করোনায় সঙ্গী মোবাইল ফোন!

  • 20 June
  • 07:36 AM

মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক (জবি) 20 June, 20

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বন্ধ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। ঘরবন্দী লাখো শিক্ষার্থী। ক্লাস-কোচিং, খেলার মাঠ, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানো, সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান কিংবা উপাসনালয়ে গিয়ে প্রার্থনা, কিছুই করার সুযোগ নেই। ফলে এখন অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রযুক্তিসামগ্রীতে নির্ভর করতে হচ্ছে ঘরবন্দি শিক্ষার্থীদের। বিশেষত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আর টেলিভিশনই হয়ে উঠছে এ করোনা দিনে তাদের সঙ্গী। ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স—এসব অনলাইন দুনিয়াই এখন তাদের জগৎ।

করোনায় আক্রান্ত সারা বিশ্ব। বাংলাদেশেও করোনার আক্রমন থেকে মু্ক্তি পাচ্ছেনা। এখন বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীরা লম্বা একটা ছুটি কাটাচ্ছে নিজ নিজ গৃহে বসে। শহরে শিশুদের খেলার সুযোগ এমনিতেই কম। যেটুকু সুযোগ ছিল শিশুদের খেলাধুলার , তাও কেড়ে নিয়েছে প্রাণঘাতী মহামারী নভেল করোনা ভাইরাস। লকডাউনের এই সময়ে পরিবারের সাথেই ঘরে আটকে আছে শিশুরাও। সময় কাটাতে বা বিনোদনের জন্য সঙ্গী হয়েছে অনেকেরই মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ। বড়রা আবার অনলাইনে পড়াশোনা করতেছে। ঘরে বন্দি থাকতে থাকতে অলস সময় কাটাতে শিশুরা মোবাইলে বা ল্যাপটপে কার্টন ছবি দেখছে বা গেইম খেলছে। প্রযুক্তি যেমন আশির্বাদ হয়ে আসছে তেমনি প্রযুক্তি অতিমাত্রায় ব্যবহারে হতে পারে ক্ষতির কারণ।

একটি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্র রিফাত। গত ১৭ মার্চ থেকে ঘর থেকে বের হতে পারছে না রিফাত। ফলে মোবাইল ফোন আর ল্যাপটপই এখন তার একমাত্র সঙ্গী। এই দুই যন্ত্রে সিনেমা দেখে ও বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়েই দিন কাটে রিফাতের। রিফাত বলেন, সারাদিন ঘরে বসে তো সময় কাটে না। বাইরের রেরোনোরও সুযোগ নেই। তাই মোবাইলে বন্ধুদের সাথে ভার্চুয়াল আড্ডা দিয়ে আর সিনেমা দেখেই সময় কাটাতে হয়।

নবম শ্রেণীর ছাত্র আসিফ। ঢাকার একটি নামকরা স্কুলে পড়াশোনা করে। নিয়মিত স্কুলে যায়, বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করে, একসাথে আড্ডা দেয় ঠিকমতো পড়ালেখা করে। ভালোভাবেই চলছিলো তার দিনগুলো। কিন্তু মার্চ মাসের মাঝামাঝি হতে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়, বাড়ির বাইরে যাওয়ার বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। হঠাৎ সে নিজেকে চার দেয়ালে বন্দি অনুভব করে। তাই সময় কাটাতে মোবাইলের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এখন তার দিন কাটে মোবাইলে ভিডিও গেমস খেলে, ফেইসবুক চালিয়ে আর মুভি দেখে।

উপরের চরিত্রটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে এরকম অনেক আসিফকে খুঁজে পাওয়া যাবে। করোনা ভাইরাস তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে সমগ্র বিশ্বে এবং যার ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। আমাদের দেশে এ বছরের ১৭ মার্চ থেকে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কাজেই শিক্ষার্থীসহ সকলে নিজেদের ঘরে জীবনযাপন করছে। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই দেশের ও বিদেশের আত্মীয়স্বজনদের খোঁজ খবর হোক কিংবা বন্ধুদের সাথে আড্ডাই হোক প্রায় সব কিছুই এখন মোবাইলে করতে হচ্ছে। দিনের বেশিরভাগ সময় এখন আমাদের কাটছে মোবাইলে। ফলে অনেকেই মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে যাচ্ছে।

ঘরবন্দি থাকার কারণে মোবাইল ফোন হয়ে গেছে আমাদের পরম বন্ধু। মোবাইলে গেমস, ফেসবুক চ্যাটিং, ইউটিউব দেখার পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। একটু পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় করোনা প্রাদুর্ভাবের আগে মানুষ নিজ নিজ প্রয়োজনে যতটুকু পরিমাণ মোবাইল ব্যবহার করতো এখন সেই ব্যবহার আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে মোবাইলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে অনেকেই মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, তাদের স্বাস্থ্যের উপর সৃষ্টি হচ্ছে বিরূপ প্রভাব। এ ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। তাছাড়া অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার মাথায় টিউমারের সৃষ্টি করে, ঘুমের সমস্যা বা নিদ্রাহীনতা দেখা দিতে পারে। মোবাইলের প্রতি আসক্ত হওয়ার কারণে একঘেয়েমি, স্মৃতিশক্তি লোপ এবং বিভিন্ন মানসিক সমস্যা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই আমাদের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হয় মোবাইলের পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত।

করোনায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো। কেননা যে কোনো সেবার জন্য ফোন করলে আগে করোনার সতর্কতা বিষয়ক ম্যাসেজ দেয় তবে তা বিনামূল্যে নয়। এর জন্য টাকা কেটে নেয়। আমার মনে হয় এটা অমানবিক। করোনার সতর্কতার মেসেজটি বিনামূল্যে দিতে পারতো। তাছাড়া এখন অনেকের অবসর সময়ের সঙ্গী হচ্ছে মোবাইল ফোন। ফলে মোবাইল ফোনের ব্যবহার অনেকাংশে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিশু-কিশোরদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন-কম্পিউটার যতটা সম্ভব দূরে রাখাই ভালো। এগুলো তাদের কল্পনাশক্তিকে সীমিত করে ফেলে। এছাড়া চোখ ও মস্তিষ্কেরও ক্ষতি করে।

মোবাইলের অপব্যবহার আমাদের জীবনের মূল্যবান অনেক সময় তাকে নষ্ট করছে। মোবাইল সারা দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। আমরা চাইলে এখন মুহূর্তের মধ্যেই মোবাইলের মাধ্যমে যেকোনো তথ্য জেনে নিয়ে নিজেদের আরও সমৃদ্ধ করতে পারি। তাই মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রোডাক্টিভ হয়ে সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহার করা উচিত। তাছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে আমরা অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে অবসর সময় পেয়েছি। কাজেই আমাদের পরিবারের সাথে খুব ভালোভাবে সময় কাটানো উচিত। অবসর সময় কাটানোর জন্য আমরা অনেক গল্পের বই পড়তে পারি। ঘরের বিভিন্ন কাজে পরিবারের মানুষদের সাহায্য করতে পারি।