বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বায়ু ও শব্দ দূষণের প্রভাব শীর্ষক ওয়েবিনার

  • 05 June
  • 11:11 PM

সাজিয়া আফরিন সৃষ্টি, স্ট্যামফোর্ড প্রতিনিধি 05 June, 21

'পরিবেশ পুনরূদ্ধার হোক, সময়ের অবস্থান' এই প্রতিবাদ্যকে সামনে রেখে ৫ জুন (শনিবার) বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২১। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং বায়ু মন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ এর যৌথ উদ্যোগে একটি বিশেষ ওয়েবিনার সংঘটিত হয়।

শহরের বাস্তুতন্ত্রের উপর বায়ু এবং শব্দ দূষণ এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয় এই ওয়েবিনারে।
ওয়েবিনার এর সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র সম্মানিত সভাপতি সুহানা কামাল এবং সঞ্চালনা করেন বাপা-র সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল।

আলোচক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এর চেয়ারম্যান এবং প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক ক্যাপস এবং যুগ্ম সম্পাদক বাপা বলেন, ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করছি যখন সারাবিশ্বের মানুষ ঘরে ঢুকে আছে, এই সময় মানুষের পরিবেশ রিয়েস্টোরেশন এর বিষয় টি মাথায় এসেছে। মানুষ যদি দূষণ কম করে অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ বন্ধ করে তাহলে কিন্তু ইকোসিস্টেম বা বস্তু সংস্থান নিজে নিজে রিস্টোর করে। এই বিষয় টিকে মাথায় রেখেই এবারের পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন।

বাংলাদেশে নগর ইকোসিস্টেম এর প্রভাব দেখিয়ে তিনি বলেন, ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট প্রতিবছর বিশ্বের অবসবাসযোগ্য এলাকার তালিকায় গত তিন বছর থেকে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয় অবসবাসযোগ্য এলাকা।
শব্দ দূষণ এর মূল কারণ হিসেবে বলেন, গাড়ির যান্ত্রিক শব্দ, রেললাইন এর শব্দ, বিভিন্ন বিল্ডিং বা কল কারখানার শব্দ, উচ্চ বাদ্যযন্ত্র প্রভৃতি। ক্যাপস এর গবেষণা দল ঢাকা শহরে ৭০ টি এলাকায় শব্দ দূষণ জরিপ কার্যক্রম করে। গবেষণায় দেখা যায় নীরব, আবাসিক ও মিশ্র এলাকার ক্ষেত্রে শব্দের মাত্রা ১০০ ভাগ,বাণিজ্যিক এলাকার শব্দের আদর্শ মানের চেয়ে ৯৭.৫৮ ভাগ এবং শিল্প এলাকায় শব্দের মাত্রা আদর্শ মানের চেয়ে ৭১.৭৫ ভাগ সময় বেশী মাত্রায় ছিলো।
সবশেষে তিনি বলেন আমাদের দূষণ কমাতে হবে নয়তো মানুষের জীবনযাত্রা এবং বেঁচে থাকাটাই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে।

অধ্যাপক ড. মোঃ কামরুল হাসান,প্রাণীবিজ্ঞান অনুষদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তার বক্তব্যে বলেন, শব্দ এবং বায়ু দূষণ প্রাণীকুলের উপর যেসব প্রভাব পড়ে তা উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, শহরাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী যেমন সরীসৃপ, পাখি,স্তন্যপায়ী প্রাণী প্রভৃতি। মানুষের উপর বায়ু ও শব্দ দূষণ যেমন প্রভাব ফেলে এসব প্রাণীর উপর ও একি রকম প্রভাব ফেলে। বায়ু দূষণ এর ফলে বাস্তুতন্ত্র বা খাদ্য শৃঙ্খল প্রথম স্তরে যখন উদ্ভিদকূল ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই সাথে প্রাণীকূলও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রাণীকূলের প্রজননের সময় বায়ু দূষণ হলে প্রভাব বেশি পড়ে।
বায়ু দূষণ ও শব্দ দূষণ যদি সহনীয় মাত্রায় বেড়ে যায় তাহলে মানুষের সাথে বসবাসকৃত প্রাণীগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, উদ্ভিদ বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভিদ জগতের উপর বায়ু ও শব্দ দূষণের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, সবুজ বর্ণধারী উদ্ভিদ যার উপর সকল প্রাণীজগৎ নির্ভরশীল। মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাসে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছেড়ে দিচ্ছে, গাছ সেটি গ্রহণ করছে এবং বিনিময়ে অক্সিজেন দিচ্ছে এটি ইকোসিস্টেমের প্রথম কার্যক্রম। বাংলাদেশে প্রায় ৫-৬ ধরনের ইকোসিস্টেম রয়েছে। ইকোসিস্টেম কার্যক্রম যদি সঠিকভাবে না হয় তাহলে তার অন্যান্য কার্যক্রম গুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, শব্দ দূষণ পশুপাখির উপর প্রভাব ফেলে এবং পশুপাখি উদ্ভিদের উপর প্রভাব ফেলে। এভাবে চলতে থাকলে ইকোসিস্টেম এর সহায়তাগুলো পাওয়া যাবে নাহ।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এর সাবেক পরিচালক এবং আহ্বায়ক পরিবেশ স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ডাঃ এম এ জাকির হোসেন বলেন, শব্দ ও বায়ু দূষণ মানবদেহে বিভিন্ন ক্ষতি করতে পারে যেমনঃ কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, লেড,অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন সালফাইড প্রভৃতির উপস্থিতি শরীরে বেড়ে যায় এবং মানবদেহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। প্লাস্টিক পুরালে ডাই-অক্সাইড, ফিউরান,মার্কারী, বাই ফিনাইল, ক্লোরাইড, ব্রোমিন প্রভৃতি পাওয়া যায় যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
সবশেষে তিনি বলেন, আমাদের উচিত যথাযথ আইন প্রয়োগ এবং সেই আইনের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা।

ড. নিতিশ চন্দ্র দেবনাথ, জাতীয় সমন্বয়ক, ওয়ান হেলথ বাংলাদেশ সদস্য (বাপা) এবং ফাউন্ডিং ভাইস চ্যান্সেলর চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এবং এনিমেল সাইন্স ইউনিভার্সিটি বলেন, পরস্পর নির্ভরশীলতা পৃথিবীর একটি স্বভাবসুলভ চরিত্র কিন্তু এই ধারণা টি আমরা খুবই কম মানি।প্রকৃতি থেকে প্রায় ২৫ টি রোগের উদ্ভব ঘটেছে। প্রকৃতিকে যত্নের সাথে সুরক্ষা না করতে পারি তাহলে আমাদের পুরো প্লানেটের জীবন সংকটের মুখোমুখি হবে।
তিনি আরও বলেন, জনস্বাস্থ্যের সাথে পরস্পর নির্ভরশীলতার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সাথে সাথে ওয়ান হেলথ মুভমেন্টকে আরও গতিশীল করা। আমার স্বাস্থ্য বলে প্রতিকূল বিষয় নাই মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশের স্বাস্থ্য, প্রাণীকুলের স্বাস্থ্য এবং উদ্ভিদকূলের স্বাস্থ্য এসবাইকে রক্ষা করার মাধ্যমেই আমরা সকলে ভালো থাকবো,সুস্থ থাকবো।

জনাব হুমায়ূন কবির, অতিরিক্ত মহাপরিচালক পরিবেশ অধিদপ্তর, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ভাবে আমাদের প্রাকৃতিক জীবনধারণ যে পরিবর্তন সেটিকে নানাভাবে ধ্বংস করে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি এবং কার্বন নিঃসারণ করছি।ফলে দেশের উপর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছি পরিবেশ নিয়ে।
তিনি আরও বলেন, শব্দ দূষণ রোধে প্রায় ৯৪ হাজার মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ গ্রহণে প্রকল্প গঠন করা হয়েছে। শব্দ দূষণকে বন্ধ করতে না পারলেও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এটি সমাজ, জনগণ এবং পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এই বিষয়টিকে উপলব্ধিতে আনতে পারলে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টিকে বাস্তবায়ন করা সফল হবে।

ড. গুলসান আরা লতিফা, জুলোজি সোসাইটি অফ বাংলাদেশ, একাডেমিক উপদেষ্টা বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ তার বক্তব্যে বলেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ কিন্তু আমাদের রিসোর্স সীমিত। আমরা যদি মিতব্যয়ী না হই তাহলে কখনও রিসোর্স ঠিকভাবে রাখতে পারবো না। ২০১৯ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন দেখিয়েছে বাংলাদেশের বায়ু দূষণ ১৫১-২০০।বায়ু দূষণের জন্য সকল উদ্ভিদ এবং প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এগুলোকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।

অধ্যাপক ড. মাহবুব হোসেন, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাপার অন্যতম সংগঠক বলেন, ঢাকা শহরের বাতাসে ৯ ধরনের প্যাথোজেন যারা ডিজিজ করে, ব্যাকটেরিয়া আছে। এগুলো থাকার একমাত্র কারণ ধুলো বেশি। ধুলো যত কম থাকবে প্যাথোজেন ততো কম থাকবে। এজন্য এই বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতে হবে সকলের।

অনুষ্ঠানের সভাপতি সুহানা কামাল সকলকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সমাপনী বক্তব্যে বলেন, 'শব্দ দূষণ এবং বায়ু দূষণ এর কারণ গুলোকদ চিহ্নিত করে তা দূর করার চেষ্টা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যে পরিবেশে আমরা বেড়ে উঠি সেটি আমাদের জন্য প্রয়োজন। পরিবেশকে রক্ষা করা আমাদের মানবিক দায়িত্ব। প্রকৃতিকে ব্যবহার করার পাশাপাশি প্রকৃতিকে রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব।'