তরুণ হৃদয়ে ‘রবীন্দ্রনাথ’, এক চিরতরুণ প্রেমিক পুরুষ ‘রবীন্দ্রনাথ’

  • 08 May
  • 09:32 PM

জাফর আহমেদ শিমুল, বিশেষ প্রতিনিধি 08 May, 21

'তুমি রবে নীরবে
হৃদয়ে মম
তুমি রবে নীরবে
নিবিড়, নিভৃত, পূর্ণিমা নিশীথিনী-সম
তুমি রবে নীরবে

হৃদয়ে মম
তুমি রবে নীরবে'

তিনি চিরকাল রয়ে যাবেন আমাদের হৃদয়ে,তিনি আমাদের 'রবীন্দ্রনাথ'।শত-সহস্র-কোটি হৃদয় রাজ্যে রাজ করা 'রবীন্দ্রনাথ'।

আজ ২৫ শে বৈশাখ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মতিথি। আজকের এ দিনেই পশ্চিমবঙ্গের এক সম্ভ্রান্ত ঠাকুর পরিবারে যার জন্ম তিনিই 'রবীন্দ্রনাথ'। তিনি জীবনবোধের কবি,সূক্ষ দর্শনসমৃদ্ধ কবি, প্রেমের কবি,সহজ-সারল্যের কবি। সমস্ত বিশেষণ
পেরিয়ে তিনি আমার ও আমাদের প্রাণের কবি;বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার এতো এতো মায়া,প্রেম,আগ্রহ, একান্ত গোপন-নিরব আলাপন,ও জিজ্ঞাসা, তার সর্বমূলেই রয়েছে প্রেম-ভালোবাসা ও তারুণ্য। প্রকৃতি-প্রেম,নারী-প্রেম,জীবনের প্রতি জীবন্ত প্রেম; এ সকল প্রেম প্রেমী তনু-মনে মিলেমিশে একাকার। সে প্রেম তাঁর ব্যক্তিজীবনে,কর্মজীবন এবং কাব্যভুবনে সমানভাবে ব্যাপ্ত-পরিব্যাপ্ত! সাহিত্য চর্চা ও পাঠের মাধ্যমে প্রেমরস আস্বাদনের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের গল্প, কবিতা(কাব্য) প্রবন্ধ, নাটক, গান,উপন্যাস,স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনীর যেমন জুড়ি মেলা দুষ্কর। ঠিক তেমনি তাঁর ব্যক্তি জীবনের ‘প্রেম’ ও প্রেমের প্রবল টান ও আকুতি সাহিত্য রসবোধসম্পন্ন রসিকজনের কাছে রসের আঁধার; আমার কাছেও তিনি ও তাঁর প্রেমের অধ্যায় ও প্রেমিক চরিত্র অসীম আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। বলাই বাহুল্য যে 'রবীন্দ্রনাথ'র জীবনে প্রেম এসেছে শ্রাবণ ধারার মতো । আবার সে প্রেম জীবনে শ্রাবণ ও ঝর্ণার মতো সুরে সুরে বেজে ঝরে পড়েছে ঠিক শ্রাবণ-বরষার ধারার মতোই। নানা ঘটনা প্রবাহকে নিউক্লিয়াস করে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে একের পর এক নারী প্রেমে পড়েছিলেন তিনি। তাঁর প্রবল নারী প্রেমকে উপজীব্য করেই যেনো প্রেম,আবেগ,ভালোবাসা ভরপুর হয়ে উঠেছে কাব্য,গীত,উপন্যাস। আবার তিনি প্রেমময়ী-প্রেমকাতর নারীদের কাছ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিয়ে আরাধ্য দেবতা-পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হওয়ার উদ্দ্যেশ্যে ধ্যানমগ্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন সম্পূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ ‘রবীন্দ্রনাথ’।
এ রবীন্দ্রনাথ সেই সেই একই মানুষ রবীন্দ্রনাথ যিনি তাঁর প্রণয়দেবীগণের সাহচার্য পেতে মরিয়া হয়েছেন কিছু সময়কাল পূর্বেই। আবার তিনি অন্তর্ধানের ডাকে সাড়া দিয়ে আত্মার কলংক মুক্তির আশায় পরমাত্মার সন্ধানে আরাধনায় মগ্ন হতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ও রবীন্দ্রপ্রেমী রমনীও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে খুব সুন্দর বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথের লেখার আসলে কোনো দেশ-কাল-পাত্র নেই। আপনি যে সময়েরই হোন না কেন, রবীন্দ্রনাথ আপনার চারপাশটাকে তাঁর করে নেবেন!’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি চলচ্চিত্রগুলোও তাঁদের মন জয় করে নিয়েছে।

সতেরো (১৭) বছর বয়স থেকে শুরু করে তেষট্টি (৬৩) বছর বয়স পর্যন্ত অসংখ্য রমণীর প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। ফলে তাঁর প্রণয়িনীর সংখ্যা একদমই কম নয়। এদের মধ্যে অনেকেরই নাম রবীন্দ্রনাথের জীবনের সাথে দিগ্বিদিক অসামাঞ্জস্যপূর্ণ মনে হলেও বহুকাল ধরেই সমান্তরালভাবে উচ্চারিত হয়েছে। আবার অনেকেরই নাম কালের কপলতলে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছে।

সমাজ-সংস্কার আন্দোলনের নেতা আত্মারামের বিলেতফেরত কন্যা আন্না অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজিয়ানায় প্রশিক্ষিত করে তুলতে।
রসশাস্ত্রের বিচারে যাকে প্রগল্ভী নায়িকা।
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে, রবীন্দ্রনাথের দেওয়া আন্নার ডাকনামটি হলো ‘নলিনী'। কাব্য-নাটকে ‘নলিনী’ চরিত্রটি প্রায়শই একটি চপল-স্বভাবা আপাত-নিষ্ঠুরা, অথচ প্রেমময়ী নারী।

তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্য প্রণয়িনীদের নিয়ে লেখা যতো সহজ কাদম্বরী দেবীকে নিয়ে লেখা ততো সহজ নয়।
কাদম্বরী দেবী (প্রকৃত নাম মাতঙ্গিনী গঙ্গোপাধ্যায়) ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সপ্তম সন্তান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী।


রবীন্দ্রনাথের কয়েকজন উল্ল্যেখযোগ্য প্রণয়িনীর নাম মনে বাজলেও তাঁর এ জন্মতিথিতে তাদের মধ্যে সবচেয়ে অন্যরকম প্রেমে আবিষ্ট হওয়া ও অসমপ্রেমের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকা
'রবী-রানু মুখার্জি'র প্রেমকেই আমার লিখার মাঝে হাজির করবো।

রানু মুখার্জিঃ
প্রেমের গতি -বিচিত্র। প্রেম বয়স, জাত-পাত, স্থান, কাল, পাত্র, ধর্ম কিছু মানে না। দুটি হৃদয় কোনো কিছু বিচার না করে কখন একে অন্যের নিকটে এসে যায়, আমরা তা বুঝতে পারিনা। যখন বুঝতে পারি, তখন দুজনের মধ্যে একটা ভালোলাগা বা প্রীতির সম্পর্ক জন্ম নেয় এবং এই সম্পর্ক প্রেমে পরিণত হয়।
হৃদয়বান পুরুষদের বয়স যাই হোক না কেন, হৃদয়ে প্রেম জাগতে কোনো বাঁধা নেই। প্রেমিকার বয়স কোনোদিন পুরুষের প্রেম নিবেদনে বাধা হয়নি। পঞ্চশোর্ধ পুরুষ নিজের কন্যার সমবয়সী নারীর সাথে এমনকি নাতনীর বয়সী কিশোরীর সাথেও প্রেমের জালে জড়িয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ তাই লিখেছেন, ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে/ কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে’ - রবীন্দ্রনাথ তার নিজের জ়ীবনের উপলব্ধি থেকেই হয়তো এ কথা লিখেছেন। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ও কিশোরী 'রাণু'র প্রেম একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
অসমবয়সী রানু ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এক আশ্চর্য অন্তরঙ্গ নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ১৯১৭ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত। শিল্পপতির পুত্র বীরেন্দ্রের সঙ্গে বিবাহ স্থির হয়ে গেলে রানু-রবীন্দ্রের দীর্ঘ আট বছরের প্রীতি-ভালোবাসার মধুর পরিণত সম্পর্কটি ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। এই সময় প্রিয়দর্শীনী রানুর বয়স উনিশ। ১৯১৭ সালে পরস্পরের পত্রবিনিময়ের মাধ্যমে যখন দুজনের অনির্বচনীয় একটি সম্পর্কের ভিত্তিভূমি রচিত হচ্ছিল তখন রানুর বয়স এগারো, আর সেই সময় নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথের বয়স ছাপ্পান্ন। চিঠির পর চিঠিতে ‘ভারী দুষ্টু’ রবীন্দ্রনাথকে চুম্বনের পর চুম্বন দিতে দিতে ‘প্রিয় রবিবাবু’কে রানু বলে, ‘কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবেন আপনার বয়স ‘সাতাশ’।” উত্তরে রবীন্দ্রনাথ কৌতুক করে বলেন, ‘আমার ভয় হয় পাছে লোকে সাতাশ শুনতে সাতাশি শুনে বসে। তুমি যদি রাজি থাক তাহলে আমি আর একটা বছর কমিয়ে বলতে পারি। কেন না ছাব্বিশ বললে ওর থেকে আর ভুল করবার ভাবনা থাকবে না।’
পঞ্জিকার হিসাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স পঞ্চান্ন ষাট বাষট্টি যাই হোক দেহসৌষ্ঠবে ও গঠনে তিনি ছিলেন অতুলনীয় রূপবান। এডওয়ার্ড টমসনকে কবি নিজেই সেই সময় বলছেন, ‘আমি সেদিন পর্যন্ত ষাট বৎসরের পূর্ণ যৌবন ভোগ করছিলুম’।
রাণুর যৌবনের শ্রেষ্ঠ বসন্তের দিনগুলি শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে তাকে ভালোবেসেই কেটেছিল। উভয়ের প্রতি উভয়ের ভালোবাসায় কোনো অস্পষ্টতা ছিল না। কিন্তু এই সম্পর্ক উভয়ের মধ্যে কতটা নৈকট্য এনে দেয় তা বলা কঠিন।
অষ্টাদশী রাণুকে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘বিধাতা আমাকে অনেকটা পরিমাণে একলা করে দিয়েছেন। কিন্তু তুমি হঠাৎ এসে আমার সেই জীবনের জটিলতার একান্তে যে বাসাটি বেঁধেছ, তাতে আমাকে আনন্দ দিয়েছে। হয়তো আমার কর্মে আমার সাধনায় এই জিনিসটির বিশেষ প্রয়োজন ছিল, তাই আমার বিধাতা এই রসটুকু আমাকে জুটিয়ে দিয়েছেন।’
অষ্টাদশী রাণু রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করেছে, ‘আমি আপনার কে?” নিজেই বলেছে , “আমি আপনার বন্ধুও নই।” তবে কে? রাণুর উত্তর, ‘আর কেউ জানবেও না।’ এই চিঠিতেই রাণু মনের কপাট খুলে লিখে ফেলেছে, ‘আমি কাউকেই বিয়ে করব না –আপনার সঙ্গে তো বিয়ে হয়ে গেছে। আমার সমস্ত শরীর ছেয়ে সেই আদর আমার মনকে ভরে দিয়েছিলো। সেই আদরটুকুতে তো কারুর অধিকার নেই।”
শেষপর্যন্ত রাণু বিয়েতে সম্মত হয় এবং ওই চিঠির সাত মাস পরে রাণু-বীরেন্দ্রের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিবাহোত্তর জীবনে রাণু “লেডি রাণু মুখার্জ্জী” নামে খ্যাত হন।

যে সকল তরুণেরা রবীন্দ্রনাথের দু-একটি গল্প-কবিতায় চোখ বুলিয়ে দেখবেন বলে ভাবছেন তারা আর কাল-বিলম্ব না করে পড়ে ফেলুন ও নতুন সহজিয়া দর্শন খুঁজুন;আর এভাবেই জাগিয়ে তুলুন নিজের তারুণ্যের শক্তিকে প্রেমের শক্তিকে।

আমাদের মতো যারা তরুণ আমার-আপনাদের জন্যই তো তিনি লিখে গিয়েছেন, ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে কে তুমি পড়িছো বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহলভরে...’

আবার এ গানেও তিনি হৃদয়-আত্মা জাগানোর চেষ্টা করেছেন-

'কতো ডেকে ডেকে জাগাইছো মোরে
তবুতো চেতনা নাই গো...
মেলি মেলি আঁখি মেলিতে নাহি পারি
ঘুম রয়েছে সদায় গো....'

শুরুটা না হয় হোক এমন তারুণ্যের গান গেয়েই। আজকের তরুণ প্রাণ সহ শত যুগের শত কালের প্রতিটি তারুণ্য তনু-মন-প্রাণ জাগিয়ে তোলার সামর্থ্য রাখেন আমাদেরই চিরতরুণ ও চিরজাগরুক কবি,কবিদের কবি,কবিগুরু, কবিশ্রেষ্ঠ,প্রেমের কবি,সার্বজনীন ভালোবাসার কবি 'বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর'।