সময়োপযোগী পদক্ষেপে যেভাবে করোনাকে হারিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া

  • 20 Apr
  • 11:43 AM

20 Apr, 20

করোনা মোকাবেলায় দক্ষিণ কোরিয়ার এপ্রোচকে বলা হচ্ছে আইডিয়েল এপ্রোচ। দক্ষিণ কোরিয়া আসলে কি করেছিল? দক্ষিণ কোরিয়ার সেই এপ্রোচ নিয়েই জানাব আজকে।


শুরুতে বলে নেই, ২০১৫ সালেও দক্ষিণ কোরিয়া করোনা ভাইরাসের থাবায় পড়েছিল। সে করোনা ভাইরাসটি ছিল MERS (Middle East Respiratory Syndrome) Coronavirus। মূলত সৌদি আরব হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসটিতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সেবার সবচেয়ে আক্রান্ত ছিল দক্ষিণ কোরিয়ায়। সে সময় বাহরাইন থেকে আসা এক ব্যক্তির মাধ্যমে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনে দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল ১৮৬ জন, মৃত্যু হয়েছিল ৩৮ জনের। দুই মাসের কম সময় স্থায়ী হলেও দক্ষিণ কোরিয়াকে সেবার বড়সড় একটা নাড়া দিয়েছিল MERS-Cov।
সংক্রমণ কমে গেলেও এ ধরনের ভাইরাস মোকাবেলা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষণা-পরিকল্পনা থেমে যায় নি। তারা অনুধাবন করল এ ধরনের ছোঁয়াচে ভাইরাস মোকাবেলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে “টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট”। যত কম সময়ে যত বেশী মানুষকে টেস্ট করা যাবে, তত দ্রুত আক্রান্তদের আইসোলেট করা যাবে আর কমিয়ে আনা যাবে সংক্রমণের হার। একইসাথে তারা কাজ করছিল ডায়াগনস্টিক টেস্ট আর শনাক্তকারী কীট নিয়েও।


৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ চীন কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত প্রথম ব্যক্তি শনাক্ত করে। এরপর জানুয়ারি পেরিয়ে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে এসে করোনা ভাইরাস যখন এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে তখন দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ৩০। আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার বায়োটেক কোম্পানিগুলো এর মধ্যেই তৈরি করে ফেলেছে হাজার হাজার টেস্টিং কিট। দ্রুততম সময়ে হাসপাতালগুলোতে পৌঁছানো শুরু হয় টেস্টিং কিট ও অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী। দেশটি প্রস্তুতি নিতে শুরু করে অনাগত ভয়াবহ বিপদের জন্য।


যে সংকট মোকাবেলার জন্য এত পরিকল্পনা, এত দিনের প্রস্তুতি সে সংকট শীঘ্রই দেখা দিল। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় হঠাৎ করোনার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। এই সংক্রমণ বাড়াতে বড় ভূমিকা ছিল পেশেন্ট-৩১ এর। টেস্ট পজিটিভ হবার আগে পেশেন্ট-৩১ গিয়েছিলেন এক চার্চে, শতাধিক মানুষ এসেছিলেন তার সংস্পর্শে। তাদের অনেকেই পরবর্তীতে আক্রান্ত হন কোভিড-১৯ এ। বড় আকারের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঠেকাতে পেশেন্ট-৩১ এর সংস্পর্শে আসা সবাইকে কোভিড-১৯ টেস্ট করা হয়। সেই সাথে পেশেন্ট-৩১ এর সংস্পর্শে যারা এসেছিলেন তাদের প্রত্যেকের সংস্পর্শে আশা সবাইকেও টেস্ট করতে শুরু করে দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগ। একে বলা হয় "CONTACT TRACING”। অর্থাৎ বাজারে-উপাসনালয়ে-রাস্তায় কিংবা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির সংস্পর্শে যারাই এসেছেন তাদের ম্যাপিং করে দ্রুত টেস্ট করতে থাকে দক্ষিণ কোরিয়া, সিম্পটম থাকুক আর না থাকুক। এরপর দ্রুততম সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নেয়া হত আইসোলেশনে। আর তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণের জন্য কোয়ারেন্টাইনে। এই পদ্ধতিতে কোন আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তির আশেপাশে থাকা প্রায় ৯০০০ বক্তিকে টেস্ট করা সম্ভব হয়েছে, তার মানে কোন ঝুঁকি নেয় নি দেশটি। ইতোমধ্যে হাসপাতালগুলোতে টেস্টিং কিট চলে যাওয়ায় চলতে থাকে টেস্টিং। সরকারি-বেসরকারি হেলথকেয়ার সিস্টেমের উদ্যোগে দেশটির ৬০০ লোকেশনে একসাথে চলে টেস্টিং, যার মাধ্যমে প্রতিদিন ২০,০০০ জনকে কোভিড-১৯ টেস্ট করেছে দেশটি।
এটা তো গেল সরাসরি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের জন্য ব্যবস্থা। আক্রান্ত ব্যক্তি তো অনেক শহর ঘুরে আসতে পারেন, পাবলিক প্লেসে গিয়েছেন, লিফটের বাটন বা দরজার হাতল হাত দিয়ে ছুঁয়েছেন – এগুলোর কি ব্যবস্থা? অবাক হবেন, দক্ষিণ কোরিয়া প্রিপারেশন নিয়ে রেখেছিল এগুলোর জন্যও। সরকারি ওয়েবসাইট ও প্রাইভেট এপগুলো আক্রান্ত ব্যক্তির ডাটা কালেক্ট করে তা কম্পাইল করত। এরপর যেসব এরিয়াতে পেশেন্ট আছে সেসব এরিয়ার আশেপাশে কেউ থাকলে লোকেশন দেখে তার ফোন নম্বরে জরুরী সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়ে দেয়া হত আশেপাশে কোথায় আক্রান্ত ব্যক্তি আছেন ও শনাক্ত হবার আগে তিনি কোথায় কোথায় কোথায় গিয়েছেন। সর্বোচ্চ সতর্কতা যাকে বলে!
আর পেশেন্ট হিস্টোরি ওয়েবসাইট ও এপগুলোতে সবার জন্য ছিল উন্মুক্ত। যে কেউ ওয়েবসাইট বা এপের মাধ্যমে দেখতে পারবে কোথায় কোথায় আক্রান্ত রোগী আছে আর সে রোগী কোথায় কোথায় গিয়েছে। তাই জরুরী প্রয়োজনে কেউ ঘর থেকে বের হলেও তার জন্য “ইনফেকশন এরিয়া” এড়িয়ে যাওয়া সহজ ছিল।
শীঘ্রই এই CONTACT TRACING Approach এর সুফলও পেতে শুরু করে দক্ষিণ কোরিয়া। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে তাদের আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫০০০ এর কাছাকাছি যা তখন ছিল চীনের পর সর্বোচ্চ। কিন্তু এরপর যা ঘটে তা ছিল ম্যাজিক্যাল। যখন সবদেশে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা তার আগেরদিনের আক্রান্তের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে, ঠিক তখন দক্ষিণ কোরিয়ার করোনা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে শুরু করে। প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ইতালি-চীনের চেয়ে কয়েক গুণ কম ছিল।
শুরুর দিকে এপিসেন্টার হয়ে যাওয়া দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন পর্যন্ত (২০ এপ্রিল) মোট আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ১০,৬৭৪ জন। অন্যদিকে কাছাকাছি সময়ে প্রথম করোনা শনাক্ত হওয়া অন্য দেশগুলোতে এখনও বেড়েই চলেছে আক্রান্তের সংখ্যা। দক্ষিণ কোরিয়ায় কোভিড-১৯ এ এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন ২৩৬ জন। অর্থাৎ আক্রান্তদের তুলনায় মৃত্যুহারও অন্য দেশগুলোর তুলনায় কয়েকগুণ কম। ক্লোজড কেসে পুরো বিশ্বে গড় মৃত্যুহার যেখানে প্রায় ২১ ভাগ সেখানে দক্ষিণ কোরিয়ায় এ মৃত্যুহার ৩ ভাগেরও কম! আর সবচেয়ে বড় কথা, দেশটিতে এখন কোভিড-১৯ রোগী ২৩২৪ জন। অর্থাৎ আক্রান্ত হওয়া ৭৬% মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা একসময় ছিল কয়েকশ,এখন প্রতিদিন টেস্ট পজিটিভ হচ্ছেন গড়ে ১০-১৫ জন। আরো আশা জাগানিয়া ব্যাপার হচ্ছে প্রতিদিন যত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন তার কয়েক গুণ মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। অর্ধেক বিশ্ব যখন লকডাউনে দিন কাটাচ্ছে ঠিক তখন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনজীবন; অথচ ভয় ছিল তাদের পরিস্থিতি হবে এখনকার ইতালি, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের মত।

সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ ঠিক এভাবেই দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষা করেছে ভয়াবহ এক বিপর্যয় থেকে।

এ,বি,এম, ইফতেখার আহমেদ
আইপিই,রুয়েট