করোনাকালীন সময়ে দীর্ঘ বিচ্ছেদে প্রিয় ক্যাম্পাসকে চিঠি

  • 23 Sept
  • 08:32 PM

জবি প্রতিনিধি 23 Sept, 20

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ রোধে গত ১৭ মার্চ থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে গত ৯ এপ্রিল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বন্ধকালীন দীর্ঘ সময়ে মাঝেমধ্যে ক্যাম্পাস খোলার আভাস পাওয়া গেলেও করোনার প্রকোপ বাড়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি। বরং দফায় দফায় ছুটি বেড়ে সর্বশেষ ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ঠেকেছে। করোনার এই সময়ে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বাড়িতেই অবস্থান করে আসছে। অর্থিক সংকট ও টিউশনি চলে যাওয়ার শঙ্কা এবং টানা পাঁচ মাস বাসায় থেকে বিরক্তিবোধ কাজ করায় একঘেয়েমি কাটাতে অনেক শিক্ষার্থী ঝুঁকি নিয়েই চলে এসেছেন ঢাকা। ক্যাম্পাসের আশপাশের মেসে অবস্থান করছেন তারা। তবে বাড়িতে অবস্থান করা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। এমনই একজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হচ্ছেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া সাবাহ্,। বাড়িতে বসে করোনাকালীন সময়ে দীর্ঘ বিচ্ছেদে প্রিয় ক্যাম্পাসকে চিঠি লিখেছেন তিনি। পাঠকদের জন্য পুরো চিঠিটি তুলে ধরা হলো।



প্রিয় ক্যাম্পাস,
কখনোই বুঝতে পারিনি তোমাকে আমার এতো তাড়াতাড়ি এভাবে লেখতে হবে। দেখেছো দূরত্ব বাড়তে বাড়তে আজ কতটুুকু বেড়েছে যে লেখা লাগে। আজ ৪৯০ কি.মি দূরত্ব এর সাথে সাথে সময় ও যুক্ত হলো। দীর্ঘ ছয়মাস। এ মুহূর্তে সাধ্য নেই ঘুচানোর এ দূরত্ব। তাই বাধ্য হয়েই লেখা লাগলো। এ দুঃসময়ে অসংখ্য ভালোবাসা নিও প্রিয় ক্যাম্পাস।

জানো, ছোটবেলায় মা বলতো যা তোমার থাকবে তা নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করবে। ঠিক তেমনি অনেক আক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও আমি তোমাকেই ভালোবেসেছি। প্রেমটা হয়েই যায়। একসাথে থাকতে থাকতে, ভালোবাসতে-বাসতে হয়েই যায়। তাইতো আমি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ ফেলে মাত্র স্বল্প একরের তোমাকেই ভালোবেসেছি।

প্রিয়,
ভালোবাসার সাথে অভিমানও হয়, রাগও হয়।আমাদের সম্পর্কটাই তো এমন। মাঝে মাঝে হয়ই। মাঝে মাঝে অনেক "খিস্তিই" ঝাড়ি তোমাকে। তাই বলে এটা ভাবার কারণ নেই ভালোবাসিনা। রাগ অভিমান তো তার উপরই করা যায় যার উপর অধিকার থাকে।

সত্যি বলতে তোমাকে বড্ড মনে পড়ে। সেই যে দেখা হলো ১৬ মার্চ। গুণে গুণে তিনটি মাস পার হলো। পথ চলার সাড়ে তিনবছর এ এতো দীর্ঘ বিচ্ছেদ কখনোই হয়নি। তুমিতো জানোই, আমি ভালো নেই। তোমাকে ছাড়া কি ভালো থাকা যায়? পৃথিবীর এই অসুখ আমাদের বিচ্ছেদকে করেছে দীর্ঘায়িত। খুব যন্ত্রনা হয়। একা একা লাগে। সময়টা খারাপ। সবারই বদহয় এমন হয়। একা একা লাগে। যাকগে এবার তোমার কথা শুনি।

প্রিয় ক্যাম্পাস,
জানি না, এবার কৃষ্ণাচূড়া ফুলগুলো থরেথরে বৃষ্টিরপানিতে ঝড়ে পড়েছিল কিনা? গাছগুলো কেমন আছে? শান্তচত্ত্বর কি খুব শান্ত এখন! আমাদের কোলাহল ভাবায় না। কাঁঠালতলার কাঁঠাল গাছে কি কাঁঠাল ধরেছে?দেখ কত কত প্রশ্ন।আসলে দীর্ঘ তিনমাস, কতকিছু রয়ে যায় তারপরও।

জানো,
রুম ৮১৪,৮১৫,৮১৫ সবগুলোকেই খুব মনে পড়ে। কতকিছুই তো ছিল-আড্ডা, খুনসুটি,ঝগড়া, ক্লাস। কতকিছু। এখন কিছুই নেই। সকাল ৮.১৫ এর আরিফ স্যারের ক্লাস সিডিউল টা রাতের বেলা দেখলে চরম বিরক্ত লাগতো। কিন্তু সকাল বেলা ক্যাম্পাস চলে আসলে মনে হতো একটা দিন দীর্ঘ হলো,একটা সকাল দেখা হলো। আজকাল পরীক্ষা, ক্লাস, শেষসময়ে এসাইনমেন্ট জমা দেওয়াগুলোকে মিশ করি। খারাপ সময়ে বদহয় এমনই হয়, নিজের অপ্রিয় -অপছন্দগুলোও কী দারুণ লাগে!


প্রিয় ক্যাম্পাস,
তোমার প্রতি অনেক অভিযোগ থাকলেও আমাদের সম্পর্কটাই এমন। অনিচ্ছাকৃত বিবাহে যেমন ভালোবাসাটা হয়ে যায়। আমাদেরও তাই।তোমাকে ছাড়া নিজের অস্তিত্ব কেই অস্বীকার করা হয়। অপ্রাপ্তির সাথে প্রাপ্তিটাও কি কম?কী দাওনি তুমি! অসাধারণ কিছু বন্ধু, অসাধারণ কিছু শিক্ষক। দ্বিতীয় পরিবার। মাধ্যমিকে প্রচুর স্কুল ফাঁকি দিতাম। ক্যাম্পাসেও এসেও প্রথমদিকে বাধ্য হয়েই "এটেন্ডেন্স মার্কস"এর জন্যই ক্লাস এ আসতাম। ধীরে ধীরে এই ক্লাস এ আসাটা হয়ে পড়ে প্রিয়মুখগুলোকে দেখার জন্য।

আজকে এপর্যন্ত থাক। লেখতে থাকলে লেখা আরো লম্বা হবে। এই মহামারি শেষ হলে আমাদের দেখা হবে। ভালো থেকো।

"পৃথিবীর সমস্ত অসুখ ছেড়ে গেলে,
আমাদের দেখা হবে।
সেদিন কোলাহলে পূর্ণ হবে তুমি।
আমরাও টিএসসি র চায়ের দোকানে
আড্ডা দিতে আলোচনা করবো কীভাবে
এই বদলে যাওয়া পৃথিবীটাকে নতুনভাবে সাজানো যায়।"

দেখা হবে।


ইতি,
সাদিয়া সাবাহ্,
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী
নৃবিজ্ঞান বিভাগ।


(ছবি তুলেছেন- ইমরান হোসেন
ছবিতে রয়েছেন শ্রেয়শ্রী সরকার, আহসান হাবীব বিপু)