করোনায় বই’কে বন্ধু হিসেবে নিয়েছে জবি শিক্ষার্থীরা

  • 28 May
  • 10:45 PM

জবি প্রতিনিধি 28 May, 20

ভালো লাগে না কিছুই। যেতে হয় না বিশ্ববিদ্যালয়ে, নেই ক্লাসের কোন পড়া। তাই সময় কাটাতে একমাত্র উপায় ছিলো ফেসবুক, সেটাও এখন বিরক্তির নাম। বাসার সামনে মামার ফুসকার দোকান পড়ে আছে কিন্তু মামা নেই। জমে না বন্ধুদের সাথে আড্ডা। ঘরে বসে‌ থাকা যেন একমাত্র কাজ। তাই সময় কাটানোর উপায় হিসেবে শুরু করেছি বই পড়া।

‘সাইকো, হলুদ বসন্ত, দ্যা ভিঞ্চি কোড, অপেক্ষা, সাতকাহনসহ ইতোমধ্যেই বিশ্বের (২০) অধিক বই পড়ে ফেলেছি নিমিষেই। যদিও ক্লাসের পড়ার বাহিরে অন্য কোন বই পড়ার আগ্রহ কখনোই ছিলো না তবে করোনা সংকটে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বই পড়ার আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলেছে। ঠিক এভাবেই বলছিলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহানা খানম রূপা।

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বন্ধ যেন চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলেছে। কবে নাগাদ খুলতে পারে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই নিশ্চয়তা নেই কারো কাছেই। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস কার্যক্রম অনলাইনে চালু করলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেয়া হয়নি তেমন কোন ব্যবস্থা। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাসায় বসে নির্জীব সময় কাটাচ্ছেন।

অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সময় কাটালেও সেটা এখন স্বাদহীন হয়ে পড়েছে। তাই ইতোমধ্যেই অনেকেই ধরিয়েছেন বইয়ের নেশা।

ঠিক তেমনি একজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী লাকি আক্তার, ক্লাসের বইয়ের বাহিরে অন্য বই পড়ার আগ্রহ, উৎসাহ তেমন ছিলো না কিন্তু এই দীর্ঘ ছুটিতে দিনের বেশির ভাগ সময় তিনি বই পড়েই কাটান।

তিনি জানান, ‘সারাদিন বাসায় বসে থাকি। নামাজ ও কোরআন পড়া ছাড়া বাকি সময় বই পড়ে কাটাই। যদিও বই পড়ার অভ্যাস ছিলো না। তবে এখন বই পড়ায় আগের থেকে মনোযোগ বেড়েছে এবং সময়টাও ভালো ভাবেই পার হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই ম্যাক্সিম গোর্কির-‘মা’, পৃথিবীর পাঠশালায়, সমরেশ মজুমদারের গর্ভধারিণী, প্রিয় আমার, মৈত্রেয়ী দেবীর- ন হন্যতেসহ দশটিরও অধিক বই পড়েছি। সামনের দিনগুলোতে আরো অনেক বই পড়ে শেষ করতে পারবো।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শানিল বলেন, করোনা সংক্রমনের এই দুর্বিষহ দিনগুলোতে গৃহবন্দী জীবনে সকল কাজেই যেন একঘেয়েমি লাগে। যেসব কাজ আগে খুব আনন্দের সাথে করা হত, সেগুলোও এখন বিরক্তিকর অবস্থায় উপনীত হয়েছে। বাস্তবতা হলো, অলসতা আমাদের উপর ভর করে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের পছন্দের নিত্যকর্ম। তার মধ্যে অন্যতম হলো বই পড়া। বই পড়ার অল্প-সল্প অভ্যাস যাদের ছিল, তাদের কাছে বই পড়াও এখন বিরক্তিকর বনে গিয়েছে। তবে যারা বই প্রেমিক, তাদের কাছে এই সময়টা খুবই উত্তম সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত জীবনে একাডেমিক পড়াশুনার চাপে, কিংবা ব্যাক্তিগত ব্যস্ততায় বই পড়ার জন্য সময় দেয়া হয়ে ওঠে না। এই অবসর সময়টাতে সুযোগ এসেছে সেই "বই পড়া" নামক প্রিয় অভ্যাসটি জমিয়ে তুলার।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মিথিলা দেবনাথ ঝিলিক বলেন, ব্যাক্তিগতভাবে আমি ছোটখাটো একটা বইপোকা বলা যায়। উপন্যাস খুবই পছন্দের। অনেকগুলো বই সংগ্রহে ছিল। এই অবসরে প্রায় সবগুলো পড়ে শেষ করলাম। বই পড়ার মধ্যে একটা ব্যতিক্রমী অনুভূতি আছে। দীর্ঘদিন বই পড়েও কখনো সেই অনুভূতি উপলব্ধি করি নি। এবার বই পড়ে মনে হচ্ছে প্রতিটি শব্দের গভীরে প্রবেশ করতে পারছি। বস্তুত একডেমিক চাপ নেই, টিউশনি নেই, অন্যান্য কাজের কোনো ঝামেলা নেই, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া হচ্ছে না, সেই সাথে বৃষ্টির মৌসুম। সব মিলিয়ে এই সময়টা বই পড়ার জন্য এক অসাধারণ সময়। বই পড়ার প্রতি ঝোক যতটা ছিল, এই সময়টাতে তা আরো বহুগুণে বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে আমি বইয়ের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছি। যত পড়ি, আরো বেশি পড়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। মনে হচ্ছে বইয়ের প্রতিটি কথা যেন হৃদয়ে গেথে যাচ্ছে। যারা বই পড়ার প্রতি আগ্রহী তাদেরকে বলব, এই সময়টা কাজে লাগান, এমন অবসর সময় হয়ত আর পাবেন না। পছন্দের বই সংগ্রহে না থাকলে অনলাইনে পিডিএফ সংগ্রহ করতে পারেন। জনপ্রিয় প্রায় সব বই অনলাইনে পাওয়া যায়। আর বই পড়ে যেসব জিনিস শেখা যায়, আমার মতে সেই শিক্ষাটুকু আর কোথাও পাওয়া যায় না। বই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিল্পকর্ম। কত ঘটনা, কত বাস্তবতা, কত কল্পনা, কত শত অনুভূতি, সব কিছুকে সাহিত্যিক মাধুর্য দিয়ে কিংবা কাব্যিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করাটা সত্যিই সবচেয়ে বড় শিল্পকর্ম। আমি আশাবাদী সবার মধ্যে বই পড়ার অভ্যাসটি আরো প্রসারিত হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আমেনা খাতুন বলেন, অধ্যয়ন প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য অতীব প্রয়োজনI আমি তাদের বাহিরে নই। প্রথমদিকে, আমি ফেইসবুকে দেখা "কোভিট -১৯" দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে অধ্যয়ন করতে পারিনি।
তবে সময় সত্যিই চলে যায়। আর
এই বিষয়টি বুঝতে পেরে আমি অনলাইন কার্যক্রম থেকে নিরুৎসাহিত হয়ে আমার পড়াশোনায় মনোযোগী হই। এতে আমি কোরআন, হাদিস ও কিছু একাডেমিক বিষয় পড়ি। অর্থসহ কোরআন তেলাওয়াতের জন্য আমি ফোন ব্যবহার করি। আমি ইতিমধ্যে ২-৩ টা হাদিসের বই শেষ করেছি যেমন মহাপ্রলয়, মৃত্যুর আগে ও হাশরের পরে, ফাজায়েলে আমল যা সামনে চলার পথে আমাকে সাহায্য করবে। এসবের পাশাপাশি আমি ইংরেজি শব্দকোষ, গ্রামার এমনকি গল্পের বই ও পড়ি।আমি প্রতিদিনই পড়ার চেষ্টা করি, কিন্তু মাঝে মাঝে পিতামাতার কাজে সাহায্য কারার জন্য পড়তে পারি না কারণ তাদেরকে সাহায্য কারাও আমার দায়িত্ব। অবশেষে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একাকিত্বকে এড়িয়ে পড়াশোনাকেই আমি আমার সাথী হিসেবে নিয়েছি।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মুজাহিদ বলেন, ‘বই পড়ার অভ্যাস পুরাতন হলেও এই ছুটিতে তা আরো বেড়ে গেছে। ক্লাস কোর্সের পড়া এগিয়ে রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নাটক, উপন্যাস ও গল্পের বই পড়ছি। এছাড়াও মাঝে মাঝে চাকুরির বই পড়ে সময় পার করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সুস্থ মানসিকতার জন্য বই পড়া খুবই জরুরি। আর এই সময়টাও অযথা নষ্ট হবে না।’ তাই তিনি এই ছুটিতে সবাইকে বেশি বেশি বই পড়ার আহ্বান জানান।

এছাড়াও পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব, জিনি, কম্পিউটার সাইন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী কাউসার আলম এবং মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নিশাত তাহসিন অপির মতো আরো অনেকেই‌ জানান, বর্তমানে এই লম্বা ছুটিতে সময় কাটাতে বই পড়ায় তাদের ঝোঁক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা দিনের বেশিরভাগ সময় বই পড়ায় তাদের ঝোঁক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা দিনের বেশিরভাগ সময় বই পড়ে কাটান।

দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এই সময়টাকে অনেকেই বিনা কারণে নষ্ট করতে চান না। তাই কেউ পড়ছেন চাকুরির বই আবার কেউ পড়ে এগিয়ে রাখছেন ক্লাস অথবা কোর্সের পড়া। করোনার কারণে বন্ধ থাকার এই সময়টা অনেকের কাজে নিয়ে এসেছে বই পড়ার অপার সুযোগ।

সৃজনশীলতা, মননশীলতা এই সব গুণাবলির বিকাশে বই খুব ভালো বন্ধু। বই পড়ে যে নির্মল আনন্দ পাওয়া যায় তা অন্যকিছুতে প্রায় অসম্ভব। ভালো বই হলো আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ট উপায়।