করোনা-আম্পান পরবর্তী কয়রা উপজেলার জন-জীবনে করণীয়

  • 11 June
  • 10:04 AM

মো: ইকবাল হোসেন, খুলনা (কয়রা) 11 June, 20

গত দশকে সৃষ্ট সিডর (২০০৭) ও আইলায় (২০০৯) খুলনার কয়রা উপজেলা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায় নোনা পানির ছোবলে। আইলায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ শুরুতেই যথাযথ উদ্যোগ নিলে, হয়তো দীর্ঘ ৩ বছর নোনাপানির তলে ডুবে মরতে হতো না কয়রাবাসীকে। ঠিক সে সময়ে কিছু অসাধু মুষ্টিমেয় নেতা ও জনপ্রতিনিধি সাধারণ মানুষের মুখের আহার কেড়ে নিয়ে সম্পদশালী হয়ে ওঠে।

তাদের সম্পদের পরিমাণ এবং মালিকানা নিয়ে আজো কেউ প্রশ্ন তুলেনি বা তোলার সাহস পায়নি। কিন্তু সরকারের দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ সরকারের বিশেষ গোয়েন্দা বিভাগ অত্যন্ত সততা ও বিচক্ষণতার সাথে সব কিছু তদারকি করেছেন। যারা সচেতন, সুশীল সমাজ এবং সাংবাদিক আপনারা অবশ্যই এসব বিষয়ে অবগত আছেন। এক সময় দূর্নীতির অভিযোগে দল-মত-নির্বিশেষে দায়িত্ব ও সরকারি দল থেকে বহিষ্কার করার নজিরও কয়রা উপজেলায় রয়েছে।

আপনারা হয়তো অনেকে জানেন আবার কেউ জানেন না, খুলনা জেলার প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তথা শেখ পরিবারের সুনজর রয়েছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা সহ র‍্যাব ও প্রশাসন দায়িত্বে যথেষ্ট আন্তরিক। যার প্রমাণ, সুপার সাইক্লোন আম্পানের আক্রমণের সাথে সাথেই কয়রায় ১০৫ পদাতিক সেনাদল মোতায়েন এবং আজ (১১ জুন) সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এর কয়রা উপজেলা সফর এবং তদারকি।

আমরা লজ্জিত যখন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, আপনাদের এলাকায় সরকারি সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে দূর্নীতি হয়। ত্রাণ বিতরণে অর্থ আত্মসাৎ সহ বাঁধ নির্মাণে হেয়ালিপনা করা হয়। ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা সব কিছু তদারকি করতে এবং বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণে আমাদের মোতায়েন করেছেন।

কয়রায় ভিলেজ পলিটিক্সের নোংরামিতে মানুষের জনজীবন এতোটাই হতাশায় নিমজ্জিত যে, ইদানীং সব কিছুতেই প্রশাসনের ওপর মহল, শেখ পরিবারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। আমরা আর কবে সচেতন হবো, কবে নিজেদের অধিকার ওই নোংরা, অসাধু, দূর্নীতিগ্রস্থ মানুষের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনবো? হয়তো অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ভালোবাসি কিন্তু দলীয় দূর্নীতিগ্রস্থ কিছু নেতা-কর্মীর কারণে দলে সক্রিয় হতে মন চায় না।

আপনি কি ভুলে গেছেন? সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দূর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন (২০১২), ৩ কোটি ৭ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও ৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগে (ডিআইজি) মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করে দুদক (২০১৯), সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ গোপাল বণিককে ঘুষের ৮০ লাখ টাকাসহ গ্রেফতার করা হয়,
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ওরফে ক্যাসিনো সম্রাটকেও দল থেকে বহিষ্কার এবং জেল হাজতে পাঠানো হয়।

ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি সহ নানা অভিযোগে নেত্রী নিজেই তাদের দল থেকে বহিষ্কার আদেশ দেন এবং
নরসিংদী জেলা যুবমহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়াকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই গ্রেফতার করার নির্দেশ দেন। এভাবে অসংখ্য প্রশাসনিক ও দলীয় নেতাকর্মীর যখন নৈতিক পদস্খলন হয়েছে, সাথে সাথেই তাদের দল ও দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার এমনকি আইনের মুখোমুখি করা হয়েছে।

কেন কয়রার সাধারণ মানুষেরা কিছু অসাধু মানুষের ভয়ে দাস হয়ে থাকবে? আপনি বাংলাদেশের একজন নাগরিক, সচেতন হোন এবং চেষ্টা করেন এসকল মুষ্টিমেয় মানুষের মুখোশ উন্মোচন করতে। ২০০৯ সালে যেসকল মানুষ বাঁধ নির্মাণে হেয়ালি করে, সরকারের ত্রাণ চুরি করে বাড়ি-গাড়ি করেছে। তারা ২০২০ সালে আম্পানে আবারও চেষ্টা করবে অসহায়, দুস্থ মানুষের পেটে লাথি মারতে। সুতরাং সকলে একটু চোখ কান খোলা রাখুন, যাতে সাধারণ মানুষ কষ্ট না পায়।

কয়রার সম্মানিত সাংবাদিক ভাইদের বলতে চাই, আপনি একজন সাংবাদিক, আপনার একটা রিপোর্ট বদলে দিতে পারে কয়রার মানুষের দুর্দশাগ্রস্থ জীবন। বিভিন্ন নেতাকর্মীরা আজ মাঠ গরম করে অবস্থান করছে, কাল হয়তো মাঠে থাকবে না। জানি, কয়রার মতো প্রত্যন্ত এলাকায় সাংবাদিকতা করে জীবিকা নির্বাহ করা অসম্ভব। তবুও অনিয়মের ভিতে ধাক্কা না দিলে, একদিন হয়তো সে ভিত ভাঙা কঠিন হয়ে পড়বে। সত্য-নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ করছি প্রিয় সাংবাদিক ভাইদের।

কিছুদিন আগেও কয়রা উপজেলায় ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ৩৬ টি ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ৫১ টি সরকারি টিউবওয়েল স্থাপনে স্বজনপ্রীতি সহ যাদের বাড়ি টিউবওয়েল আছে তাদেরকেও টিউবওয়েল দেয়াা হয়েছে। বিভিন অসাধু্ ব্যক্তি সরকারি জমি, ঘের দেখলের নাম করে অর্থ আত্মসাৎ করছে। রাজনৈতিক কার্যক্রম স্বচ্ছ ও সুন্দর রাখতে স্বয়ং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ কয়রা উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনে হস্তক্ষেপ করছে। এসকল বিষয় খুবই দুঃখজনক।

ভার্চুয়াল জগতে যারা যুক্ত রয়েছেন, তাদের কাছে বলছি, কয়রার মানুষের জীবন যাপন গত কয়েক দশক শোষিত এবং অনুন্নত। সেসকল শোচনীয় অবস্থা, অনিয়ম আমরা ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপ, হোয়াটস অ্যাপ ও গুগুলে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারি। এতে হয়তো আপনার ব্যক্তিগত কোন লাভ হবে না। কিন্তু এটা যখন সারাদেশ দেখবে, তখন সত্যটা উদঘাটন এবং সমাধান অবশ্যই হবে।

প্রিয় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী ভাই ও বোনেরা, সেই ভাষা আন্দোলন থেকে আজ পর্যন্ত যতগুলো সফলতা আমরা পেয়েছি, সব কিছুতেই আপনাদের অবদান অপরিসীম। তাই আম্পানে যাতে কোন মানুষ অসাধু লোক দ্বারা হয়রানির শিকার না হয়, নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সকলকে সাহায্য সহযোগিতার চেষ্টা করুন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দল-মত-নির্বিশেষে তরুণ ছাত্র সমাজকে নিয়ে আগামীতে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেন।

ইতিমধ্যে কয়রা-পাইকগাছার মাননীয় এমপি, কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান, সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সহ সকলের উদ্যোগে এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত স্বেচ্ছাশ্রমে রিং বাঁধ নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যেকোন সময় বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হতে পারি আমরা। কেননা জোয়ার-ভাটার সাথে মিতালি করে বেঁচে থাকতে হয় উপকূলবাসীকে। জোয়ারে পানির গর্জনে কেঁপে ওঠে আমাদের বুক। রিং বাঁধ ভেঙে গিয়ে পুনরায় পানি লোকালয়ে প্রবেশ যেন না করে, সেবিষয়ে দল-মত-নির্বিশেষে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকুন। বাঁধ সংস্কার নিয়ে গোবরা ঘাটাখালিতে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ পুনরাবৃত্তি না হোক, এমনটাই কয়রাবাসীর দাবি।

পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। খাদ্য ও পানির সংকটে চারদিকে হাহাকার সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে বেশি মহামারী আকার ধারণ করবে পানি ও বায়ুবাহিত বিভিন্ন রোগ। সকলকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। সরকারের জনপ্রতিনিধিদের কাছে আহবান করছি, রাস্তা ঘাট মেরামত সহ অতিদ্রুত খাদ্য, সুপেয় পানি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। আইলা পরবর্তী জনজীবনের ভয়াবহতা আজো কয়রার লোক ভুলিনি। এমন এক বিভৎস পরিস্থিতি আর দেখতে চাই না আমরা।

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে প্রদেয় অর্থ নিয়ে সারা দেশে যেমন অনিয়ম ও দূর্নীতি হয়েছে। তা সত্যি তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বায়নের যুগে লজ্জাজনক ছাড়া কিছুই নয়। কয়রা উপজেলার স্থানীয় ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানগণের কাছে বিনীত অনুরোধ থাকলো, আপনি ও আপনারা অবশ্যই জানেন, কয়রা উপজেলার পাড়া-মহল্লায় কোথায়, কে, কিভাবে দূরাবস্থার মধ্যে অবস্থান করছে? তাদের স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তালিকা প্রণয়ন করে সরকারের দায়িত্বশীলদের কাছে হস্তান্তর করেন৷ আমাদের কয়রাবাসীকে ভালো রাখতে স্বয়ং শেখ পরিবার সব সময় তদারকি করছেন। সকলে একটু সচেতন এবং স্বচ্ছ হলে, দেশের ২য় বৃহত্তম উপজেলা কয়রা সরাদেশের মানুষের কাছে এক অনন্য জায়গা করে নেবে।

আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান বাবু্ মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন কয়রাবাসীকে নোনা পানি মুক্ত করতে। তিনি ছাত্র জীবনে ছিলেন একজন পরিচ্ছন্ন ছাত্রনেতা। সেখান থেকে স্বীয় গুণ, কর্মদক্ষতায় এবং শেখ পরিবারের সুদৃষ্টিতে আজ আমাদের খুলনা ৬ আসনের এমপি। মাননীয় এমপি মহোদয়, খুলনা থেকে দূরে উপকূলীবাসীরা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার চেষ্টা এবং পরিশ্রমে কয়রা উপজেলা নোনা পানি মুক্ত সহ দারিদ্র্য মুক্ত হবে অদূর ভবিষ্যতে।

লেখক: স্থানীয় বাসিন্দা-১নং কয়রা, খুলনা এবং শিক্ষার্থী- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ -৮১০০।