করোনা ডায়েরি-২০২০

  • 16 Dec
  • 09:14 PM

আব্দুল্লাহ আল মামুন 16 Dec, 20

খুব করে এখন মনে পরে গত মার্চের(২০২০) দিনগুলোর কথা। তখন শীত একটু একটু রয়েছেও দেশে, আবার চলেও যাবে হয়তো কদিন পরে।
পুরো বিশ্ব ধাবিত হচ্ছে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে। মানব সভ্যতার অস্তিত্ব অদৌ থাকবে কি থাকবে না এনিয়ে পুরো বিশ্ব চিন্তিত। বিশ্ব কি উর্বর হবে না অনুর্বর হয়ে নেমে আসবে চরম দূর্ভিক্ষ । নাকি এর আগেই সংক্রমিত হয়ে বিলিন হয়ে যাবে মানব সভ্যতা।
চীনের উহান প্রদেশের সেই আতঙ্ক, সেই ভয় আমাদের দেশেও সবে প্রবেশ করবে করবে ভাব। অবশেষে সেই আতঙ্কটা প্রবেশ করেই গেল!.....
যেদিন ফাইনালি আমাদের ভার্সিটি বন্ধ দিয়ে দিলো তার আগের রাতেও সে কি ভয়!.......
সন্ধার দিকে বাবা ফোন করে জানিয়ে দিলেন, মানিকগঞ্জে নাকি একজনের করোনা পজিটিভ এসেছে। এই নিয়ে এলাকায় অনেকটাই অাতঙ্ক বিরাজ করছে। সে কি আতঙ্ক!.....বেড থেকে উঠে দরজা আটকে দিতে যাবো সেই মানষিক শক্তিটাও ছিলো না বোধ হয়!..... মনের সাথে শরীরের শক্তিটাও নাই হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কেউ একজন ইনবক্সে মেসেজ ফরওয়ার্ড করে আতঙ্কের মাত্রা আরো কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছিলো, "নাকে হাত দেয়া যাবে না, ঘনঘন পানি পান করতে হবে। ইত্যাদি।"
আব্বা আম্মা ফোন দিয়ে অনবরত সতর্ক করে দিচ্ছেন, সাবধানে থেকো, বাহিরে যেও না!.....
আমরা সাভারে থাকি এজন্য সবথেকে বেশি আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছিলাম। মানিকগঞ্জে ইতিমধ্যে একজন পজিটিভ!.... আরো বেশি ভয়ের কারণ হলো, "মানিকগঞ্জের সব গাড়ি আমাদের এদিক দিয়েই ঢাকায় প্রবেশ করে।"
আমি বারবার বিভিন্ন সোর্স থেকে খোঁজ নিচ্ছিলাম যে আমরা কতটা ডেঞ্জার জোনে অবস্থান করছি। খুব ভয়!... এই বুঝি আক্রান্ত হয়ে গেলাম। আপনজন হারানোর ভয়!... ভালোবাসার মানুষদের থেকে এই বুঝি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম!.....
মাঝে মাঝে মনে হয় ফোন করে মাকে বলি, "মা তুমি ভালো থেকো তোমার ছেলে ভালো আছে।" আব্বাকে অভয় দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, "আপনি চিন্তা করবেন না তো হুদাই, আমরা তো সেফ জোনে আছি বাপ।"
পরদিন সকালে ক্লাস করার জন্য ক্যাম্পাসে চলে গেলাম। কারো শরীরের সাথে ছোঁয়া লাগা যাবে না, মানুষ থেকে দূরে দূরে থাকতে হবে। এরকম একটা অজানা ভয় নিয়ে ক্লাসটা করে ফিরে গেলাম মেসে।
হঠাৎই আচমকা খবর এলো দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় এক সপ্তাহের জন্য ছুটি দিয়েছে সবাইকে। তখন আমরা আর কি করবো, চলে যাবো নাকি থাকবো। এমন সময় বাড়ী থেকে আব্বা আম্মার অনবরত ফোন , বাড়ী চলে এসো এখনই।
আমি তাদেরকে যখনই বলি, "কালকে সকালটা হলেই রওনা হবো বাড়ির দিকে । এদিকে রুমের সবকিছু অগোছালো রয়ে গেছে!"
তারা তো নাছোড়বান্দা! না আজ, এখনই চলে আসতে হবে। কি আর করা তাড়াহুড়ো করে রুমের সব জিনিসপত্র অগোছালো রেখেই চলে আসা।
চলে এলাম বাড়িতে।
সকালে ঘুম থেকে বুক ধুকপুক করে আতঙ্কে আতকে ওঠলাম। আমাদের পাশের গ্রামে মাইক দিয়ে প্রচার করে দিচ্ছে, " ঢাকা থেকে করোনা আক্রান্ত এক রোগী পালিয়ে এদিকে এসেছে, কেউ সন্ধান পেলে সংশ্লিষ্টকে খবর দিতে।
খুব ভয় ভয়ে কাটলো সেদিন, আসলে এরকম আতঙ্কগ্রস্ত কোনদিন আমাদের মহল্লাবাসী পূর্বে কখনো হয়েছিলো কি না সেটা কেউ বলতে পারবে না।
দিন যত যাচ্ছে ক্রমেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। কি এক অজানা ভয়, দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না তারে। প্রত্যেকটা দিন শুনতে পাচ্ছি আশেপাশে কেউ না কেউ সংক্রমিত হচ্ছে।
তখন আমাদের জীবনে নেমে এসেছিলো এক বিষাদময় কালো অধ্যায়। বাহিরে বের হতে পারি না।
কি জানি যদি বের হলে সংক্রমিত হই!......
কেল্লাফতে!....
মন না চাওয়া সত্ত্বেও নিজেকে আটকে রেখেছিলাম চার দেয়ালে।

পাড়াপ্রতিবেশি কেউ কারো বাসায় আসে না, কারো বাসায় কাওকে খোঁজখবর নিতে যাওয়া বারণ।
এ কেমন বিপদ, যে বিপদে কেউ এগিয়ে আসে না! একের বিপদে তো আরেকজন এগিয়ে এসে সাহায্য করবে, এ মহাবিপদে কেউ এগিয়ে এসে পাশে দাড়ায় না। সবাই পালিয়ে বেড়ায়!
সেই সময় মনে হতো কেয়ামত বুঝি এটাই!......

এক গ্রামের মানুষ অন্য গ্রামে যেতে আসতে পারবে না। কারো বাসায় কোন আত্নীয়সজনের দেখা মেলে না। গ্রামে,মহল্লার প্রবেশ মুখে বাঁশ দিয়ে বেড়া দেয়া। কাউকে এদিকওদিক চলাফেরা করার সামান্য সুযোগটুকু দেয়া হচ্ছে না।
চারদিকে সে কি ভূতুড়ে নিরবতা!....
ব্যস্ত রাস্তাটাও মহুর্তে জনশূন্য হয়ে পড়েছিলো। কেউ আর অনবরত ধেয়ে চলে না এদিকওদিক। সবাই ঘরবন্দী।
আর ওদিকে মাইকে মাইকে জনসচেতনতামূলক বক্তৃতা। কেউ বাহিরে বের হবেন না, পাশের গ্রামে একজন আক্রান্ত!.....
পৃথিবীর মানুষ এর আগে এমন আতঙ্কের মুখোমুখী পূর্বে কখনো হয়েছিলো না। সৃষ্টিলগ্ন থেকে এটাই প্রথম কোন বিপর্যয় ।
পৃথিবীর প্রত্যেকটা মসজিদ বন্ধ!....
চারদিক থেকে তখন আর ভেসে আসছিলো না, "হাইয়্যা আলাস সালাহ!"
মসজিদে দুহাত তুলে মানুষের পক্ষে একটু দোয়া করার সৌভাগ্যটা ছিলো না। খুবই করুণ, খুব নিষ্ঠুর সেই দৃশ্যগুলো।
পৃথিবীর প্রাচীনতম ঘর পবিত্র কাবার দরজাটাও যে এভাবে বন্ধ হয়ে যাবে তা কেউ কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনি। পবিত্র ইবাদত হজ্জটাও বন্ধ হয়েগিয়েছিলো।

টেলিভিশন খুল্লেই দেশ বিদেশের চ্যানেলগুলোতে শুধু দেখা যেতো লাশের স্তুপ!......
বিশাল আকৃতির গর্ত সেখানে আবর্জনার মতো মানুষের মৃত দেহ মাটিচাপা দেয়া হচ্ছে।

মা ছেলের লাশের কাছে ঘেষছে না।
ছেলে বাবার লাশ রেখে পালাচ্ছে। সন্তানের লাশের প্রতি বাবার কোন মমতা নেই।
সন্তান আপন মাকে ফেলে দিয়ে আসছে জঙ্গলে। পাড়া প্রতিবেশী মহামারীতে মারা যাওয়া লাশ রেখে ভয়ে ছুটছে দিগ্বিদিক!.......

মানবতার ক্রান্তিকালেও দেখতে পেয়েছি কিছু মানুষরুপী ফেরেশ্তা, এদেশের আলেমসমাজ এগিয়ে এসেছিলো করোনা আক্রান্ত লাশ দাফন করতে। নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে তারা গোসল করিয়ে মহামারীতে মারা যাওয়া মানুষকে দাফন কাফন করতো। নিজ কাঁধে বহন করতো মহামারীতে মারা যাওয়া মৃতদেহ।

সিমট্রোম প্রকাশ পাওয়া রোগীকে দেখে হাসপাতালের নার্স, ডাক্তারদের পালায়ন।
কিন্তু এর মাঝেও অনেক ডাক্তার এবং নার্সকে দেখেছি জীবনের মায়া ত্যাগ করে সারাক্ষণ করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবা যত্ন করে জীবনকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে।
সেই সময়টাতে ডাক্তার এবং নার্সগনই ছিলেন জাতির সেবক, জাতির দুর্দিনের সাথী। তখন আমাদের কাছে মনে হতো, "একেকটা ডাক্তার এবং নার্স আমাদের নিকট ৭১'এর সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা। যারা কখনো জাতির ক্রান্তিকালে হাতগুটিয়ে বসে থাকেননি।"

তখনকার সেই ভয়াবহ নিনগুলোর কথা মনে হলে এখনও উঞ্চ রক্ত শীতল হয়ে ওঠে। প্রত্যেকটা মহুর্ত যখন ছিলো চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটা মহুর্তে তখন মনে হতো আমরাই মনে হয় সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে আজকে পর্যন্ত সবচেয়ে হতভাগা সম্প্রদায়।
আব্দুল্লাহ আল মামুন।
গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি(গবিসাস)।