বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হোক 'ডিজিটাল বাংলাদেশ'

  • 12 Dec
  • 03:22 PM

জান্নাতুল মাওয়া শশী 12 Dec, 20

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে পৌঁছাতে এক ধাপ এগিয়ে রাখছে বাংলাদেশ সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' বাস্তবায়নের অঙ্গিকার। আর বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপই হলো 'ডিজিটাল বাংলাদেশ'। এর মাধ্যমে একটি উন্নত, বিজ্ঞানমনস্ক সমৃদ্ধি বাংলাদেশকে বোঝায়। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ হচ্ছে সেই সুখী, সমৃদ্ধ, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বৈষম্য, দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ, যা প্রকৃতপক্ষেই সম্পূর্ণভাবে জনগণের রাষ্ট্র এবং যার মুখ্য চালিকাশক্তি হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি।’ ডিজিটাল বাংলাদেশ একটি প্রত্যয়। একটি স্বপ্ন, যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। বিরাট এক পরিবর্তন ও ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে চলছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস ১২ ডিসেম্বর। দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর আইসিটি দিবস নামে তবে পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আইসিটি দিবসের পরিবর্তে এ দিনকে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটি বাংলাদেশের জনগণের উন্নত জীবনের প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। এটি বাংলাদেশের সব মানুষের ন্যূনতম মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর প্রকৃষ্ট পন্থা। এটি বাংলাদেশের জন্য স্বল্পোন্নত বা দরিদ্র দেশ থেকে সমৃদ্ধ ও ধনী দেশে রূপান্তরের জন্য মাথাপিছু আয় বা জাতীয় আয় বাড়ানোর অধিকার। এটি হচ্ছে একুশ শতকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। প্রতিবছর ১২ ডিসেম্বর জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর দিবসটি পালন করে যদিও এ বছর মহামারী করোনার‌ কারনে দিবসটি পালন ততোটা আনন্দ মূখর হবে না।

ডিজিটাল বাংলাদেশের বীজ রোপণ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি দেশটিকে আইটিইউর সদস্যপদ গ্রহণ করান ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন তিনি বেতবুনিয়ায় উপগ্রহ ভূকেন্দ্র উদ্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রোপিত বীজ থেকে জন্ম নেয়া চারাগাছটির বিকাশ দেখি ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ এর ধারণাটি পেয়েছেন তিনি তার পুত্র এবং তার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে। বস্তুত ৯৬ থেকে ২০০১ সালে এবং ২০০৯ থেকে ১৯ সাল অবধি দেশটির ডিজিটাল রূপান্তরের স্থপতি হিসেবে সজীব ওয়াজেদ জয় অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, স্থপতি, নেতা এর সবটাই সজীব ওয়াজেদ জয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম জাতীয় অঙ্গীকার হচ্ছে ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করে দেশ থেকে দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের অগ্রাধিকার থাকতে হবে। সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। প্রতিটি ঘরকে তার বা বেতার-পদ্ধতিতে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক-ব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে। দেশের সব অঞ্চলের জনগণকে ডিজিটাল যন্ত্রে সজ্জিত করাসহ ডিজিটাল ডিভাইস প্রণয়ন করা জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া আরও যেসব বিষয় অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য হবে তা হলো: জনগণের নিজস্ব সংযুক্তি, জনগণের সঙ্গে সরকারের সংযুক্তি, সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর, শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর, উপযুক্ত মানবসম্পদ তৈরি, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসার রূপান্তর।

বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরে অনেকেই তাদের ভূমিকা পালন করেছেন। এই দেশে মরহুম মো. হানিফউদ্দিন মিয়ার হাত ধরে পরমাণু শক্তি কমিশনে উপমহাদেশের প্রথম কম্পিউটার আসে ১৯৬৪ সালে। তার সহযোগী ছিলেন মোহাম্মদ মুসা মিয়া। এরপর আদমজী জুট মিল, হাবিব ব্যাংক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে গণনার কাজে কম্পিউটার ব্যবহার করা ছাড়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই প্রযুক্তির কোনো সম্পর্ক ছিল না। সেসব কম্পিউটার প্রধানত প্রোগ্রামাররাই ব্যবহার করতেন। বাস্তবতা হলো ৭৫ থেকে ৯৬ পর্যন্ত কোনো সরকার বিশ্বের নবীনতম এই প্রযুক্তির প্রতি সামান্যতম নজরও দেয়নি। বরং দুঃখজনক বিষয় হলো, ১৯৯১-৯৪ সময়কালে বাংলাদেশকে বিনামূল্যে সি-মি-উই নামক বিশ্বের বৃহত্তম সাবমেরিন ক্যাবল লাইনে সংযুক্ত করার একটি সুযোগ এসেছিল। সেটি ২০০০ সালে চালু হয়।

১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১১টি দেশের সঙ্গে টেলিফোন, ফ্যাক্স, ডাটা কমিউনিকেশন, টেলেক্স ইত্যাদি আদান-প্রদান আধুনিক তথ্য সম্প্রসারণে দিগন্ত ভূ-উপগ্রহ উন্মোচন করেন।তখন থেকেই বাঙালি জাতি স্বপ্ন দেখা শুরু করে। এরপর থেকেই বেসরকারি খাতে তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা গড়ে তোলার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। ৭৬ সালে অ্যাপল পিসি ও ৮১ সালে আইবিএম পিসি এবং ৮৪ সালে মেকিন্টোস পিসি সারা দুনিয়ার সাধারণ মানুষের জন্য কম্পিউটারের ব্যবহারকে জটিলতা থেকে সহজবোধ্যতায় নামিয়ে আনে।বস্তুত মেকিন্টোস কম্পিউটারের হাত ধরে ডেস্কটপ প্রকাশনা বিপ্লব নামে একটি অসাধারণ ঘটনা ঘটে বিশ্বজুড়ে। বিশ্বব্যাপী কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়তে থাকে। তবে সেই ঢেউ তখন বাংলাদেশে লাগেনি। মেকিন্টোস কম্পিউটার বাংলাদেশে আসে ১৯৮৬ সালে। তবে বস্তুত ৮৭ সালে প্রথম কম্পিউটার দিয়ে বাংলা পত্রিকা আনন্দপত্র-এর প্রকাশ এবং মুদ্রণ ও প্রকাশনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে কম্পিউটার বিপ্লবের বড় মাইলফলকটির সূচনা হয়। ১৬ মে ৮৭ কম্পিউটার দিয়ে সাপ্তাহিক আনন্দপত্র প্রকাশের পথ ধরে বাংলাদেশে ডেস্কটপ প্রকাশনা বিপ্লব ঘটে। ৮৮ সালে প্রকাশিত বিজয় কিবোর্ড ডিটিপি বিপ্লবের নায়ক। বস্তুত ডিটিপি ও কম্পিউটারে বাংলা ভাষার ব্যবহার ডিজিটাল প্রযুক্তিকে তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তোলে।
জান্নাতুল মাওয়া শশী
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।