বেঁড়িবাধে প্রভাবশালী চিংড়ি চাষীদের অবৈধ পাইপ স্থাপন, ডুবছে কয়রাবাসী

  • 13 June
  • 10:41 AM

মোঃ ইকবাল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি 13 June, 21

খুলনার কয়রায় পানি ‍উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এর বেড়িবাঁধে অবৈধভাবে পাইপ বসিয়ে লবণ পানি উত্তোলন অব্যাহত থাকায় বার বার নদী ভাঙ্গনে প্লাবিত হতে হচ্ছে উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। বার বার হুমকির মুখে পড়ছে বেড়িবাঁধ। যে কেনো সামান্য দুর্যোগ ও ঝড়ে মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে ওই এলাকা প্লাবিত হচ্ছে একরে পর এক।পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোটি কোটি টাকা খরচ করে বেঁড়িবাধ ৬ মাস না যেতেই আবার ভাঙ্গন দেখা দেয়। বেঁড়িবাধে ভাঙ্গনের আশঙ্কায় আতঙ্কে থাকে এলাকাবাসি।

এলাকবাসির সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০১৮ সালে বছরের শুরুতেই অনেকটা ঢাকঢোল পিটিয়ে বাঁধে বসানো অবৈধ পাইপ অপসারণের কাজে নেমেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ জন্য চিংড়ি চাষিদের সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তাতে সাড়া না দেওয়ায় সর্বশেষ তালিকা তৈরি করে অবৈধ পাইপ অপসারণের জন্য এসব চিংড়ি চাষিদের নামে নোটিশ জারী করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে এসব এলাকায় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ঘের মালিকদের বিরুদ্ধে পাউবোর কর্মকর্তারা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন। যে কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপই ফলপ্রসূ হচ্ছে না। তবে পাউবোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিরা বলেন, অপরিকল্পিতভাবে বসানো এসব পাইপ দিয়ে নিয়মিত নদীর পানি সরবরাহের কারণে বাঁধের ওই সব স্থান দিয়ে ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে। সিডর, আইলা ও আম্ফান নামক প্রাকৃতিক দুর্যোগে কয়রা উপজেলায় যেসব স্থানে ভেঙে প্লাবিত হয়েছিল, সেসব স্থানে বাঁধ ছিদ্র করে চিংড়ি চাষিরা পাইপ বসানো ছিল। এসব বাঁধ মেরামত করতে একদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতিসহ তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চিংড়ি চাষের জন্য বাঁধ যথেচ্ছভাবে কাটা ও ছিদ্র করায় বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। লবণ পানি তোলার ফলে জমির উর্বরতা কমে আসছে। যে কারণে জমিতে ধানের আবাদ অনেক কম হচ্ছে। সরাসরি বাঁধ কাটে পানি তোলার পাশপাশি যেখানে-সেখানে ছিদ্র করে পাইপ বসানো হয়। এতে বাঁধের নদপারের জমি ভেঙে নদে বিলীন হয়েছে ও হচ্ছে । এখন বাঁধ ভাঙছে। বর্ষাকাল মানে আতঙ্ক। লবণ পানির ঢেউ লেগে কাঁচাপাকা রাস্তাঘাট প্রতিনিয়ত ধসে পড়ছে। বিশেষ করে এলাকার গাছপালাসহ সবুজ বৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কারণে চিংড়ি চাষ বন্ধে এলাকাবাসি পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে কয়েকবার লিখিত আবেদন করেছেন বলে অনেকেই জানিয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, কয়রা উপজেলায় পাউবোর ১৩-১৪/২ ও ১৩- ১৪/১ নম্বর পোল্ডারে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ কেটে কিংবা ছিদ্র করে ৩০০টি অধিক স্থানে পাইপ ও নাইন্টি বসানো হয়েছে। মূলত আম্ফানে বেঁড়িবাধ ভেঙ্গে প্লাবিত হওয়ার প্রধান কারণ এটি। বেঁড়িবাঁধ সব সময় ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ১৩-১৪/২নং পোল্ডারে বানিয়াখালি এলাকার ১১৭ জন, ১৩-১৪/১ নম্বর পোল্ডারে আংটিহারা এলাকায় ৭৮ জন এবং ১৩-১৪/২নং পোল্ডারে কয়রা উপজেলায় নির্মিত পবনা ক্লোজার, লোকা,দশহালিয়া, মদিনাবাদ, মঠবাড়ি, শিকারী বাড়ি ক্লোজার, নয়ানি স্লুইসগেট সংলগ্ন, কাটকাটা, গাজীপাড়া, কাটমারচর কয়রা সদরের অনেক জায়গা গোবরা, ঘাটাখালি, হরিণখোলা , জোড়শিং, আংটিহারা, গোলখালি এলাকারআংটিহারা, গোলখালি, মহারাজপুর, কয়রা, বাগালি ও মহেশ্বরীপুর এলাকায় ১১৯ জন অবৈধভাবে বাঁধ কেটে পাইপ বসানো চিংড়ি চাষির নামে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পাউবোর মহাপরিচালকের দাপ্তরিক আদেশ মোতাবেক সাতক্ষীরা পওর বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাক্ষরিত এ নোটিশ দেওয়া হলেও কেউ সে নির্দেশ মানতে নারাজ ওই সকল চিংড়ি চাষীরা।

বরং পাউবোর নির্দেশ উপেক্ষা করে প্রতিনিয়তই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের তলদেশ ছিদ্র করে পাইপ বসিয়ে নদী থেকে পানি উত্তোলনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ব্যাক্তিবর্গ । ফলে নতুন করে কয়রা উপজেলা আবার প্লাবিত হওয়ার আশঙকা রয়েছে। এতে কিছু প্রভাবশালী চিংড়ি চাষীরা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের কয়রাবাসী।

আমাদী পাউবোর সেকশন কর্মকর্তা মশিউল আবেদিন বলেন, বেঁড়িবাঁধ ভাঙ্গনের প্রধান কারণ হলো লোনা পানি উত্তোলন করে বেঁড়িবাধের পাশে ঘের করা। নদীর পানি ও চিংড়ি ঘের ২ পাশে সব সময় পানি থাকায় বেঁড়িবাধের মাটি দুর্বল হয়ে যায় ফলে সামান্য ঢেউয়ে বাড়িতে ভেঙ্গে যায়। তিনি আরও বলেন, আমরা কয়েক বার প্রশাসনের সহায়তায় বেঁড়িবাধে অবৈধ পাইপ অপসারন করি কিন্তু পরবর্তীতে তারা আবার স্থাপন করে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোঃ আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন,পরিবেশের ক্ষতি এবং সরকারি সম্পদ নষ্ট করে অবৈধ পাইপ দিয়ে পানি উত্তোলন করে চিংড়ি চাষ করা যাবে না। আর তা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, অতি দ্রুত বেঁড়িবাধে অবৈধ পাইপ ও কল অপসারণ করার জন্য পাউবোর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।