কেমন হবে, করোনা পরবর্তী সামাজিক পরিবর্তন?

  • 09 June
  • 06:57 AM

আব্দুল্লাহ আল মামুন, ৩য় বর্ষ- অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগ (মাভাবিপ্রবি) 09 June, 20

"মানুষ" এই শব্দটিকে নিয়েই পৃথিবী ব্যস্ত। আদিম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত আমার মনে হয় কখনো এই মানব সভ্যতা মানুষের প্রয়োজনীয়তা ছাড়া অন্য কিছু ভাবেনি। যদি ভাবতো তবে হইতো বৃহৎ বন আমাজনকে পুড়তে দেখতে হতো না। দেখতে হতো না ওজন স্তরের ছিদ্র, মধ্যপ্রাচ্যে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা ধ্বংসযজ্ঞ, দুইটি বড় বিশ্বযুদ্ধ, এছাড়া হাজারো অরাজকতা। কেউ কেউ তাই মনে করছে, এইসকল মানব কর্মকান্ডের শাস্তিসরূপ এসেছে করোনা ভাইরাস।

সে যায় হোক না কেন, বর্তমান বিশ্বের সব থেকে বেশি আলোচিত এবং ভয়ংকর একটি শব্দ এখন করোনা ভাইরাস। কারণ করোনার ভয়াল থাবা থেকে নিস্তার পাচ্ছে না বিশ্বের তেমন কোন দেশ। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখ মানুষ এই করোনায় আক্রান্ত এবং প্রায় ৪ লাখ এর বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। অন্যদিকে এ সংখ্যাকে লাগাম টেনে ধরার কোন ব্যবস্থাই বিশ্ববাসীর কাছে নেই। এ রোগের তেমন কোন কার্যকরী ভ্যাকসিন বা টীকা এখনও বিশ্বের গুণীগুণী বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারেনি। বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটা সেক্টর আজ হুমকির মুখে। এমন অবস্থায় WHO (World Health Organization) করোনাকে অতিদ্রুতই পুরোপুরি নির্মুল করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে এবং আমাদেরকে এমন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কিন্তু অপরাধ বিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে এবং অপরাধ বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান এবং আগামীর বিশ্বের আমি কিছু পরিবর্তন উপলব্ধি করছি। আমি মনে করি এই করোনা পরিস্থিতিতে হয়ত পুরো বিশ্বের মাঝে সমাজ ব্যবস্থায় আসবে এক আমূল পরিবর্তন যা কয়েকশতকে ঘটেনি। কারণ এর আগের মহামারীগুলো পুরো বিশ্বকে এতোটা অসহায় করেনি। তাছাড়া আধুনিক বিশ্বের উন্নত সভ্যতার সামনে সামান্য ক্ষুদ্র ভাইরাস যেভাবে গ্রাস করে যাচ্ছে তাতে মানুষের পক্ষে সহজে স্বাভাবিক জীবনে আশা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। যুগে যুগে বিভিন্ন মহামারী, অরাজকতা, বহু বছর ধরে চলা নৈরাজ্য ও দুর্ভিক্ষের কারণে এর পরবর্তী সময়ে জীবনব্যবস্থার ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস রয়েছে। এইসব বিষয় নিয়েই কিছু আলোচনা, পর্যালোচনার চেষ্টা করছি।

সামাজিক পরিবর্তন আসলে কি?
সমাজ বিজ্ঞানী রজার্সের মতে, "Social change is the process by which alteration occurs in the structure and function of social system"
এছাড়াও কার্ল মার্ক্স, ডুর্খেইম, অগাষ্ট
কোঁত,ভিলফ্রেডো পেরেটো প্রমুখ বিজ্ঞানীরাও সামাজিক পরিবর্তন বিষয়ে তাদের মতামত দিয়েছেন।
সমাজ ব্যবস্থা একটি চলমান প্রক্রিয়া, সমাজ সৃষ্টির পরে থেকে আজ পর্যন্ত বহু সহস্রাধিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসে পৌছেছি আমরা। সমাজ এখনও চলমান আছে। সমাজের এমন পরিবর্তন কখনো ছিল ধীর, কখনো ছিলো খুবই দ্রুত। প্রতিটি সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের প্রয়োজনের তাগিদে।
এর প্রেক্ষিতে আমি মনে করি, সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কিছু উপাদানের প্রয়োজন যেমনঃ জৈবিক উপাদান, সাংস্কৃতিক উপাদান, শিক্ষা, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ।
সমাজ পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে বিশ্ব দেখেছে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত রেনেসাঁস।
রেনেসাঁসের মাধ্যমে ১২শ শতকে ইউরোপিয়ান শিক্ষাগ্রহণের একটি নবজাগরণ বর্তমানে স্বীকৃত হয়েছে। অন্যদিকে ১৮শ শতকের রেনেসাঁ সম্বন্ধীয় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতার একটি ধারাবাহিকতা বা সম্প্রসারণ।
এছাড়াও ১৫শ ও ১৬শ শতকের সম্মিলিত বুদ্ধিবৃত্তিক ও শৈল্পিক রুপান্তরণ, যার অন্তর্গত মানবধর্ম, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, জোর্ত্যিবিদ্যা, এবং আমেরিকার 'আবিষ্কার'।
রেনেসাসের ফলে সমাজের মাঝে এসেছে বিশাল পরিবর্তন যা সমাজের সকল উপাদানে পরিলক্ষিত হয়।

এর ধারাবাহিকতায় যদি বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করি তাহলে,
করোনার পরবর্তী সময়ে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে মনে হচ্ছে যা আমরা এখনই আমাদের সামনে দেখতে পারছি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, করোনা পরবর্তী সময়ে সমাজে কেমন পরিবর্তন আসতে পারে?

আসলে করোনার জন্য সব থেকে বড় পরিবর্তন হবে সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের সামাজিক মেলামেশায়।
আমরা হয়ত করোনার পরবর্তী সময়ে আর আগের মত সামাজিক শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারবো না বা আগের মত সামাজিক মেলামেশায় অংশ নিতে পারবো না।

করোনা পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক অবস্থার বিপুল পরিবর্তন হবে। বিশ্বের এমন লকডাউন পরিস্থিতিতে প্রায় ৩০ ভাগ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এত বিপুল পরিমান মানুষকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে যথেষ্ট সময় লাগবে। এর ফলে মানুষের মাথাপিছু আয় থেকে শুরু করে, অন্য সকল অর্থনৈতিক মানদন্ড নিম্নমুখি হবে। মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠির জীবনযাত্রার মান আরো অনুন্নত হবে।

একজন অপরাধ বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি বলতে পারি যে, বেকারত্বের হার বেরে যাওয়ায় সমাজে অর্থ সম্পর্কিত অনেক অপরাধ যেমনঃ চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি,অপহরণ ইত্যাদি বৃদ্ধি পাবে যা সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ হবে।

আমি লক্ষ করেছি করোনার আগে মানুষ অনেক বেশি যান্ত্রিক হয়ে গিয়েছিলো, নিজের পরিবারের সদস্যদের থেকে অনেক বেশি সময় ব্যয় করতো বিভিন্ন ডিভাইসের সাথে এবং বাইরে, নিজেদের মাঝে খুব বেশি মেলামেশা হতো না বললেই চলে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে মানুষ লকডাউনে বাধ্য হয়ে নিজ পরিবারের সাথে যথেষ্ট সময় কাটাচ্ছে এতে করে যেমন পরিবারের সদস্যদের মাঝে ভালবাসা বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনিভাবে পারিবারিক বিভিন্ন সংঘাতও বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত যা একজন সচেতন নাগরিকের জন্য চিন্তার বিষয়।

করোনার কারনে হয়ত শিক্ষা ব্যবস্থাতেও বিপুল পরিবর্তন আসবে বলে আমি মনে করি, কারন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বহু শিক্ষার্থী একত্রে মিলিত হয়, এতে করে করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুকি থেকেই যায়।
এজন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনেকাংশে অনলাইন ভিত্তিক বা ক্লাস রুমের বাইরের শিক্ষাদানের মত করে সাজানো হতে পারে।
এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আবশ্যক, তা না হলে করোনা ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে মানুষের মাঝে।

আমার মনে হয়, সব থেকে বড় বিষয়, চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্রটি সমূহ দূর করার সময় এসেছে, আমরা ভাবতাম উন্নত দেশগুলো চিকিৎসা বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে গেছে কিন্তু করোনাকালে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো আমাদের ভুল গুলো। বিশ্বের কোন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাই এই করোনার বিরুদ্ধে শক্ত হাতে রুখে দাড়াতে পারেনি। পুরো বিশ্বের চিকিৎসা ব্যবস্থা আবারো নতুন করে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে যা আমাদেরকে নতুন দিনের দিকে নিয়ে যাবে।

সমাজের পরিবর্তন কখনোই এককভাবে উন্নতি বা অবনতির দিকে ছিলো না। সমাজের ভাল খারাপ দুদিক থেকেই পরিবর্তন সাধিত হয়। করোনা পরবর্তী সময়ে যে সকল পরিবর্তনই আসুক না কেন আমাদেরকে তা মেনে নিতে হবে এবং এর থেকে সঠিক শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। করোনা আমাদের থেকে যেমন অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে তেমনি আমাদেরকে অনেক কিছু দিয়েও গেছে। আমরা শিখেছি কিভাবে মানবিক সাহায্যের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠির জীবনযাত্রা সচল রাখা যায়, আমরা শিখেছি কিভাবে পুরো দেশ অচল হয়ে গেলেও নতুন করে বাচতে হয়, আমরা শিখেছি কিভাবে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে হয়, আমরা শিখেছি সমাজের পরিবর্তন হলে তার সাথে মানিয়ে নিতে হয়। করোনা এসেছে বলে সকল অনিয়ম আমাদের সামনে পরিস্কারভাবে ভাসছে আর নিয়মগুলোর বাস্তবায়নের চিন্তা আসছে। করোনা প্রকৃতির থেকে পাওয়া শাস্তি হোক কিংবা সৃষ্টিকর্তার থেকে পাওয়া অভিশাপ, এটি সভ্যতার ব্যাপক পরিবর্তন নিয়েই এসেছে।
আশা করি আমরা সকলেই সুস্থ, সবল থাকবো এবং করোনার বিরুদ্ধে জয়লাভ করবো।