কয়রায় নোনা পানিতে ভাসছে লাশ: মানুষের খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ভোগান্তি

  • 10 June
  • 04:52 AM

মো: ইকবাল হোসেন, খুলনা (কয়রা) 10 June, 20

প্রাকৃতিক দূর্যোগের সাথে যুদ্ধ করে সিডর-আইলাকে জয় করলেও কয়রা উপকূলবাসীকে বিধ্বস্ত করেছে কালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্পান। দূর্গন্ধময় বিষাক্ত লবণ পানিতে মানুষের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। নোনা পানিতে ভাসছে মানুষের লাশ, মৃত্যু গবাদি পশু-পাখি। খাদ্য, পানি, চিকিৎসা সংকট মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। লন্ডভন্ড হয়ে গেছে জনজীবন ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদের বানভাসি লোকজন।

আম্পানের হিংস্র থাবায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে কয়রা উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন-কয়রা সদর, দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি এবং মহারাজপুর। ২ লক্ষাধিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার বাড়ি-ঘর হারিয়ে খুপরি, টং, সাইক্লোন শেল্টারে অনাহারে অতি মানবেতর জীবনযাপন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত সকলকে সরকারি-বেসরকারি সাহায্য-সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় সেবা অব্যাহত রয়েছে। যদিও এ সহযোগিতা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগন্য, এমনটাই অভিযোগ করছে ভাসমান নোনা পানির মানুষেরা।

কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর নোনা পানিতে ডুবন্ত কয়রা উপজেলা। সদর উপজেলার অবস্থা আরো করুণ। রাস্তা ঘাট সব ভেঙে পানির তলে বিলীন হয়ে গেছে। অধিকাংশ সড়কগুলোয় ১০ ফুটের অধিক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। পানি বন্দী মানুষেরা কলার ভেলা, নৌকা বা কখনো সাঁতরে চলাচল করছে। মা ও শিশুদের অবস্থা আরো নাজুক। বসতবাড়িগুলো পুরোপুরি বিনাশ হয়ে গেছে। মোতায়েন করা হয়েছে ১০৫ পদাতিক সেনাদল।

আম্পানের (২০মে) তান্ডবে ভেঙে যাওয়া বাঁধ নির্মাণ করা করা হলেও সংস্কার ও পুন:মেরামতের অভাবে গত ২ জুন আবারো পানিতে ভেসে যায় কয়রাবাসী। দীর্ঘ ২০ দিন পরে কয়রা সদরের সবচেয়ে বড় ভাঙন হরিণখোলা ও গোবরা ঘাটাখালি বাধের কাজ স্বেচ্ছাশ্রমে চলছে। বাঁধের কাজে অংশগ্রহণ করছে প্রায় ১০-১৫ হাজার লোক। প্রস্তুত রাখা হয়েছে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল টিম। সরেজমিনে বাঁধের কাজে অংশগ্রহণ সহ তদারকি করছেন স্বয়ং এমপি মহোদয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আম্পানে কয়রা উপজেলা সদর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে হরিনখোলা ঘাটাখালী, ১ ও ২নং কয়রা, গোবরা, মদিনাবাদ, মাঝের আইট, পায়রাতলার আইট গ্রাম। স্যানিটেশনের অভাবে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগে ছড়িয়ে পড়েছে আমাশয়, ডায়রিয়া সহ নানা পানিবাহিত রোগ। সাইক্লোন সেন্টারগুলোতে গাদাগাদি করে বসবাস করছে মানুষ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি। এমনই চিত্র ফুটে উঠেছে কয়রা সদর দারুচ্ছালাম মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সাইক্লোন সেন্টারে।

ওই সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় নেয়া লিমা আক্তার বলেন, আম্পানের রাতেই শিশু ছেলে-মেয়ে নিয়ে এখানে আসি। অপরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গবাদি পশু সহ মানুষের জীবন অতি দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার অভাবে অতিকষ্টে আমরা বেঁচে আছি।

কয়রা সদর গোবরা গ্রামের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান জানান, লবণ পানিতে ঘর বাড়ি সব হারিয়ে ফেলেছি। বৃদ্ধ মা ও পরিবারকে নিয়ে টং করে আছি। আমাদের ত্রাণ নয়, সরকারের কাছে টেকসই বাঁধ চাই। লবণ পানির অভিশাপ হতে মুক্তি চাই।

এদিকে কয়রা উপজেলা লবণ পানির অভিশাপ মুক্ত করতে নিরলসভাবে কাজ করছেন খুলনা ৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান বাবু। তিনি বাঁধ ভাঙনের পর থেকে সর্বদা বানভাসি কয়রাবাসীর পাশেই রয়েছেন। নৌকা-ট্রলার যোগে বা কখনো পায়ে হেঁটে অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত দূর্গত মানুষের সবটুকু দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন তিনি।

এমপি আখতারুজ্জামান বাবু বলেন, কয়রা উপকূলবর্তী হওয়ায় নোনা পানির ছোবলে এঅঞ্চলের মানুষ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়রায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি। ইতিমধ্যে একনেকে সাড়ে ৩শ কোটি টাকা পাসও হয়েছে। আগামী অক্টোবর -নভেম্বর মধ্যে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এছাড়া সেনাবাহিনী টেকসই বাঁধ নির্মাণ সহ রিং বাঁধ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলেও তিনি আশ্বস্থ করেন।