অনলাইন গেমসে আসক্তি কমাতে একমাত্র প্রয়োজন সচেতনতা

  • 01 Dec
  • 09:19 AM

মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ, শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় 01 Dec, 20

মাঠে গিয়ে ধুলো - কাদা মাখা হয় না আর এখন। ঘেমে - নেয়ে বিকেলে খেলা শেষে বাড়ি ফেরার চিরারিত দৃশ্যটা আজকাল যেন হারিয়ে যাচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায় খেলার জায়গার অভাব, পড়ার চাপ, যেমন তেমন বাইরে গেলে খারাপ হবার ভয় - কতই না অভিযোগ অভিভাবকদের! তার বদলে অভিভাবকরা বিনোদনের নামে যা তুলে দিচ্ছেন ছেলে-মেয়েদের হাতে, তার ক্ষতির পরিমাণটা তাদের ধারণারও বাইরে। এরসাথে অনলাইন গেমস যেনো খাড়ার উপর মরার ঘা।

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি বন্ধের কবলে পড়েছে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিল ছেড়ে আধুনিক স্মার্ট মোবাইলে ফ্রি ফায়ার ও পাবজি সহ অন্যান্য অনলাইন গেমসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ খেলায় আসক্ত হচ্ছেন। বর্তমান প্রজন্মের শিশু কিশোররা আগের মতো বাইরে খেলাধুলা করে না। গল্পের বই পড়ে না। এমনকি কারো সঙ্গে মন খুলে কথাবার্তাও তেমন বলে না। এ দৃশ্য ক্রমেই বাড়ছে। সারাদিন দরজা বন্ধ করে কম্পিউটার ও স্মার্টফোন নিয়ে পড়ে থাকে। যা শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে বাধাগ্রস্থ করছে।

পাড়া-মহল্লায় উঠতি বয়সি শিক্ষার্থীদের আড্ডা ও অনলাইন গেম খেলার দৃশ্য চোখের পড়ার মতো। এসব কর্মকান্ডের মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে কিশোর গ্যাং বা গ্রুপ। শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিল ও খেলাধুলার মাঠ ছেড়ে প্রযুক্তিভিত্তিক অনলাইন গেমসের দিকে ঝুঁকছে। খেলাধুলার আনন্দ খুঁজে ফিরছে মাউসের বাটন টিপে, কম্পিউটারের পর্দায় গেমস খেলে, কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। সারাদিন এমনকি রাত জেগে ইন্টারনেটে খেলছে ফাইটিং ফ্রি ফায়ার ও পাবজির মতো নেশা ধরা গেম। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে স্কুল, কলেজ পড়ুয়ারা মোবাইলে এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছেন, যা মাদকের চেয়ে ভয়ংকর। এই কাজে ছাত্রীরাও পিছিয়ে নেই। কিশোররা ইন্টারনেটে ফ্রি ফায়ার গেম নিয়ে পড়ে আছেন। যাদের বেশির ভাগই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। এসব অনলাইন ভিত্তিক ভিডিও গেমসের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে রঙ-বেরঙের দৃশ্যপট পরিবর্তন, সারাক্ষণ অবিশ্বাস্য গতিতে ছোটাছুটি, জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে থাকা - এসব শিশুদের মানসিকতায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা এবং হাতের নাগালের মধ্যে থাকা ইন্টারনেটের কারণেই এই গেমটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। বর্তমানে এই গেমে অত্যধিক আসক্ত হয়ে পড়ছে শিশু থেকে শুরু করে কিশোর এবং তরুণরাও। সব মিলিয়ে মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় কিশোর-তরুণেরা গেমসে এতটাই মগ্ন থাকছে যে, বাস্তব পৃথিবী ভুলে তারা এক বিপজ্জনক নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। ভিডিও গেমসের এ নিধনযজ্ঞ অনেক বাস্তব অনুভব হচ্ছে তাদের কাছে। শারীরিক মানসিক রোগের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত গেমস খেলা একজন শিশু কিংবা কিশোরের ওপর সামাজিক মূল্যবোধের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। গেমস গুলো যেহেতু একটি জায়গাতেই আটকে থেকে খেলতে হয়, সেহেতু এই গেম খেলা মানুষটি সামাজিকভাবে খুব বেশি সংযুক্ত থাকতে পারে না। আর এই কারণে সামাজিক মূল্যবোধের সাথে সমাজের আচার ব্যবহার থেকেও ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে হয় সেই মানুষটিকে। সর্বোপরি একটা সময় একাকীত্ব বরণ করতে হয় তাদেরকে।

গেমসের কারণে বিশ্বব্যাপী বিবাহ বিচ্ছেদ, চাকরি হারানো, মারমুখী ক্ষ্যাপাটে আচরণ, বাবা-মার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার, অল্পতেই ধৈর্যহারা হয়ে পড়া, ইন্টারনেট না থাকলে অথবা মোবাইল বা কম্পিউটারের চার্জ ফুরিয়ে গেলে অস্থির-আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ার ঘটনা তো অহরহই ঘটছে। সাম্প্রতিককালে ব্লু হোয়েলসহ বিভিন্ন গেম খেলে বহু কম বয়সী শিশু কিশোরের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। নেশা মানেই শুধু মদ বা মাদক নয়। নেশা বা মাদকাসক্তি কেবল মদ-গাঁজা, আফিম-হেরোইন ও বিড়ি-সিগারেটের সেকেলে পরিসরে আবদ্ধ নেই। কালের পরিক্রমায় প্রযুক্তির কল্যাণে এবং পুঁজিবাদী সভ্যতার বদান্যতায় নেশার পতিত অঙ্গনেও লেগেছে ডিজিটালের ছোঁয়া! ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও ধ্বংসাত্মক ভিডিও গেমসে বুঁদ হয়ে থাকার ফলে বিশ্বব্যাপী মানুষ এমন নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে, যা থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন।
অনলাইন গেমসে আসক্তি কমাতে একমাত্র প্রয়োজন সচেতনতা। অনেক সময় অতিরিক্ত সময় ধরে খেলা অনলাইন গেম আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আবার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও অনলাইন গেম সম্পর্কে ঠিকমতো ধারণা না থাকায় অভিভাবকেরাও সন্তানের ঠিকমতো খোঁজখবর রাখতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে তাই সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। নিজের অবসর কাটাতে, সৃজনশীলতা বাড়াতে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে অনেকেই অনলাইন গেম খেলতে ঝুঁকছে। শুধু বাসায় বসে থেকে একা এক নয়, অনলাইনে রীতিমতো অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। অফিসে কাজের ফাঁকে কিংবা অবসরে ফেসবুকে বা অন্য কোনো মাধ্যমে ছোট-বড় অনেককেই গেম খেলে সময় পার করতে দেখা যায়। সন্তানের সবকিছুতে বাধা-নিষেধ জারি করলে তখন সে ভিন্ন পথ খুঁজে বের করে। এখন ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ করলে অনেকেই ভিপিএন ব্যবহার করে বিভিন্ন সাইটে যায়। এসব ক্ষেত্রে শিশুর সঙ্গে ভালো-মন্দ বুঝিয়ে বলার দায়িত্ব অভিভাবকের।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাচ্চারা পড়ালেখা বিমুখ হয়ে পড়েছে। ফলে এই সুযোগে ছাত্রছাত্রীসহ পরিবারের অনেকেই গেমসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। অনেকের আবার বাইরে যেতে না পারায় মেজাজ খিটখিটে হয়েছে। ফলে অভিভাবকরা নিষেধ করলেও তারা মানছে না বরং অবাধ্য হচ্ছে। সন্তান পরিবারের অন্য কোনো সদস্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কি না, সেদিকে বিশেষ লক্ষ রাখতে হবে। কেউ যদি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়, তাকে সঙ্গ দিতে হবে। কোনো গেম সম্পর্কে সন্তানের কৌতূহল থেকে নেশায় পরিণত হতে পারে। পরিবারের সঙ্গে সময় দিয়ে গেম থেকে সন্তানকে দূরে রাখা যেতে পারে। বাচ্চাদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য পড়ালেখা, খেলাধুলাসহ নিয়মমাফিক রুটিন মেনে চলার তাগিদ দেয়া প্রয়োজন।