কয়রায় মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার ঘরে ফাটল ও নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ

  • 14 July
  • 08:57 AM

মোঃ ইকবাল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি 14 July, 21

খুলনার কয়রা উপজেলায় উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিসহ (পিআইসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মুজিব শতবর্ষ গৃহনির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অর্থের বিনিময়ে গৃহ নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এর আগেও গৃহহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহার ৫০টি গৃহ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে পত্রিকাসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি হলেও নেওয়া হয়নি যথাযথ পদক্ষেপ। প্রশাসনসহ ঊর্ধ্বতন মহলের নীরবতাই কয়রায় দুর্নীতির ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ সচেতন মহলের।

সম্প্রতি কয়রা উপজেলায় ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মুজিব শতবর্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীন ‘ক’ শ্রেণি ৩০টি, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ক্ষতিগ্রস্ত জমি আছে ঘর নেই পরিবারের ৭০টি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৩০টি ঘরসহ মোট ১৩০টি ঘর নির্মাণের কাজের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রতিটি ঘরের জন্য বরাদ্দ রয়েছে এক লক্ষ ৭১ হাজার টাকা। ‘ক’ শ্রেণীর ঘরের জন্য বাড়তি ১৯ হাজার টাকা ও পরিবহন খরচ বাবদ ঘর প্রতি ৪ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ সব কাজে মানা হচ্ছে না, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর নীতিমালা-২০ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশিকা।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি জেলা প্রশাসক এবং ঊধ্বর্তন মহলকে ধোঁয়াশায় রেখে অর্থের বিনিময়ে ঘর নির্মাণ, নিম্ন মানের ইট, স্থানীয় ধুলা বালু এবং পরিমাণে কম সিমেন্ট দিয়ে মুজিব শতবর্ষ গৃহ নির্মাণকে বিতর্কিত এবং কলুষিত করছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরের পলেস্তারা খসে পড়েছে, অনেক ঘর ফেটে চৌচির, জানালা ভেঙে গেছে অনেক জায়গায়। পানির ভিতর অপরিকল্পিত ঘর তৈরি করায় ঘর ফেটে হুমকির মুখে সুবিধাভোগী পরিবার। এছাড়াও সুবিধাভোগীদের দিয়ে মালামাল পরিবহন ও ঘরের মেঝে-বারান্দা বালু ভরাট করানোসহ ঘর নির্মাণে সীমাহীন দুর্নীতি করছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ।

গৃহ নির্মাণ নির্দেশিকা-২০২০ তথ্য মতে, ঘর নির্মাণে অগ্রাধিকার পাবে ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, বিধবা, বয়স্ক, ছিন্নমূল, অস্বচ্ছল ভুমিহীন ও গৃহহীনরাই (৪ এর ‘ক’)। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ স্বচ্ছলরাই এসব ঘর পেয়েছে।

২নং কয়রা গ্রামের সুবিধাভোগী প্রসাদ মন্ডল বলেন, আমার কোন ছেলে সন্তান নেই। ধার-দেনা করে ৪ হাজার টাকা দিয়ে মালামাল অবদা (নদীর বাঁধ) থেকে বাড়ি নিয়ে আসি। ঘরের ভিতরে বালু পর্যন্ত আমার দেওয়া লাগছে। একই গ্রামের সূর্য কান্ত মন্ডল জানান, বাড়িতে মালামাল নিয়ে আসতে তারও খরচ হয়েছে ৩ হাজার টাকা। ঘরের মেঝের বালুও নিজের টাকায় ভরাট করতে হয়েছে।

যদিও আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর নিয়মাবলির ৭নং উপানুচ্ছেদে রয়েছে ইউএনও’র সভাপতিত্বে পিআইসি কমিটি গুণগত মালামাল ক্রয় করে গৃহ নির্মাণ করবেন। কিন্তু কয়রায় উপজেলা নির্বাহি অফিসার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) যোগসাজশে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের কথিত ঠিকাদার নির্বাহী কর্মকর্তা ও পিআইও’র ঘনিষ্ঠ অলিউর রহমান, কয়রা সদরের জুতা ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম, মো. কামরুল, আশরাফ মিস্ত্রি, শাহানুর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের কামাল হোসেনকে ১৩০টি ঘর নির্মাণের দায়িত্ব দিয়েছেন। ঠিকাদারদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে প্রতি ঘর নির্মাণ বাবদ ৩০হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, ঘর নির্মাণে দক্ষ ঠিকাদার, শ্রমিকরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উৎকোচ দিতে না পারায় এসব ঘর নির্মাণ কাজ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তারা। যা গৃহ নির্মাণ নির্দেশিকা’২০ এর ৮(জ) অনুচ্ছেদ পরিপন্থী। কর্মকর্তাদের খুশি করতে অতি স্বল্প খরচে এসব ঘর মালামাল ক্রয় এবং সরবরাহ করছে ওই ঠিকাদাররা। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় কাজের শুরু থেকে দেয়াল ও পিলার ভেঙে পড়ার অভিযোগ থাকলেও তা আমলে নেননি কর্তৃপক্ষ। যে কারণে ঘরগুলোর করুন অবস্থা। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণের মাত্র এক মাসের ব্যবধানে অধিকাংশ ঘরের পলেস্তারা খসে পড়েছে, অনেক ঘর ফেটে চৌচির হয়েছে, ঘরের জানালা ভেঙে পড়েছে।

উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন এর সুবিধাভোগী আদিবাসী গোবিন্দ মুন্ডার স্ত্রী পানপতি মুন্ডা বলেন, এমন ঘর আমরা চাই না এই ঘরে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে নিরাপদে থাকতে পারবো না, বারান্দার পিলার একটা পড়ে গেছে, অন্য পিলারগুলো নড়বড় করছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমরা বালু দিছি ইট সিমেন্ট কাট পরিবহনসহ প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ করেছি গরিব মানুষ এসব টাকা সুদে নিছি এখন এই ঘর আমাদের নিরাপদ না। একই কথা বলেন সুবিধাভোগী মনমত মুন্ডা তিনিও ধারদেনা করে ঘরের বালু ক্রয় ও পরিবহন বাবদ ১০/১২ হাজার টাকা খরচ করেছে। সুবিধাভোগী সনজিৎ মুন্ডা বলেন, একটু নাড়া দিলেই গাথুনির ইট পড়ে যাচ্ছে। উপজেলা সদরের মহারাজপুর গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা বৃদ্ধা আমেনা বেগম বলেন, সরকার আমারে ঘর দিছে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম কিন্তু মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ঘরের দেয়াল মেঝে বারান্দা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে ভয়ে সারারাত ঘুম হয়না কখন ভেঙে পড়ে। এমন অভিযোগ অসংখ্য সুবিধাভোগীদের।

এদিকে গৃহনির্মাণ নির্দেশিকা উপেক্ষা করে জোরপূর্বক রেকর্ডিও সম্পত্তিতে মুজিব শতবর্ষের গৃহ নির্মাণ করায় উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের ভুক্তভোগী মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম গাজী বাদী হয়ে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাসসহ ৫ জনকে বিবাদী করে গত ৬ মে বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত কয়রা খুলনায় দেওয়ানী ৫৬/২০২১ মামলা দায়ের করেন। মামলাটির শুনানি অন্তে বিজ্ঞ আদালত অত্র মোকদ্দমা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিবাদী পক্ষকে তফসিল বর্ণিত নালিশি জমিতে প্রবেশ ও সকল প্রকার নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ রেখে বাদীর শান্তিপূর্ণ ভোগ দখলে বিঘ্ন সৃষ্টি না করার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু আদালতের এ আদেশ উপেক্ষা করে সেখানে জোরপূর্বক ৪টি ঘর নির্মাণ কাজ অব্যাহত থাকায় বাদীপক্ষ একই আদালতে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে ভায়োলেশন মামলা রুজু করেছেন।

এ ব্যাপারে কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাগর হুসাইন সৈকত বলেন, মুজিব শতবর্ষ গৃহনির্মাণ কাজ সঠিক ও কোনো অনিয়ম ছাড়াই করা হচ্ছে। এসব ঘরের কাজ আমরা সার্বক্ষণিক তদারকি করছি।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, মুজিব শতবর্ষ গৃহ যথাযথভাবে নির্মাণের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো সুবিধাভোগীর কাছ থেকে পরিবহন বা অন্যান্য বাবদ অর্থ নেওয়ার লিখিত অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কয়েকটি ঘরে সমস্যা হয়েছে সেগুলো ঠিক করা হচ্ছে।

খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সাদিকুর রহমান খান বলেন, মুজিব শতবর্ষ গৃহনির্মাণে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে একাধিকবার নির্মাণ কাজের পরিদর্শনে গিয়েছি যেগুলো অসঙ্গতি হয়েছে তা ঠিক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার নিয়োগসহ অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এবিষয়ে খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) এমপি আলহাজ্ব আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, মুজিব শতবর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার গৃহনির্মাণে ঠিকাদার নিয়োগসহ কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। যদি কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি প্রমাণিত হয় তাহলে ওই সকল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।