পবিপ্রবি’কে কেন্দ্র করে চলতো জীবিকা, লকডাউনে কেমন আছেন সেসব মানুষগুলো

  • 24 Aug
  • 07:09 PM

মো:আব্দুল আলিম, পবিপ্রবি প্রতিনিধি 24 Aug, 21

পবিপ্রবির ১ম গেটের সামনে এপাশ ওপাশে দু’সারি দোকান। তার মধ্যেই আট-দশ বছরের পুরনো ছোট্ট একটা চায়ের দোকান বাবুল নামের এক চিরপরিচিত মামার। সন্ধ্যা সাতটা কিংবা রাত এগারোটা, সবসময় কোন না কোন বন্ধুজোটের আড্ডা লেগেই থাকতো এখানে। ঝড় আসবে আসবে ভাব এমন কোন মেঘলা গভীর রাতে, শের-ই-বাংলা-হলের উশকো-খুসকো চুলের কোন এক শিক্ষার্থী মুখমন্ডল ভরা এক মেঘ হতাশা নিয়ে এসে সামনের বেঞ্চটাতে বসতে বসতে বলতো, “মামা, একটা চা দিওতো।” বলতে বলতে সামনে ঝুলিয়ে রাখা কাঁদি থেকে একটা কলা ছিড়ে নিতো। এরপর নিঃশব্দে চা পান শেষে চলে যেতো। বাবুল তার চায়ের চুমুকের সাথে ভেসে আসা অভিমানের হাজারো শব্দ নিঃশব্দে কান পেতে শুনতো। আকাশে এক ফালি চাঁদ হাজারো নক্ষত্রের পাহারায় যে রাতে সুধাবর্ষন করতো, সে রাতে ছুটে আসতো ৮ম সেমিস্টারের এক দল বন্ধু। এরপর দোকানে বসে চায়ের চুমুকে জমে যেতো আড্ডা। কেউ গলা ছেড়ে গান ধরতো। কেউবা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সময় হয়েছে বলে, বিদায়ী দীর্ঘশ্বাসে সবার অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতো। সে আড্ডা বা ব্যথায় দোকানদার মামাও অংশ নিতেন। চায়ের গরম ধোঁয়া মিলে যেত জ্যোৎস্নার হলুদাভাব বর্নের সাথে। কোন সময় স্যার আর ছাত্রও একসাথে চায়ের কাপে চুমুক দিতো তার দোকানটিতে। মাঝখান থেকে আয়ও হয়ে যেতো বেশ। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর যেমন ক্লাসরুমে একজন কাছের বন্ধু থাকে, ঠিক তেমনই ক্যাম্পাসের বাইরে একজন পছন্দের দোকানি বা হোটেলের মামাও থাকে। করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীবিহীন দোকানে আয়-রোজগার এবং জীবন কেমন কাটছে এ বিষয়ে বাবুল হাওলাদারের কাছে জানতে চাওয়া হলে উনি আমাদের অবগত করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারনে তার দোকানে কাস্টমার সেভাবে আসেনা বললেই চলে। ফলে আয়-রোজগারও আগের চেয়ে কমে গেছে। শিক্ষার্থীরা আবারও তাদের শিক্ষাঙ্গনে ফিরে আসলে, বাবুলের মতো সকল মামাদের প্রত্যাশা আর বেঁচে থাকায় আবারও গতি ফিরে আসবে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম গেইট এবং ২য় গেইট মিলে এমন অনেকগুলো চায়ের দোকান, খাবারের হোটেল ইত্যাদি রয়েছে যাদের আয়ের প্রধান উৎসই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়টির অপর আরেকটি ক্যাম্পাসেও রয়েছে ঠিক এরকমই কতগুলো শিক্ষার্থী নির্ভর দোকান বা হোটেল। অনেকে আবার ঝাল মুড়ি বা আচারের গাড়ি নিয়ে চলে আসতেন ক্যাম্পাসে। তাদের আয়ের উৎস যেমন ছিল শিক্ষার্থীরা, আবার ঠিক অপর পাতায় শিক্ষার্থীদের সাথে দোকানি মামাদের আড্ডাও লিখিত হতো স্মৃতির অক্ষরে। করোনা মহামারির কারনে বাংলাদেশে বহুদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ এবং এদিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থী নির্ভর ব্যবসার সাথে জড়িত মামারা শিক্ষার্থীদের মতোই রয়েছেন শূন্যতায়। বহুদিন ধরে শিক্ষার্থীদের শূন্যতায় ভোগা দোকানের বেঞ্চটি কিংবা হোটেলের গ্লাসটি মামাদের মনে শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করে হয়তবা। কিন্তু যাদের জন্য ব্যবসাটা টিকে ছিল, তাদের অনুপস্থিতি যে লোকসানের মধ্যে ফেলে দিয়েছে তা সত্যিই অপূরণীয়। পবিপ্রবির এ সমস্ত দোকান বা হোটেলগুলো এখন পুরোটাই নির্ভর করে আছে দুমকি উপজেলার স্থানীয়দের উপর। চায়ের চুমুকে আর আড্ডা দেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায় না। হোটেলগুলোতে খিচুড়ি বা ডিম-রুটি পার্সেল করার লাইন আর চোখে পড়ে না। রাত আসে, রাত চলে যায়। জোনাকির আলো নিভে গেলে আবারও একটি দিন আসে। কিন্তু আগের সেই দিনগুলোর মতো ব্যস্ত সময় আর আসে না তাদের জীবনে। “পবিপ্রবির মামারা কেমন আছে?”- এ প্রশ্নের উত্তর বেদনা থেকে বেদনাময়।

সেই চেয়ারগুলো আছে, সেই টেবিলগুলো আছে। কফি হাউজের আড্ডায় শুধু নেই সেই মানুষগুলো, জীবিকা এবং জীবনের তাগিদে যাদের উপর বছরের পর বছর নির্ভর করে আসছে পবিপ্রবির মামারা। এক বছর হয়ে গেল, কিন্তু এ বছর আর কোন বিদায়ী ব্যাচের মায়া মাখানো মুখ অশ্রুসিক্ত নয়নে এসে বললো না, “মামা, চলে যাচ্ছি। ভালো থাকবেন!”