য আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে আছে, যার কারণে বাসা ভাড়া দিতে রীতিমত কষ্ট সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।'

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী নিশাত তাসনিম বলেন, দেশের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে উপার্জন না থাকায় নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। সবকিছু স্বাভাবিক হলেও যেসব বাসায় পড়াতাম, সেসব বাসায় আবার যেতে পারবো কি না তা নিয়ে শঙ্কায় আছি।

শুধু এই শিক্ষার্থীই নয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া আরো অনেকে এই সমস্যা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি তাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন তাহলে খুবই উপকৃত হবেন তারা। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যারা টিউশনি করে পড়াশুনার খরচ চালায় এমন শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে সাহায্য করতে পারে বলে মতামত দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মোস্তফা কামাল বলেন, আমাদের শিক্ষার্থী বেশি। তাদের হল সুবিধা না থাকায় সমস্যাও বেশি। যার কারণে স্থানীয়ভাবে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারছি না। তবে ক্যাম্পাস খুললেই এই ব্যাপারে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিবো। বেশি পরিমাণ শিক্ষার্থীর সমস্যার সমাধান রাষ্ট্রীয়ভাবেই করতে হবে। এর মধ্যেও যদি কোনো শিক্ষার্থীর আর্থিক সমস্যা দেখা দেয়, আমাদের জানালে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং এই বেপারে সর্বদা উদ্যোগী। পার্শ্ববর্তী থানায় জানালে তারাও সহযোগিতা করবে, ইতিমধ্যে এ-ই ব্যাপারে আমি কথা বলেছি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, 'ক্যাম্পাস খুললেই আমরা বাসা ভাড়া সমস্যা নিয়ে কাজ করবো। এখন কোনো সমস্যা হলে প্রক্টরকে জানালে তিনি ব্যবস্থা নিবেন। আমরা এখন শিক্ষার্থীদের খাবার ও চিকিৎসা সংকট নিয়ে কাজ করছি।'

‘করোনা মোকাবেলায় জবিয়ানের পাশে জবিয়ান’ ফান্ডের সেচ্ছাসেবক সুবর্ণ আসসাইফ বলেন, ফান্ডের উপহারের জন্য যেসব শিক্ষার্থীরা যোগাযোগ করছিলেন, তাদের অধিকাংশই ঢাকাতে টিউশনি করিয়ে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের পাশেও দাঁড়াতো। কিন্তু টিউশন বন্ধ থাকায়, পরিবার নিয়ে তারা বিপদে পড়েছে। লকডাউন উঠিয়ে নিলেও এসমস্ত শিক্ষার্থীদের ও তাদের পরিবারের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। কেননা এদের আয়ের উৎস টিউশন বা অন্যান্য ছোট খাটো কাজ। সামাজিক দূরত্ব ও নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা এ-ই মূহুর্তে কাজে নামতে পারছে না।

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের সংক্রামণ প্রতিরোধে সরকার কয়েক দফায় ছুটি বৃদ্ধি করেছে। সর্বশেষ এ ছুটি বাড়িয়ে ৩০ মে পর্যন্ত করা হয় এবং ১৫ জুন পর্যন্ত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ব্রিফিং অনুযায়ী করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়তে পারে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটির মেয়াদকাল, যা শিক্ষার্থীদের ওপর সৃষ্টি করছে বাড়তি চাপ। তাই খুব দ্রুতই স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফেরার প্রত্যাশা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য সকল শিক্ষার্থীদের।