বজ্রপাত: সাম্প্রতিক সময়ে ভয়ানক এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম

  • 25 Aug
  • 07:36 PM

মোঃ জাহিদ হোসেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 25 Aug, 21

আমরা কমবেশি সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে পরিচিত এবং এদের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত।প্রতিবছর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে (যেমন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা,ভূমিকম্প ইত্যাদি) অনেক মানুষ নিহত এবং আহত হচ্ছে। এছাড়া গৃহ,গৃহপালিত পশু কিংবা ফসলের মাঠের মারাত্মক ক্ষতির মাধ্যমে অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে।সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাত এখন নতুন আতংকের নাম।গতকাল দিনাজপুরে একটি ফুটবল মাঠে বজ্রপাতে ৪টি জলজ্যান্ত শিশু মারা যায়!এর কিছুদিন আগে আগস্টের ৪তারিখে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পাড়ের একটি ঘাটের ঘরে বজ্রপাতে সতের জনের মৃত্যু হয়েছে!২০১৬ সালে বজ্রপাতে সারাদেশে ৩১০ জন মানুষ নিহত হওয়ার পর সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে।এবং অনেক কাযকরী পদক্ষেপ নিলেও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রথমে আসি বজ্রপাত কি?

পানি যখন বাষ্প হয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে তখন মেঘের নিচের দিকে ভারী অংশের সাথে জলীয়বাষ্পের সংঘর্ষ হওয়ায় অনেক জলকণার ইলেকট্রন ত্যাগ কৃত হয়ে ধনাত্মক চার্জ এ পরিণত হয় এবং অনেক জলকণা সে ইলেকট্রন গ্রহণ করে ঋণাত্মক চার্জে পরিণত হয় ।
ডিসচার্জ প্রক্রিয়া ৩ ভাবে হয়ে থাকে । যথা:
১) একই মেঘের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ এর মধ্যে
২)একটি মেঘের ধনাত্মক চার্জ এর সাথে অন্য মেঘের ঋণাত্মক আবার অন্য মেঘের ধনাত্মক চার্জ এর সাথে ওই মেঘের ঋণাত্মক চার্জ এর মধ্যে ।
৩)মেঘের পজেটিভ আধানের ও ভূমির মধ্যে । একে ক্লাউড টু গ্রাউন্ড ডিসচার্জিং বলে ।
এ চার্জিত জলীয় বাষ্প মেঘে পরিণত হলে মেঘে বিপুল পরিমাণ স্থির তড়িৎ উৎপন্ন হয় । এ সময় অপেক্ষাকৃত হালকা ধনাত্মক আধান মেঘের উপরে এবং অপেক্ষাকৃত ভারী ঋণাত্মক চার্জ নিচে অবস্থান করে । মেঘে এই ২ বিপরীত চার্জের পরিমাণ যথেষ্ট হলে ডিসচার্জ প্রক্রিয়া শুরু হয় ।
ডিসচার্জিং এর ফলে বাতাসের মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক স্পার্ক প্রবাহিত হয় । এ বৈদ্যুতিক স্পার্ক এর প্রবাহ - ই বজ্রপাত । কিন্তু সব বজ্র কিন্তু ভূপৃষ্ঠে পড়ে না । শুধু ক্লাউড টু গ্রাউন্ড ডিসচার্জিং এর ফলে সৃষ্ট বজ্র-ই ভূপৃষ্ঠে পড়ে ।"

বজ্রপাতের সময়কালঃ
সাধারণত মার্চ-এপ্রিল এই সময়কালকে বজ্রপাতের সময়কাল ধরা হয়। তাছাড়া মৌসুমগত আবহাওয়ার পবির্তনের সময়েও বজ্রপাতের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। এ জন্যে জুন-জুলাইয়েও বজ্রপাতের প্রবণতা দেখা যায়।

বজ্রপাতের কারণঃ
বজ্রপাত হওয়ার অসংখ্য কারণ রয়েছে।কিন্তু তার মধ্যে বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার একটা অন্যতম কারণ হলো বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য, তেমনই আরো একটা কারণ তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। আর এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত পরিবেশ দূষণ।পরিবেশ দূষণের মাত্রা যত বাড়ছে, গড় তাপমাত্রা তত বাড়ছে। ফলে বজ্রগর্ভ মেঘ (কিউমুলোনিম্বাস)তৈরি হওয়ার আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

বজ্রপাত প্রবণ এলাকাসমূহঃ
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল যেখানে বিস্তৃত হাওর অঞ্চলগুলোকেই বজ্রপাতের ঝুঁকিপন্ন অঞ্চল হিসেবে ধরা হয়।এছাড়াও বাংলাদেশের গ্রাম-অঞ্চল গুলোতে এখন বজ্রপাতে হতাহতের খবর পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জে। প্রাণহানিও বেশি সেখানে। গত ১২ বছরে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি বিশ্লেষণ করে দুর্যোগ ফোরাম দেখেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হাওর এলাকাই এককভাবে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা। এ ছাড়া যশোর-সাতক্ষীরা অঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট এলাকাতেও বজ্রপাতে হতাহতের ধারাবাহিক প্রবণতা আছে।

বজ্রপাতের প্রভাবঃ
বজ্রপাত জনজীবনের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলছে।মানুষ শারীরিক ভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঠিক তেমনি অর্থনৈতিক ভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।২০১৬ থেকে ২০২১ সালের ৬ জুন পর্যন্ত মারা যাওয়া ১ হাজার ৭৩৮ জনের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই ছিলেন পরিবারের একমাত্র অন্ন জোগানদার। সংসারের মূল আয়রোজগারের কান্ডারি বিনা নোটিশে চলে গেলে সংসারে মেরামত–অযোগ্য ধস নামে। বজ্রপাতে আহত হয়ে বেঁচে থাকলেও আগের মতো কর্মক্ষমতা থাকে না। আমাদের দেশে বজ্রপাতে আহতদের হিসাব কোথাও পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয়, বজ্রপাতে নিহতের চেয়ে ৪-৫ গুণ মানুষ আহত হন।বজ্রপাতের প্রভাবে বহু কৃষকের গৃহপালিত পশু কিংবা মুরগীর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবর মতে বছরে এখন পর্যন্ত ২১৩ জন নিহত হন,আহত প্রায় হাজারখানেক লোক।
জমির উর্বরতা বৃদ্ধি,চা গাছের ফলন বৃদ্ধি ইত্যাদি এই উপকারগুলো বজ্রপাতের ফলে হলেও এর ভয়াবহতা সত্যিই অনুতাপের বিষয়।

বজ্রপাতের সময় যে সতর্কতা গুলো অবলম্বন করতে হবেঃ

আবহাওয়াবিদদের মতে বজ্রপাত শুরু হওয়ার অন্তত আধঘন্টা মানুষকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে।ধাতব ও ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র স্পর্শ করা যাবে না।ফসলের মাঠে,উঁচু গাছের নিছে কিংবা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিছে না দাড়িয়ে সম্ভব হলে বিল্ডিং এ অবস্থান করতে হবে।বজ্রপাতের সময় খালি পায়ে না থাকাটাই উত্তম।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করণীয়ঃ
প্রথমে সরকারকে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণা করার পর কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল।বজ্রপাত রোধে ও সতর্কীকরণে বিশেষ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে সরকার কিছু কর্মকর্তা বিদেশে পাঠিয়েছেন প্রশিক্ষণের জন্য।কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা বজ্রপাতের রোধে টাওয়ার স্থাপনের কোনো সুস্পষ্ট নকশা তৈরি করতে পারেন নি।হাওর অঞ্চলসহ বিস্তৃত অঞ্চলগুলোতে তালগাছ রোপণ করার পাশাপাশি তালগাছ কাটা বন্ধ করতে হবে।সাধারণত ডোঙ্গর বানানো সহ অন্যান্য যেসব কাজে তালগাছ ব্যবহার করা হচ্ছে সেসমস্ত কাজ বন্ধ করতে হবে।নড়াইলের কিছু হাটে তালগাছের বেচাকেনা হয়,এছাড়া ও আরো কিছু হাটে হয় সেই হাটগুলো চিহ্নিত করে চিরতরের জন্য বন্ধ করতে হবে।বজ্রপাত প্রবণ এলাকাগুলো বজ্রপাত ডিটেকটিভ সেন্সর এবং বজ্রপাত নিরোধক দন্ড যতদ্রুত সম্ভব কার্যকররূপে স্থাপন করতে হবে। মোটকথা সরকারকে যতদ্রুত সম্ভব বজ্রপাতকে নিয়ে চিন্তা করে সুস্পষ্ট ও কার্যকরী প্রটোকল গ্রহণ করা।

রেফারেন্সঃ দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক যুগান্তর, বিচিত্র বিজ্ঞান, সময় নিউজ, বিবিসি।