মাদকের ভয়ানক থাবায় বিনষ্ট যুবসমাজ

  • 24 June
  • 04:35 PM

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 24 June, 21

মাদক বা ড্রাগস হল যুব সমাজের জন্য এক অন্যতম মারণ অসুখ। এই অসুখ একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে তার দংশনে নিঃশেষ করে দেয়। মাদকের ভয়াবহতা মাদকের হাতছানি সারা দেশে। শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। তার বিষাক্ত ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও সম্ভাবনা। সর্বনাশা মাদক ধ্বংস করে একটি মানুষের শরীর, মন, জ্ঞানবিবেক ও তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তার পরিবারের সব স্বপ্নকে এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যেক। শুধু পরিবারকে নয়, মাদকের কালো থাবা ধ্বংস করে একটি সমাজকে, একটি জাতিকে এবং পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এটি বৃহত্ আকার ধারণ করে একটি ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। তরুণ তাজা প্রাণের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ায় পিছিয়ে পড়ছে সমাজ। বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন পথে, মাদক ঢুকে পড়ছে আমাদের সমাজে। আর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের অবক্ষয়, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতা, হতাশা এবং মূল্যবোধের অভাবের সুযোগ নিয়ে মাদক তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে যুবসমাজের প্রতি। সাধারণত মানুষ বলে, "এটা আমাকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়, মানসিক চাপ থেকে দূরে রাখে, যে কোন পরিস্থিতিতে এক ধরণের নিয়ন্ত্রণ করতে পারার অনুভূতি হয়। মনে হয় সত্যিকারের বেঁচে আছি, তুমুল উত্তেজনা, তীব্র ভালো লাগা ইত্যাদি"  আধুনিক যুগে এই বদ্ধমূল ধারণা সত্যিই  মনোমুগ্ধকর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ এর কারিগররা প্রতিযোগিতায় নেমেছে  আর নেশাকে নিত্যদিনের সঙ্গী বানিয়েছে।

যুবসমাজের কাছেই ড্রাগের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। অথচ যুবক - যুবতীরাই যেকোনো দেশের ভবিষ্যৎ , তারাই চালিকাশক্তি। সাময়িক আনন্দ লাভের আশায় নবীন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা মাদকাসক্ত হয়ে ওঠে আর ধীরে ধীরে তাদের নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। ড্রাগের নেশার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ক্ষতিকর দিকের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এই সমস্ত মাদক যদি শরীরে একবার প্রবেশ করে তাহলে তা বার বার গ্রহণের তীব্র ইচ্ছা মানুষকে দিশেহারা করে দেয়। সেখান থেকে জন্ম নেয় অপরাধ প্রবণতা। নিয়মিত মাদক সেবনের জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তা জোগাড়ের জন্য মাদকাসক্ত ব্যক্তি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই করতেও দ্বিধাবোধ করে না। সর্বনেশে ড্রাগের নেশা ব্যক্তির পুরো স্নায়ুতন্ত্রকেই বিকল করে দেয়, শ‍রীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। শারীরিক ও আচরণগত ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। খিদে কমে যায়, ফলে দ্রুত ওজন কমতে থাকে। ঘুমের স্বাভাবিক সময়সীমা পরিবর্তিত হয়ে যায়। নাক দিয়ে রক্ত পড়ে, চোখের মনির স্বাভাবিক আকারে পরিবর্তন আসে আর চোখ সবসময় লাল হয়ে থাকে। মাদকাসক্ত ছাত্রছাত্রীরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত যেতে চায় না; নেশায় আসক্ত চাকুরীজীবীরাও কর্মক্ষেত্রে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। তারা পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে নিত্য নতুন নেশার ঠেকে নতুন নতুন বন্ধুত্বের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস সংক্রান্ত নানা জটিল রোগ এদের নিত্যসঙ্গী। ড্রাগ গ্রহণকারী একাধিক ব্যক্তি নেশা করার সময় অনেকক্ষেত্রে একই সিরিঞ্জ ব্যবহার করে, ফলে তারা মারণ রোগ এইডসের হাত থেকেও রেহাই পায় না। এ ভাবেই মাদকাসক্ত ব্যক্তি শরীর মন সব দিক থেকেই হতাশার গভীর অন্ধকারে ডুবে শেষ পর্যন্ত অকালে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আসলে মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। এর ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া দেখে অভিভাবকেরা যেমন দিশেহারা, ঠিক তেমনি চিকিৎসকরাও বিচলিত, আর সেই সঙ্গে প্রশাসনও আতঙ্কিত।

মাদকের সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব যদি কারোর ওপর পড়ে থাকে তবে তা হল এ পৃথিবীর যুবসমাজ। এই তরুণরা অতি সহজেই নতুন অজানা অনুভূতির প্রতি আকৃষ্ট হয়। সেজন্য অসাধু মাদক ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক লক্ষ্য হয় এই যুবসমাজই। বিশ্বজুড়ে হাইপোটনিক সিরিঞ্জ দিয়ে নিজের শরীরের ভেতর ভয়ঙ্কর মাদক রস চালান করে তরুণ সমাজের একটা বড় অংশ প্রতিনিয়ত নিজেদের ভবিষ্যতের যে অন্ধকার ডেকে আনছে তা রোধ করার ক্ষমতা হয়তো পৃথিবীর কোন প্রযুক্তির নেই। এছাড়াও নানা ধরনের প্রচলিত সহজলভ্য মাদকের ব্যাপক প্রভাব তো রয়েইছে। শরীর তথা মনের ওপর মাদকের ভয়ঙ্কর প্রভাব নিয়ে ইতিপূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। যুবসমাজ হল পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। এদের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে উন্নতির অনন্ত সম্ভাবনা। সম্ভাবনাময় এই ভবিষ্যতের শরীর তথা মন যদি মাদকের রসে বিষাক্ত হয়ে ওঠে তাহলে সমাজ, রাষ্ট্র তথা পৃথিবীর ভাগ্য অন্ধকারের অতলে নিমজ্জিত হয়। স্বাভাবিকভাবে সভ্যতার উন্নতি ব্যাহত হয়। সমাজের নিম্ন স্তর থেকে আধুনিক রাষ্ট্রকেও এই ব্যাপারে অনেক বেশি কার্যকরী হয়ে উঠতে হবে। সমাজের সর্বস্তরে গড়ে তুলতে হবে সচেতনতা। গঠনমূলক শিক্ষার বহুমুখী বিস্তার ঘটাতে হবে। মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর দিকগুলি মানুষের কাছে আরো বেশি করে তুলে ধরতে হবে। আধুনিক গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে এই সচেতনতা গড়ে তোলা যেতে পারে।
তদুপরি মাদক ব্যবসা এবং চোরাচালানকারীদের চক্র ধ্বংস করার ক্ষেত্রে পৃথিবীকে আরো অনেক বেশি সক্রিয় হতে হবে। যুবক যুবতীদের জন্য সৃষ্টি করতে হবে কর্মসংস্থান। সুস্থ বিনোদনকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন প্রজন্ম তথা সমস্ত মানুষকে নেশার অমোঘ হাতছানি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে উঠলে তবেই সে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসতে চাইবে। সমাজের সর্বস্তরে যোগব্যায়াম, জিমনাস্টিক, ধ্যানচর্চা ইত্যাদি শরীর গঠনমূলক কার্যক্রমের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। অন্যদিকে যে সমস্ত মানুষেরা ইতিমধ্যেই নেশার কবলে জর্জরিত তাদের সুস্থ করে তোলার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আরো বেশি করে গড়ে তুলতে হবে নেশা মুক্তি কেন্দ্র। মানুষকে শিখতে হবে মাদককে ঘৃণা করতে, মাদকাসক্তকে নয়। বুঝতে হবে মাদকাসক্তি কোন ট্যাবু নয়, নিছকই একটি সামাজিক রোগ। সৃষ্টির সেই আদি লগ্ন থেকে মাদকাসক্তি সমাজের জন্য একটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই অভিশাপ সমাজের অগ্রগতিকে প্রতিহত করে। সমাজে মূল্যবোধ গড়ে উঠতে বাধা দেয়। ফলে আমাদের সকলের সুন্দর ও নির্মল এক সমাজের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। আধুনিককালে বিজ্ঞানের এই সর্বময় জয়যাত্রার যুগে আমাদের চেষ্টা করতে হবে বিজ্ঞান কে কাজে লাগিয়ে সমাজের এই সমস্যাকে নির্মূল করার।সর্বোপরি, মাদকাসক্তি আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে আমাদের তরুণ সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নীরবে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে উদাসীন না হয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সর্বনাশা এই মাদক থেকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। তাই রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকেও সচেতন হতে হবে।


লেখক: সুরাইয়া ইয়াসমিন তিথি
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।