এক নজরে ইবির চার বছরের উন্নয়ন

  • 11 July
  • 09:12 AM

আজাহার ইসলাম, ইবি প্রতিনিধি 11 July, 20

অপরূপ লীলাভূমির ১৭৫ একর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)। যার জন্ম ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর। এটি দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী স্থাপিত দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা কারণে তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। প্রতিষ্ঠালাভের পর অনেক উপাচার্যই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার হাল ধরলেও দৃশ্যমান তেমন উন্নয়ন সাধিত হয়নি।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর অন্যতম একটি এজেন্ডা ছিল, এটিকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিকমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা। যাতে করে দেশী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়ালেখা ও গবেষণার সুযোগ পান। কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতা ও পারিপাশ্র্বিক পরিবেশের অভাবে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

তবে অতিতের তুলনায় বর্তমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র অনেকটা ভিন্ন। ২০১৬ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রত্যয়ে ১২তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. হারুন উর রশিদ আসকারী। এরপর থেকে একাডেমিক-প্রশাসনিক কার্যক্রমে অগ্রগতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রেই আমুল পরিবর্তন সাধিত হয়, যা আজ দৃশ্যমান।

দীর্ঘ ১৬ বছর পর ৪র্থ সমাবর্তন আয়োজন, ৫৯টি বিভাগ সম্বলিত অর্গানোগ্রাম পাশ, এশিয়া ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষর, অবকাঠামোগত উন্নয়নে একনেক সভাকর্তৃক ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প পাশ (যেটি চলমান), গোটা ক্যাম্পাসকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি প্রদর্শন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একনজরে বিগত চারবছরের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের চিত্র:

একাডেমিক উন্নয়ন:
দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের সর্ববৃহৎ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। নতুন তিনটি অনুষদ ও নয়টি বিভাগ খোলায় একাডেমিক কলেবর উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি বিভাগে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু। অনলাইনে ফলাফল প্রস্তুত পদ্ধতি প্রচলন। দীর্ঘদিনের সেশনজট নিরসন। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ডিজিটালাইজেশান করা। শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ‘ভাইস চ্যান্সেলর’স গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড’ প্রবর্তন।

উপাচার্যের উদ্যোগে বৈদেশিক অর্থায়নে ‘কেন্দ্রীয় গবেষণাগার’ প্রতিষ্ঠা। সকলের জন্য ইন্টারনেট সুবিধা প্রদানসহ সর্বক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা নিশ্চিত করা। নিয়মিতভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন ও বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল প্রকাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমুর্তি উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে বিদেশি শিক্ষার্থী ভতির সুযোগ বৃদ্ধি। এছাড়া একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইন্সটিটিউটের সঙ্গে একাডেমিক বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চ শিক্ষার নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করা।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন:
উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন উর রশিদ আসকারীর যোগ্য নেতৃত্ব ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৫৩৭ কোটি ৭ লক্ষ টাকার মেগা প্রকল্প একনেক কর্তৃক অনুমোদন। ই-টেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছতার সঙ্গে মেগা প্রকল্পভুক্ত ১৮টি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলের নতুন ব্লক নির্মাণ, শেখ রাসেল নামে নতুন হল, রবীন্দ্র-নজরুল কলাভবন, প্রভোস্ট ও হাউজ টিউটরদের জন্য পাঁচ তলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবন, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য পাঁচ তলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে ইন্সটিটিউট অব ইসলামিক এডুকেশন এন্ড রিসার্চের নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ চলমান। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এর জন্য ২টি ৫০০ কেভিএ বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন স্থাপন ও যাতায়াতের জন্য অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সড়ক নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পরিবহন সঙ্কট দূরীকরণে পরিবহন-পুলে যুক্ত হয়েছে ৬টি এসি কোস্টার এবং অত্যাধুনিক ২টি হিনো বাসসহ ১৫টি যানবাহন। সুস্থ বিনোদনের লক্ষ্যে নান্দনিক ফোয়ারা, দৃষ্টিনন্দন লেক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন নির্মাণ করা হয়েছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতি উজ্জীবিতকরণের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদার মুখে স্থাপন করা হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে নান্দনিক ম্যুরাল ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’। চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে ‘ডেন্টাল ইউনিট’ চালু ও নতুন এ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়েছে। এছাড়া উপাচার্যের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্ববিদ্যালয় জিমনিশিয়ামে (ব্যামাগার) নতুন নতুন ইনস্ট্রুমেন্ট সরবরাহ করা হয়েছে। এর ফলে ক্রীড়াবিদরা শুধু স্বীয় বিশ্ববিদ্যালয়েই নয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন।

প্রশাসনিক মানোন্নয়ন:
বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অফিসসমূহে ‘চেইন অব কমান্ড’ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ও কর্মপরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মঘণ্টা ৮টা থেকে ২টার পরিবর্তে ৯টা থেকে সাড়ে ৪ টা নির্ধারণ করা হয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে ব্যক্তিপছন্দের পরিবর্তে মেধা, সততা ও যোগ্যতা প্রাধান্য পাওয়ায় অফিসসমূহ ফিরে পেয়েছে কর্মচাঞ্চল্য। উপাচার্যের আন্তরিক প্রচেষ্টায় পূর্বের প্রশাসন থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ১২৩ জনবলকে রাজস্ব বাজেটে অন্তভূর্ক্তি করা হয়েছে।

ইতিপূর্বে উত্থাপিত সকল অডিট আপত্তি বর্তমান প্রশাসন দক্ষতার সাথে নিরসন করেছে। এছাড়া সকলক্ষেত্রে সততা ও স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি কমেছে। সন্ত্রাস, মাদক ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস তৈরি হয়েছে। একাডেমিক ও আর্থিক দূর্নীতির ক্ষেত্রে মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থেকে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ভাবমূর্তি ফিরে এসেছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড যখন দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলছিল, ঠিক তখনই আঘাত হানে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস। ক্রমশ বেড়েই চলেছে এই ভাইরাসের প্রকোপ। তবে বর্তমান এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা পুষিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনায় অনলাইন ক্লাস শুরু করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। যা সেশনজট নিরসনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যে স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান মেগা প্রকল্পভূক্ত উন্নয়ন কর্মকান্ড।

বর্তমান পরিস্থিতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন উর রশিদ আসকারী বলেন, ‘করোনাকালের এই চার মাস বাদ দিলেও গত তিন বছর ১১ মাসের দায়িত্বকালে আমি একটি সুন্দর টিম ওয়ার্কের মধ্যদিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন একটি অভূতপূর্ব অবস্থায় নিয়ে আসতে পেরেছি। এর জন্য আমি মহামান্য চ্যান্সেলর, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, ইউজিসির চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারী সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’