‘একাকিত্ত্বে ভোগা অক্ষয় বট’

  • 18 Nov
  • 08:35 AM

আব্দুল্লাহ আল মামুন 18 Nov, 20

আমি যখন খুব একা রই, একদম একা, কিংবা আমি
যখন খুব একাকিত্বে ভুগি তখন চারপাশে খুব
নিবিড়ভাবে মিশে যাই। জানালাটার পাশে বসে প্রকৃতির
সাথে কথা বলি। খুব ঘন নিবিড় সবুজ ওরা। ওরা
কখনো একজন একাকিত্বে ভোগা তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে দেয় না। কখনো গ্রহণ করতে শিখেনি ওরা। ওদের গুন গুন শব্দ আর দল বেঁধে সারি সারি দাড়িয়ে থাকা যেন আমার মতো একাকিত্বে ভুগে ডিপ্রেশনে চলে যাওয়া মানুষের দুঃসময়ের সাথী তারা। বড্ড ভালো ওরা। মাঝে মাঝে কথাও হয়, জড় ও জীবের মাঝে যে কি মধুর আলাপন হতে পারে সেটা ওদের সাথে না মিশলে বোঝা যায় না।

জানালার বা দিকটায় সুতোর মতো পেঁচিয়ে চলা রাস্তাটায় যে কত কাল একা একা হেটে চলে গিয়েছি নগরীর শেষ প্রান্তে। দুই দশক পরে এসে সেটা হাতে গুনে শেষ করা মুশকিল।

কংক্রিটের রাস্তাটা পেরিয়ে দু এক গ্রাম পরেই রসুলপুর কবরস্থান। আমার দো'চালা ঘরের ছায়া যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে যাওয়ার সাথে সাথে দু থেকে তিন গুন বৃদ্ধি পায়, আমি ঠিক তখন ঘরের কাজ সেরে বাধ্য পথিকের মতো বেড়িয়ে যাই রাস্তা পাড়ি দিতে।

ভীষণ একাকিত্বে ভোগা মানুষগুলো দিনের সূর্য এবং রাতে চাঁদের আলোর মাঝে দু'রকম ভিন্ন অর্থ খুজে পায়।
রাতের তারা, আমপাতা ভেদ করে মুখের ওপর চাঁদের আবছা আলো যেন খুব প্রিয় তাদের। দিনের সূর্যের চেয়ে নিস্তব্ধ রাতটা অনেক শান্তি দেয়, বিদঘুটে অন্ধকার কখনো ছেড়ে যায় না। চাঁদের আলো আর দূর অজানার তারকার মিলনমেলা এদের কাছে খুবই আপন।

রসূলপুর কবরস্থানটা বড্ড নিরব, রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে দুয়েকটা শেয়ালের হাকডাক ছাড়া কিচ্ছু কানে আসবে না।

সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে পশ্চিমাকাশের লালিমা অদৃশ্য হয়ে যায়। চারদিকে নেমে আসে সন্ধ্যার কালো চাদর আর মুয়াজ্জিনের হাইয়া আলাস সালাহ্।

আমি যে ভীষণ একা, একলা জীবনে নিরবতা ছাড়া শান্তির উপকরণ খুঁজে পাই না। নগরীর কোলাহল, ব্যস্ত মানুষের ঝঞ্জাট আমায় একা থাকতে দেয় না।

যখন একান্তই বড্ড বেশি খারাপ লাগে রসূলপুর কবরস্থানে চলে যাই। ওখানে মনের কথাগুলো খুঁটে খুঁটে বলে দিই, গল্পের ঝুলি তবুও ফুরোয় না। বাকি রয়ে যায় কত শত গল্প। স্মৃতিরা সব তাড়িয়ে বেড়ায়।

কয়েকটা কবর!
কবর। এ কবরই আমাকে কাছে টেনে আনে।
কবরের মাটিগুলো আমায় একা করে আপন করে নিয়েছে আমার আপনজনদের। বড্ড নিষ্ঠুর কবর।

ও কবরে রয়েছে আমার স্ত্রী। মেয়ে। এবং মেয়ের ঘরের মেয়ে খুকি। সবাই অভিমান করে চলে গিয়ে ঘর বেঁধেছে কবরে।

আমার মেয়ের ঘর আলোকিত করতে জন্ম নিয়েছিলো একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান । খুকি। ওর নাম খুকি রেখেছিলাম। ভারী মিষ্টি মেয়ে ছিলো ও।
দেখতে দেখতে খুকি যখন ১৬ তে পা দিলল, তখন ওর নানীর অনেক শখ হলো নাত জামায়ের মুখ দেখার। বিয়েও হয়েছিলো অর্ধস্বচ্ছল এক পরিবারে। ভালোই চলছিলো ওদের।

হঠাৎ একদিন খবর এলো খুকি মারা গিয়েছে।
সেই থেকে বিপর্যয় শুরু হয় দুটি পরিবারে।
খুকির শোক সইতে না পেরে আমার স্ত্রী কাকতালীয় ভাবে আমায় একা রেখে পাড়ি জমায় ওদের দেশে।

সেই থেকে আমি বড্ড একা। একাকিত্ব ঘুচাতে চলে যাই রসূলপুর করস্থানে।
জিন্দা মানুষের চেয়ে মূর্দাদের সাথে কথা বলে বেশ শান্তি পাওয়া যায়। ওরা আমার চারপাশে দলবেঁধে দাড়িয়ে থাকে আর আমি অনবরত বকবক করেই যাই। কখনো বিরক্ত হয় না, বাধ্য শ্রোতার মতো খুব মনযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনে।

লোকালয়ের মানুষগুলো বড্ড নিষ্ঠুর।
মূর্দাদের মতো ওরা আমায় শোনে না। জীবিত মানুষগুলোর যে একটাই কথা, " বুড়োটা অক্ষয় বট, সব মরে মাটির সাথে মিশে গেছে, আর ও এখনো আমাদের জ্বালিয়ে যাচ্ছে।"

শেষ রাত । রাত তিনটে কি চারটে বাজে। চারদিকে ভূতের মতো কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার। অামাবস্যা।
প্রচন্ড শীতের রাত ছিলো সেদিন। খুকিকে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করানো হয়েছিল।

শুনেছি ওর শাশুড়ি নাকি ওকে খুব অত্যাচার করতো। কখনো অর্ধাহার বা অনাহারেও রাখতো ওকে। কতবার যে ও এই নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যেতে চেয়েছে, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। ওর মা মানে আমার মেয়ে খুকিকে জন্ম দেয়ার সময়ই মারা গিয়েছিলো। আর ঘরে এলো সৎ মা। ওর বাবা অবশ্য ওকে চোখের মনি করেই রেখেছিলো।

সে যাইহোক। খুকির ভাগ্যেও যে ওর মায়ের মতো নেমে আসবে কালো অন্ধকার সে কে জানতো।
সবাই যখন হসপিটালের বারান্দায় দাড়ানো, তখন আইসিইউ থেকে একজন কর্তব্যরত ডাক্তার এসে হঠাৎ খবর দিয়ে বসলো অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং পুষ্টিহীনতার জন্য মা এবং সন্তান কাওকে বাঁচানো গেলো না।

খাটের ওপর পরে আছে খুকির নিথর দেহ। ওর চোখে মুখে অনেক আফসোস। ছোট বেলায় মাকে হারিয়ে জগতের নিষ্ঠুর মুখ সয়ে যাওয়া। আবার যে কোন অভিশাপে তাকেও সে পথেই চলে যেতে হলো।

ওর শোকে কেউ পাথর হয়ে বাঁচে পারেনি। একে একে সবাই পাড়ি জমালো সেই অজানায়। পরে রইলাম শুধু আমি।

সময় যেন কোন ক্রমেই যেতে চায় না। অনেক বুড়ো হয়ে গিয়েছি। আগের মতো দৃষ্টি শক্তি নেই। কানেও তেমনটা শুনতে পাই না। শরীরে বল নেই সেই আগের মতো।

আমাকে দেখাশোনারও কেউ নেই। কষ্টের সময়গুলো খুব লম্বা, কখনো শেষ হয়েও হয় না। পঞ্চাশের দশকে জন্ম নেয়া এক অক্ষয় বট।