করোনা কালে কেমন আছে পোশাক শ্রমিক?

  • 05 June
  • 11:52 AM

মো.আলাউদ্দিন খান, ২য় বর্ষ- ক্রিমিনোলজি & পুলিশ সায়েন্স (মাভাবিপ্রবি) 05 June, 20

জন্মের পর প্রথম থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সিংহভাগ অবদান রেখে আসছে কৃষিখাত। এর পরবর্তি অবস্থানে আছে বিভিন্ন শিল্পখাত,আর শিল্পখাত বলতে বিরার অংশ জুড়ে পোশাক শিল্প।আর পোশাক শিল্পের যারা শিল্পী তারা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসে,শখ করে নয় পেটের দায়ে।

পেটের দায় তো নিশ্চয়ই।বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পার করে দুবেলা খেতে পারতো তারা।বরং অনাহারে মরার চেয়ে ভালো একটা কিছুর ব্যবস্থা ছিলো গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য। কিন্তু দেশে করোনা ভাইরাসের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় পোশাক শ্রমিকদের জীবনে রীতিমতো ভাঁটা চলছে। বিশের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাধার সৃষ্টি করেছে সারাবিশ্বে যুদ্ধের শত্রুপক্ষ করোনা ভাইরাস। আর এই সময়ে শিল্পকারখানার শ্রমিকদের সাস্থ্য সুরক্ষা, কর্মস্থলের নিরাপদ পরিবেশ, বেতন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে গার্মেন্টস মালিকদের। শ্রমিকদের পরিবারের খাদ্যের যোগান ও নিত্য প্রয়োজনীয় কারণে জীবন বাজি রেখে জীবনের জন্য নিতে হচ্ছে ঝুঁকি, করতে হচ্ছে কাজ।

জীবন চলছে অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে, প্রায় অনেকের মতে জীবন এখন "কেবলই রাত হয়ে যায়।" সত্যি তাই, জীবন এখন কারো কাছে শুধু রাতের অন্ধকারের মতো।কি হচ্ছে, কি হবে-নানা ধরনের চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে একশ্রেণির মানুষের কাছে, যাদের অধিকাংশই পোশাক শ্রমিক। করোনায় এই গার্মেন্টস শ্রমিকদের অসহায়ত্ব যেন আরেক কালো অধ্যায়ের নাম।

দেশ জুড়ে শেষ হওয়া লকডাউন ছিলো পোশাক শ্রমিকদের জন্য অন্য এক অভিজ্ঞতা। চাকরি হারানোর ভয়ে বা বকেয়া বেতন পাওয়ার আশায় করোনা ভাইরাস সংক্রামনের ঝুকি উপেক্ষা করে পায়ে হেটে,পিক আপে, রিক্সায় করে গন্তব্যে পৌঁছে তারা দেখলো, দরজা বন্ধ। বেতনের শেষ আশাও তাদের থেকে অনেক দূরে। টাকার অভাবে শ্রমিকদের লড়াই লক ডাউনের কাছে হার মেনে যায়। বাড়িতে না খেয়ে থাকা শিশু দের ফ্যাকাশে মুখ, ক্ষুধায় না খেয়ে দিন যাপন যেন তাদের কাছে করোনা থেকেও ভীতি কর। সবখানেই সেই একই অনিশ্চয়তা এবং হতাশার পুনরাবৃত্তির গল্প। এর মধ্যে অনেকেই থাকেন ঘনবসতি পূর্ণ ঘিঞ্জি এলাকায়, যেখানে নেই পর্যাপ্ত সুবিধা, না খেয়ে অভাবে ও অনেকটা আতঙ্কের মাঝে দিন কাটাচ্ছে এই শ্রমিকরা। তাদের বক্তব্য: " শ্রমিকরা শুধু গার্মেন্টস খাতের মেশিন চালানোর কর্মী নন। তারা এদেশের নাগরিকও। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। "

সাভার শিল্পাঞ্চল এবং ঢাকা ইপিজেডের দেড় হাজার পোশাক শিল্পে কর্মরত প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবার মারাত্মক ঝুঁকি নিয়েই জীবন-জীবিকার তাগিদে রয়েছেন এখন কর্মস্থলে। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে বড়, মাঝারী, ক্ষুদ্র– কোন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানেই সম্ভব হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি মানা। পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের গাদাগাদি করে কাজ করায় করোনা সংক্রমণ মহামারি আকার ধারণ করতে পারে বলে আশংকা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশেষজ্ঞদের।

শ্রমিক অধ্যুষিত সাভার-আশুলিয়া এবং ধামরাইয়ে প্রায় এক কোটি মানুষের বাস। ঈদের ছুটিশেষে ঢাকা ইপিজেডের তিন লাখ শ্রমিকসহ বিভিন্ন পোশাক শিল্পে কর্মরত প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক করোনা ভাইরাসের ঝুকি নিয়েই কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। করোনা সংক্রমণ এড়াতে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই এখনো শ্রমিকদের জন্য তেমন কোন সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। করোনা শংকা নিয়েই পোশাক শ্রমিকদের টানা ১০/১২ ঘন্টা কাজ করতে হচ্ছে। ফলে, সাভার অঞ্চলে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। আড়াইমাসে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৫শ’ এবং মারা গেছেন ৭ জন।

গার্মেন্টস এন্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি, শ্রমিকদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে জানান, "দেশের এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের বেঁচে থাকাই দায় হয়ে উঠেছে। আবার কর্মস্থলে না গেলে চাকরিই থাকছে না। আবার পোশাক কারখানাগুলোও চালু রাখা দরকার।"

বিদেশের রপ্তানী বাজারে অর্ডার বাতিলের শংকা আর পোশাক শ্রমিকদের চাকরি চলে যাওয়া যেন সমানুপাতিক সম্পর্ক। কাজ না থাকলে চলবে কি করে।

দেশে বিরাজমান এমন পরিস্থিতি সামনে দেশ ও জাতির জন্য ধ্বংসাত্নক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যা এর মধ্যে কিছুটা হলেও দৃশ্যমান। বেঁচে থাকার শেষ আশাটাও ছিনিয়ে আনতে আর চাকরি শেষ অব্দি টিকিয়ে রাখতে শত শত গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলন ও মিছিল এর দাবি চলছে এই সময়েও। এই করোনা সংকটে উদযাপিত হয় মুসলমান দের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ- উল-ফিতর। অনেক পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন বোনাস পরিশোধ করেনি বলে দাবি করেছে শ্রমিকরা, শেষ মুহূূর্তে বকশিসের নামে নাম মাত্র টাকা দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দিয়ে শ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়।শেষ সময়ে অতিরিক্ত দামে উচ্ছিষ্ট জিনিসপত্র কিনতে হয়, পরিবহন ভাড়া বাবদ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়, ঝুকিপূর্ণ ভাবে যানবাহনে যাতায়াত করে বাড়ি ফিরতে হয়, যা অনেক পোশাক শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

এভাবে করোনা সংকটকালে দেশে ৩০-৪০ লাখ শ্রমিক আজ দিন কাটাচ্ছে অভাবের সাথে নিত্য লড়াই করে। অসহায় মুখ নিয়ে আকাশে তাকিয়ে মনে হয়, " আমার মুক্তি ওই আকাশে" আবার মনে হয়, " কোন আকাশে, কোনটা আমার পৃথিবী।"

আশেপাশে বসবাসরত শ্রমিকদের জীবনযাপনে পরিবর্তনের ছাপ দেখা যাচ্ছে। করোনা ভাইরাসে সৃষ্ট পরিস্থিতির পূর্বে তাদের জীবনমান যেমন ছিল তার তুলনায় এখন অনেক পরিবর্তন লক্ষণীয়। শিল্প কারখানার মালিকের শ্রমিকদের বেতন ভাতা বকেয়া রাখার কারনে শ্রমিকদের জীবন চালানোই এখন দায়।

যেখানে একটা কথা আছে নদীর এ কুল ভাঙে ত ওকুল গড়ে সেখানে শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তা দু কুল ভাঙার উপক্রম। তারা না পারছে বাড়িতে বসে খাবারের যোগান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
যেহেতু হাসবার মতো অবস্থা দেশে বর্তমান বিরাজমান নয়,তাই কেউ যাতে না কাঁদে সে বিষয়েও লক্ষ্য রাখা খুব বেশি প্রয়োজন।
কারণ বিশ্ব একদিন করোনা নামক মহামারী থেকে রেহাই পাবেই।আর সেই নতুন বিশ্বকে আবার ফুল দিয়ে সাজিয়ে তুলবে আমাদের শ্রমিক ভাইয়েরা।