করোনা ও ভয়াবহ ভিডিও গেম আসক্তি

  • 24 May
  • 01:25 PM

মুহাম্মদ রওশন জামিল, শিক্ষার্থী- ২য় বর্ষ, ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ (মাভাবিপ্রবি) 24 May, 20

করোনা নামক এই মহামারীতে যখন সারাবিশ্বের মানুষ ঘরবন্দী ঠিক তখনই ভিডিও গেমিং বেড়েছে বহুগুণে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পূর্বেই ভিডিও গেমে আসক্তিকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার তালিকাভুক্ত করেছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোগব্যাধির শ্রেণি বিন্যাসের তালিকায় এই আসক্তিকে ''গেমিং রোগ'' বলে চিহ্ণিত করা হয়েছে।

সারাবিশ্বে চলমান লকডাউনের ফলে মানুষ ঘরবন্দী হয়েছে এবং বন্ধ হয়েছে সব ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা।এই সুযোগে কিশোর বয়সীরা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে ভিডিও গেম।

পঞ্চগড় বি.পি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ ম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়াদ হাসান আমাকে বলেন,"লকডাউনের পূর্বে আমি সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত স্কুলে থাকতাম। আবার বিকেল ৫ টা থেকে প্রাইভেট শেষ করে সন্ধ্যায় টেবিলে পড়তে বসতাম। এর মধ্যে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খেলাধুলার সময় বের করে নিতাম।ভিডিও গেমে সারাদিন সর্বোচ্চ ১ ঘন্টা সময় দিতাম।
কিন্তু ইদানিং স্কুলে যেতে পারছিনা, সাথে সারাদিন ঘর বন্দী থাকায় বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ভিডিও গেমকেই বেছে নিয়েছি।"

এছাড়াও বিভিন্ন বয়সের প্রায় ৭ জন কিশোরদের উপর নজর রেখে আমি লক্ষ্য করেছি,
তারা আগের তুলনায় খুব বেশি সময় অনলাইনে দিচ্ছে যার অধিকাংশই খরচ করছে ভিডিও গেমে।

ভিডিও গেম আসক্তিতে পরিনত হয় কিভাবে?
ভিডিও গেমগুলো দুই ধরনের হয়ে থাকে।
একধরণের ভিডিও গেম যেখানে টার্গেট নির্দিষ্ট থাকে।যেমন - গেমের মূল লক্ষ্য কোন রাজকন্যা উদ্ধার কিংবা মোটরসাইকেল রেসে প্রথম হওয়া অথবা সর্বোচ্চ পয়েন্ট জেতা ইত্যাদি। এ ধরনের গেমে কয়েকবার জিতলে গেমের প্রতি অনিহা সৃষ্টি হয়।
কিন্তু অন্য আরেক ধরনের গেম ইদানিং খুব বেশি চলছে যেখানে একসাথে অনেক জন মিলে অনলাইনে খেলতে হয়।এই ধরনের গেমগুলোর মধ্যে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হল ফ্রী ফায়ার,পাবজি।এই গেমগুলোর কোন শেষ না থাকায় এগুলো কিশোর বয়সীদের জন্য আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই গেমগুলোতে খেলোয়াড় নিজেকে একটি চরিত্রে পরিণত করে এবং অন্য খেলোয়াড়দের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করে।এসমস্ত গেম থেকে সহজে কেউ বের হতে পারে না, যার কারণে সৃষ্টি হয় আসক্তির।
যেহেতু লকডাউনের এই সময়ে পড়াশোনা বা অন্য কোন কাজের তেমন চাপ নেই তাই কিশোর বয়সের ছেলেমেয়েরা ভিডিও গেমিং এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে।

ভিডিও গেমের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি হলে গেম খেলোয়াড়দের যে যে ক্ষতি হতে পারে-

নিদ্রাহীনতা:- স্বাভাবিক ভাবে অন্য জন এগিয়ে যেতে পারে এই চিন্তা থেকে অধিকাংশ কিশোর অনেক রাত পর্যন্ত গেম খেলতে থাকে। এবং গেমের ভুল বা নিজের ভালো কিছুর চিন্তায় তেমন ভালো ঘুম হয় না।

মাথা ব্যথা:- অধিক সময় ধরে ভিডিও গেম খেললে চোখ ও মস্তিষ্কের উপর চাপ পড়ে এবং মাথা ব্যথা করে।

কার্পাল টানেল সিন্ডোম :- এটি এক প্রকার কব্জির প্রদাহজনিত রোগ। গেম খেলার সময় অনেক সময় মাউস ও কি-বোর্ডের ব্যবহারের ফলে এ রোগের উৎপত্তি হয়।

পৃষ্ঠা বেদনা :- অধিক সময় ধরে চেয়ারে বসে গেম খেললে পৃষ্ঠা বেদনার সৃষ্টি হয়।

মানসিক অবসাদ :- যেহেতু গেমগুলো মনোযোগের সাথে খেলা হয় তাই গেমের যেকোন ভুল গেম শেষ হলেও খুব বেশি বিষন্নতার সৃষ্টি করে।এবং দিনের অন্য সময়েও এর প্রভাব পরে।

ভিডিও গেমের প্রতি আসক্তির ফলে এ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আত্মহত্যা এমনকি খুনের মতো ঘটনা ঘটেছে।যা করোনার পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।

ভিডিও গেমের প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অনেক আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করেছে।এই লক্ষ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার একটা নতুন আইন করেছে যাতে ১৬ বছরের কমবয়সীদের মধ্যরাত থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত অনলাইন গেমস খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

জাপানে যারা খেলে তারা প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট সময়ের বেশি খেললে তাদের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।

চীনে টেনসেন্ট নামে বড় ইন্টারনেট কোম্পানি বাচ্চারা কত ঘন্টা ইন্টারনেটে তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলো খেলবে তার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

ভিডিও গেমের আসক্তি থেকে বেঁচে থাকার জন্য আমরা সম্ভবত যে কাজগুলো করতে পারি তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ভিডিও গেমের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে কিশোর বয়সীদের সাথে আলোচনা করা।
এছাড়া পরিবারের বড়দের এবিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং লকডাউনের এই সময়ে কিশোর বয়েসীদের বিনোদনের অন্য মাধ্যম যেমন সুন্দর সুন্দর বই পড়া,লেখাপড়া, পরিবারের সাথে সময় কাটানো, extra-curricular activity ইত্যাদিকে কাজে লাগাতে হবে।