‘বাবা : জীবন যুদ্ধের অপরাজেয় যোদ্ধা’

  • 21 June
  • 11:21 AM

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 21 June, 20

"বারংবার সেলাইয়ের পরও
পা-এর জুতোজোড়া নতুন থাকে যার,
তাকে আমরা 'বাবা' ডাকি,
তাঁরই ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে পুরো পরিবার । "

উপরোক্ত চারটি বাক্য একটু হলেও আমাদের আভাস দিতে পারে "বাবা" কথাটা আমাদের জন্যে ঠিক কতখানি অর্থ বহন করে । "বাবা" শব্দটা উচ্চারণ করলেই কল্পনায় ভেসে ওঠে প্রশান্ত একখানা মুখ যার কপালের ভাজে অসংখ্য চিন্তার রেখা, হাতের মাঝে মুষ্টিবদ্ধ সংসারের আয়-রোজগার, চোখে কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন যা পূর্ণতা পেতে চায় সন্তানের মাঝে, আর তার পা জোড়া যেন সর্বদাই সবাইকে ভালো রাখার পথটা খুঁজে পেতে ব্যস্ত । "বাবা" পরিবারের এমন একজন মানুষ যার শার্টের রঙ কখনো নষ্ট হয় না, যার জুতো জোড়া সেলাই করতে করতে মুচিও বোধ করি ক্লান্ত হয়ে যায়, যার মানিব্যাগটার চামড়া উঠে যাওয়া সত্ত্বেও নতুন থাকে সবসময় ।
সন্তান যেমনই হোক না কেন বাবার কাছে সে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় স্নেহের জায়গা । আর বাবা সন্তানের জন্যে শেষ আশ্রয় । বাবা বুকে আগলে রাখেন পুরো পরিবারকে । বাইরের পৃথিবীর যত ঝড় - ঝাপ্টা সবকিছু সামলে তিনি বটবৃক্ষের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন সংসারের কর্তা হয়ে।
সন্তান, সংসারের জন্য বাবার করা আত্মত্যাগ বর্ণনা করে শেষ করবার মতো নয় । কিন্তু বিনিময়ে তিনি কি পান সন্তান কিংবা সংসারের সবার কাছ থেকে ?
বৃদ্ধ বয়সে নিজের সন্তানের সংসারে থাকতে গেলে অনেক সময়ই হাতে উঠে আসে বাজারের ব্যাগ কিংবা কাঁধে এসে পড়ে নাতী-নাত্নীকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসার দায়িত্ব । চাকরি থেকে অবসর নিতে পারলেও সংসার বাবাকে অবসর দেয় না কোনোদিনই । তিলতিল করে বড় করে তোলা, প্রতিষ্ঠিত সন্তানের ঘরে একটু ঠাঁই ও হয় না কোনো কোনো হতভাগা বাবার । সেই হতভাগা বাবাদের জায়গা হয় "বৃদ্ধাশ্রম" নামক কোনো একটা জায়গায়। তবে কি এই তাদেরকে দেওয়া আমাদের প্রতিদান ? তাহলে কি এই নতুন ঠিকানার সন্ধান দেওয়ার জন্যই এত কষ্ট, এত শ্রমের মধ্য দিয়ে সন্তানকে বড় করে তোলা ? এটাই কি বাবার ন্যায্য প্রাপ্তি ?
তবে, আমরা আশাবাদী । আমরা আশা করি এই সমাজের প্রতিটি সন্তান বুঝতে পারবে আমরা যত বড়ই হই না কেন আমাদের মাথায় রাখবার জন্য বাবার ঐ হাতটা ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ । কখনো যেন বাবার কোনো বিষাদ পূর্ণ দীর্ঘশ্বাসের কারণ আমরা না হই ।
যে বাবা হাজারটা অপূর্ণ স্বপ্ন ধারণ করে পুরো পরিবারকে জীবন দিয়ে আঁকড়ে থাকেন সেই বাবার জীবনের স্বপ্ন গুলো আমাদের দ্বারাই যেন পূর্ণতা পায়।

আমি আমার এইটুকু জীবনে বাবার অকৃত্রিম,অপার ভালোবাসা পেয়েছি । মেয়েরা সাধারণত বাবার কাছে বেশি আদরের হয় । কিন্তু আমার মা বলতেন আমার জন্য বাবার ভালোবাসাটা নাকি মাত্রাতিরিক্ত । বড় হওয়ার পর ও জড়িয়ে ধরে আমাকে আদর করা, যখন তখন যে কোনো আবদার পূরণ করা আরও নানা বিষয়ে মা এর ছিলো হাজারটা অভিযোগ । কিন্তু এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বাবা কোনোদিন উচু গলায় আমার সাথে কথা বলতেন না, সুন্দর সহজ ভাবে পৃথিবীটাকে দেখতে শেখাতেন । প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো সার্টিফিকেট ছিলো না বাবার । তিনি ছিলেন জীবনের শিক্ষায় শিক্ষিত সহজ-সরল একজন মানুষ । জীবনের এই শিক্ষার মাধ্যমে তিনি আমাকে শিখিয়েছেন এই পৃথিবীর কণ্টকাকীর্ণ পথে কিভাবে চলতে হয় । জীবনটা তাঁর কাছে ছিলো সহজ । জটিলতা - কুটিলতার কোনো জায়গা ছিলো না বাবার কাছে । আমার জন্যে সুন্দর কোনো পোশাক কিংবা কোনো বই কিনতে পারার মাঝে বাবার অপার আনন্দ লুকিয়ে ছিলো । বারবার পরীক্ষায় হতাশাজনক রেজাল্ট করা সত্ত্বেও বাবাকে আমি কখনো নিরাশ হতে দেখিনি। তিনি তাঁর কোনো সিদ্ধান্ত আমার ওপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন না । আমাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট স্বাধীনতা এবং দিকনির্দেশনা দিতেন বাবা । বাবার সরলতা এবং অপরকে অগাধ বিশ্বাসের কারণে আমি জীবনে বহুবার তাকে তাঁর একান্ত আপনজনদের কাছে ঠকে যেতে দেখেছি । কিন্তু ঠকে যাওয়ার পরও কখনো বাবার মাঝে কোনো অসন্তোষ দেখিনি । ঘরের কারো সাথে উচ্চবাচ্য করা কিংবা কায়িক শ্রমের পর বাড়ি ফিরে রাগ দেখানো এগুলো যেন তিনিই জানতেনই না । কাউকে অভিযোগ করতেন না কখনো । বাবা বলতেন তাঁর যা কিছু আছে তাই নিয়ে তিনি যথেষ্ট সুখে আছেন । কোনোদিন বাবার মাঝে আমি অর্থের জন্য তৃষ্ণা দেখিনি। তবে প্রবল তৃষ্ণা দেখেছি আমার জন্যে । তিনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন কিভাবে একটা কলমকে অস্ত্র হিসেবে ধরে জীবন যুদ্ধে লড়াই করতে হয় । বাবা সবসময় চাইতেন আমি যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজ ও দেশের কল্যাণে অবদান রাখতে পারি । বাবা আরও চাইতেন আমার পরিচয়ে পরিচিত হতে । তিনি যেন গর্ব করে সবার কাছে তাঁর মেয়ের পরিচয় বলতে পারেন। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য ! আমার জীবনের দুঃসময় কেটে গিয়ে সুন্দর মুহুর্ত গুলোতে আমি বাবাকে পাশে পাইনি । সাফল্যের স্পর্শ আমার জীবনে আশার অনেক আগেই হারিয়েছি আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আর সব থেকে ভালবাসার মানুষটিকে । প্রায় তিনটি বছর দুরারোগ্য কোনো এক ব্যাধিতে ভুগে বাবা পাড়ি জমান পরপারে । তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত গুলোতেও তিনি আমার জন্য ভালোবাসার কোনো কমতি রাখেননি । একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন আমার দিকে যেন কতকাল পরে তিনি দেখছেন আমায় । বাবার এই অফুরান ভালবাসায় সিক্ত আমি এজন্যই সবসময় নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করি । আজও আমি তাঁর দেখানো পথে হাঁটছি । তাঁর দেখানো স্বপ্নটাকে নিজের জীবনীশক্তি হিসেবে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি জীবনের পথে । একদিন সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করবেন ইনশা-আল্লাহ !
সবশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, বাবারা জীবন যুদ্ধের অপরাজেয় যোদ্ধা । তাদের করা আত্মত্যাগ আমাদের পক্ষে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয় কিন্তু আমরা চাইলেই পারি তাদের বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন হতে । যাদের আঙুল ধরে হাঁটতে শেখা, শেষ বয়সে তাদের হাত ধরে আমরাই যেন চলার পথের সঙ্গী হতে পারি এই "বাবা দিবস" এ আমি সেই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করছি ।


লিখেছেন -

মুনিয়া ইসলাম
শিক্ষার্থী
প্রথম বর্ষ ( সম্মান)
বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগ (তৃতীয় ব্যাচ)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়