‘এক টুকরো গল্পে আমার বাবা ও তাঁর জীবন দর্শন’

  • 21 June
  • 10:16 AM

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 21 June, 20

প্রতিবছর জুনের তৃতীয় রোববার,
বাবা দিবস।মতের মিল অমিল বা বিশ্বাসের দ্বন্দ যাইহোক বাবার প্রতি পরম শ্রদ্ধা জানিয়েই আমার একটু লিখার প্রচেষ্টা।

"যে মানুষটি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে সন্তান-সন্ততি,সংসারের গুরুজন,ও সবার মঙ্গল কামনায় ব্যাস্ত,নিজের রক্তকে জল করে দিয়ে সমাজে মাথা উঁচিয়ে বাঁচার ও বাঁচানোর চেষ্টায় নিমগ্ন তিনি হলেন বাবা।
বাবা মানে আপনত্ব,বাবা মানে ভরসা-পরম আদর-ভালোবাসা-বিশ্বস্ততা।
বাবা সমাজে আব্বু,আব্বুজি,আব্বা,বাবাই ও আরও কত শব্দে পরিচিত।এই শব্দগুলো বা এই শব্দগুলোর বাইরেও বিশ্বজুড়ে আরও কত শব্দে বাবাকে বাবার সন্তানেরা
ডেকে অভ্যস্ত।যে শব্দেই বা যে ভাবেই ডাকা হোক বাবা সন্তানের জন্য ভরসার জায়গায়, নিরাপদ আশ্রয়স্থল।বাবা সত্যিই এক বিশাল বটবৃক্ষ।সেখানে সহজেই মেলে সুশীতল ছায়া।ঝড় বাদলে
বাবার মতো শক্তিশালী স্নেহের ছাতাও এই সমাজে নেই।সমাজের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ যখন প্রখর সূর্যের তাপের ন্যায় প্রকট হয়ে ওঠে,বাবা নামের এক অসম্ভব শক্তিধর ছায়া সব অসহ্য তাপকে ছায়াবৃত করে সন্তানকে নিরাপদে রাখে।পৃথিবীতে বাবা ই একমাত্র সত্যিকারের রাজকীয় ব্যাক্তি যার কোনো রাজকীয় সিংহাসন না থেকেও তিনি রাজা-মহারাজা এবং সন্তান সেই রাজ্যের রাজপুত্র বা রাজকন্যা।সাহত্যিকদের ভাষায় "পৃথিবীতে বহু নোংরা পুরুষ আছে,কিন্তু একটিও খারাপ বাবা নেই"।

বাবা মসজিদ বাবা মন্দির বাবা হলেন তীর্থস্থান।যার "মা" নেই তার পৃথিবী নেই আর যার "বাবা" নেই তার পৃথিবীতে আলো,বাতাশ ও অক্সিজেনই নেই।বাবারা একটি সময়ে উপনীত হন যখন চারপাশের সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিসের মাঝেই আনন্দ খুঁজতে থাকেন।সেই দুঃসময় আমরা বাবাকে দিতে পারি না একটু গুণগত সময়,সেখানেও অবশ্য আমরা দাঁড় করিয়ে দেই পরিস্থিতি নামক এক বিরাট অযুহাতকে।

আমি বাবাকে ছেলেবেলা থেকে আব্বুজি ডেকে অভ্যস্ত। বাবাকে নিয়ে যত স্তুতি-স্তবগান ও বন্দনাগীত ই রচনা করা হোক না কেনো,সেগুলো ও অপ্রতুল।বাবা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমি আমার বাবার কথাই বলতে চাই।ভাগাভাগি করতে চাই আমার নান্দনিক ও সাহিত্যপ্রিয় বাবার কথা।সবার বাবা ই সবার কাছে জীবনের আদর্শ,নায়ক,বীর,কারণ বাবা তো প্রকৃত অর্থেই বিশ্বমঞ্চে এক বীরোচিত চরিত্র।আমার বাবা ও আমার কাছে তেমনই এক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।আমার বাবা একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন,মেধাবী,আত্মপ্রত্যয়ী ও সুক্ষাতি-সুক্ষ্ণ প্রাজ্ঞ্যতার জ্ঞান সম্পন্ন পুরুষ।তাঁর দুরদর্শি,পৌরুষ দেহভাষা ও সৎ কর্মের মানষিকতা ই অন্যান্য পুরুষ ও বাবাদের থেকে তাঁকে আলাদা করে।আমার বাবার সাথে আমার আদর্শের দ্বন্দে তুঙ্গস্পর্শী হলেও,আমি মনে-প্রাণে অনেক সম্মান করি ও ভালোবাসি।ধর্মীয় দর্শনে,সাহিত্য দর্শনে,সমাজ ও স্বদেশ নিয়ে আমার ভাবনা বাবার সাথে প্রচন্ডরকম সাংঘর্ষিক।তাঁর সাথে এই সব আদর্শিক দিক নিয়ে এই ছোট্ট জীবনে অসংখ্যবার সভ্য ও বিনম্র বিতর্ক হয়েছে।
যৌক্তিক তর্ক-বিতর্ক,এটি আমার বাবার ই শিক্ষা।তিনি স্কুল ও কলেজ জীবনে প্রায়ই বলতেন।কোনো ধরনের অন্যায় কর্মকান্ড
ও অন্যায় বাক্যে সমর্থন না দিতে, এমনকি তিনি বলতেন, যদি কখনো মানুষ হিসেবে স্বয়ং তিনিও যদি কখনো সমাজ ও সমাজের তথাকথিত সমাজপতিদের ভয়ে ও পরিস্থিতির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেই,সেদিন সন্তান হিসেবে আমার মতো পিতাকেও এক বিন্দু ছাড় দেবে না।
জন্মদাতা পিতার মুখের এমন রাজসিক ও বৈপ্লবিক বাক্যই আজও আমার ছাত্রজীবন,কর্মজীবন,ও সমাজজীবনে যেকোনো পরিস্থিতিতে চলার পথের পাথেয়।উল্ল্যেখ্য আমার বাবা একজন প্রচন্ডরকম বিনম্র ও সাহসী ও ধর্মপ্রাণ
মানুষ যদি ও তিনি অনেক রাগী,তবুও তিনি তাঁর ধ্যান-সাধনার বলে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণে ও যথেষ্ট সক্ষম।আমার বাবার পিতৃ-মাতৃ ভক্তি ও নারীর মতো অসম্ভব সম্মান প্রদর্শন আমাকে খুবই মুগ্ধ করে।
বাবা এই বয়সেও তাঁর গুরুজনদের প্রতি যে সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করেন,তা সত্যিই আমাকে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে রাখ।আমরা বাবার সন্তানেরা প্রায় সবাই শহরেই প্রতিষ্ঠিত,তারপরেও গ্রাম বাংলার প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসা।সমাজের প্রায় প্রতিটি মুরুব্বি-গুরুজনেরাই আমার বাবার ছাত্র জীবনের মেধার ও ব্যাক্তি,কর্ম ও সমাজ জীবনের মেধাবী পদক্ষেপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।বাবাকে আমি ছেলেবেলা থেকেই পেয়েছি একজন পরোপকারী মানুষ হিসেবে।একটু কঠোর প্রকৃতির হলেও ভেতরে ভেতরে খুবই নরম মনের মানুষ।বাবা মূল কর্মজীবনে প্রবেশের পূর্বে ছিলেন একাধারে একজন কণ্ঠশিল্পী,মঞ্চাভিনেতা,ও পাকা ফুটবল খেলোয়াড়,যা আমাকে তাঁর সন্তান হিসেবে খুবই গর্বিত করে।বাবা সবসময় ই চেয়েছেন তাঁর ভেতরের সেই সম্ভাবনাময় নন্দন কলার ও শৈল্পিক কর্মকান্ডের তথা শিল্পীত রুপের প্রতিফলন অত্যন্ত সাবলীল ভাবে আমাদের জীবনে ঘটাতে।যদিও সেখানে তাঁর কোনো জোরাজুরি ছিলো না।বাবা আমাদের ছোট বেলা থেকেই সেখাতেন আমরা যেনো স্বাধীন জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হতে পারি,পাশাপাশি এটাও বোঝাতেন যে স্বাধীন হওয়া মানেই স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠা নয়।তিনি বড় হবার পরে শিখিয়েছেন সৎ ভাবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বচ্ছলতা কিভাবে অর্জন করতে হয়।বাবার দার্শনিক সুলভ কথাবলা,চিন্তা-ভাবনা,ও স্রষ্টারপ্রতি নিবিড় সম্পর্ক তৈরীর নানাবিধ
ধর্মীয় মন্ত্র ও সমাজ জীবনে সেই বিশ্বাস গুলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস আমার সমগ্র জীবনে ও লিখার ক্ষেত্রেও ব্যাপক ভাবে সুপ্রভাব ফেলে যায় ও ভবিষ্যতেও রেখে যাবে।সর্বোপরী বাবা ও বাবার বীরোচিত ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ও নিরঅহংকারী ব্যক্তিত্ব ও সুবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব সকল সময় আমাকে অনুপ্রেরণা ও প্রেষণা যোগায়।আমার বাবাসহ জগতের সকল বাবাদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা,সেলাম ও গভীর ভালোবাসা জানাচ্ছি,শুভ বাবা দিবস,এবং বাবা দিবসের জন্য মাননীয় গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের কাছে ছুটির দিন ঘোষণাসহ বিশেষ কর্মসূচীর আবেদন জানাচ্ছি।

লিখেছেন -
জাফর আহমেদ শিমুল
শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক,
সহ-সভাপতি - ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সাংবাদিক সমিতি