ঢাবির রোকেয়া হলে দুই শিক্ষার্থীকে 'অশ্লীল' গানে নাচতে বাধ্য করার অভিযোগ

  • 17 Nov
  • 07:28 PM

ডেস্ক নিউজ 17 Nov, 21

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে প্রথম বর্ষের দুই শিক্ষার্থীকে 'অশ্লীল' গানে নাচতে বাধ্য করা এবং মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তৃতীয় বর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে সাড়ে দশটা থেকে রাত একটা পর্যন্ত হলের অপরাজিতা ভবনের এক্সটেনশন চার-এ এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড এ কে এম গোলাম রাব্বানী বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। প্রক্টর রাব্বানী লিখিত অভিযোগটি হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জিনাত হুদার কাছে পাঠিয়েছেন।

ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আয়েশা আখতার রিজু নিজেকে ভুক্তভোগী দাবি করে এ অভিযোগ দিয়েছেন। রিজু বলছেন, অন্য ভুক্তভোগী আমার সহপাঠী। সে এসবে জড়াতে চাচ্ছে না তাই তার নাম প্রকাশ করছি না।

রিজুর অভিযোগ, অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জুলি মারমা এবং নাসরিন জাহান খুশি তাকে এবং তার সহপাঠীকে নাচতে বাধ্য করেছে। আর অভিযুক্তদের সহযোগিতা করেছেন অভিযুক্তদের বন্ধু মার্কেটিং বিভাগের জান্নাত নিপু, পূজা দাস এবং রিনাকী চাকমা। নাসরিন জাহানের বিভাগের নাম জানা যায়নি।

এদের মধ্যে জান্নাত নিপু এবং পূজা দাস রিজুর রুম এক্সটেনশন চার-এ থাকেন আর বাকিরা থাকেন এক্সটেনশন তিন নং রুমে।

প্রক্টরের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগ পত্রে আয়েশা রিজু লিখেন,গতকাল রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টা নাগাদ এক্সটেনশন তিনের কয়েকজন আপু আমার রুমে আসেন। তারা হাসি-তামাশা করে চলে যান এবং পুনরায় ফিরে আসেন। তখন ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন আলোচনা আপুদের মধ্যে চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় যথেষ্ট সম্মান ও বিনয়ের সাথে আমি জুলি আপুকে জিগ্যেস করি, "আপু, আমি ভাত খাই''- এটাকে আপনাদের ভাষায় কীভাবে বলে? এই কথায় প্রত্যুত্তরে হঠাৎ তিনি রাগান্বিত হয়ে আমাকে ধমকিয়ে বলেন, "তুই আমাকে জিজ্ঞেস করিস, তর সাহস তো কম না! তোকে র্যাগ দিতে হবে।"

তারপর নাসরিন জাহান খুশি আপু বলে উঠল, "শুধু ওকে না, এই ফ্লোরের প্রত্যেকটারে র‍্যাগ দিতে হবে।"

তখন নিপু আপু অন্য রুমে আমার আরেকজন সহপাঠীকেও র‍্যাগ দেওয়ার জন্য আমার রুমে নিয়ে আসে। এরপর আমাদের দুজনের উদ্দেশ্যে জুলি আপু বলেন, "তরা ২ মিনিট ভেবে বল, তরা কী করবি। না হয় খারাপ কিছু ঘটবে কিন্তু। আমরা এমন কিছু দিব যা তরা করতে পারবি না।"

এরপর খুশি আপু বললেন, ''তোদেরকে আজ নাচাবো।' এরপর সে নিপু আপুকে বললেন, “এই খারাপ একটা গান ছাড়। তোদেরকে আজ খারাপ গানে নাচবো ।"

পেছন থেকে নিপু আপু বলতেছিল, ''র‍্যাগ দে, র‍্যাগ দে, চিল হবে চিল।''

তারপর আমি আপুদের বললাম, "আমি প্রশাসনিকভাবে হলে উঠেছি, আর লিগ্যালি উঠলেও যে র‍্যাগ পেতে হয় তা জানতাম না।"

এরপর জুলি আপু বলে উঠলেন, "প্রশাসন -আবার কীসের? আমরা থাকতে দেই বলে তরা থাকতে পারিস।"

এরপর আমাদের বাজে একটা গানে নাচতে বাধ্য করে। এবং বললেন "এরপর না হয় অনেক খারাপ কিছু করতে বাধ্য করবো। তারপর রিনাকি আপু আমাকে হাত ধরে টেনে উঠায় নাচার জন্য। কোনো উপায় না দেখে আমি তাদের কথা মানতে বাধ্য হই।

র‍্যাগ শেষে জুলি ও খুশি আপু বললেন, "ম্যামকে অভিযোগ করবি? ম্যামকে বলে কোনো লাভ নেই। আমাদের কিছুই হবে না।"

রাত একটা পর্যন্ত আমার উপর এ ধরণের নানা মানসিক নির্যাতন চলে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আয়েশা রিজু নিউজবাংলাকে বলেন, লিখিত অভিযোগের সব বক্তব্য সত্য। গত ২৫ অক্টোবর আমি আমার মায়ের পর বাবাকে হারাই। এই পৃথিবীতে আমার আপন বলতে তেমন কেউ নেই। আমি সেই ট্রমা টা-ই এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আমার ইতোমধ্যে সেমিস্টার ফাইনাল চলছে। এমতাবস্থায় এই ধরনের অমানবিক নিপীড়নের শিকার হয়ে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমার সাথে ঘটে যাওয়া এই অমানবিক ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি এবং এমন ঘটনা অন্য কোনো মেয়ের সাথে যেন না ঘটে তার নিশ্চয়তা চাই।

এ বিষয়ে মূল অভিযুক্ত শিক্ষার্থী জুলি মারমা নিউজবাংলাকে বলেন, আমাদের দুই রুমের মধ্যে ভালো সম্পর্ক। আমরা নেচে গেয়ে সব কাজ একসাথে করি। তবে রিজুর আচরণটা অনেক আগে থেকেই এভনরমাল ছিলো। সে যথেষ্ট ইগুয়েস্টিক মেয়ে। রিজুর রুমে আমার কয়েকজন বান্ধবী থাকে। গতকাল সে রুমে গিয়ে আমরা বলিউড গানে নাচানাচি করছিলাম। সেখানে রিজু এবং তার অন্য এক সহপাঠীও ছিলো। তারা আমাদের নাচ এনজয় করছিলো। একপর্যায়ে তাদেরকে আমরা ডেকে বলেছি, তোদের সামনে সিনিয়র আপুরা নাচতেছে তোরা কেন জয়েন করছিস না। জয়েন দে। ওরা বললো, আপু, আমরা নাচ পারি না, নাচবো না।

আমি তাদের বললাম, আমরাও প্রফেশনাল ডান্সার না, হাত পা ছুড়াছুড়ি করছি। তোরাও এরকম কর। কিন্তু রিজু বললো, 'আমরা নাচবো না। তোমরা নাচছো আমরা কেন নাচবো?'

এরপর আমরা তাদের দুইজনের হাত টেনে একসাথে নাচি। এভাবে একটা পর্ব গেলো। গতকাল এরকমই একটা সিচুয়েশনে ছিলো আমাদের মধ্যে।

এরপর আমরা তাদের দুইজনের হাত টেনে একসাথে নাচি। এভাবে একটা পর্ব গেলো। গতকাল এরকমই একটা সিচুয়েশনে ছিলো আমাদের মধ্যে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত জান্নাত নিপু এবং পূজা দাসকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

অন্য অভিযুক্ত রিনাকী চাকমা এবং নাসরিন জাহান খুশির ফোন নম্বর সংগ্রহে না থাকায় তাদের ফোন দেওয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড এ কে এম গোলাম রাব্বানী বলেন, আমার কাছে রোকেয়া হলের একজন শিক্ষার্থী এসেছে। বসে তার অভিযোগ শুনেছি। সে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে সেটি গ্রহণ করেছি। এটা আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে আমি চিঠিটা প্রাধ্যক্ষ মহোদয় (অধ্যাপক জিনাত হুদা) বরাবর ফরওয়ার্ড করে দিয়েছি। প্রাধ্যক্ষকে অনুরোধ করেছি শিক্ষার্থীর ঘটনাটি শুনে এবং দেখে আপনারা ব্যবস্থা নিন। আর শিক্ষার্থীকে পরামর্শ দিয়েছি যেন তিনি প্রাধ্যক্ষ মহোদয়ের সাথে দেখা করে তার বিষয়টা জানায়। বিষয়টি এখন প্রাধ্যক্ষ মহোদয় দেখছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড জিনাত হুদাকে বিকাল পাঁচটা এবং সন্ধ্যা সাতটায় দুইবার ফোন দিলে তিনি দুইবারই ফোন কেটে দেয়ায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।