‘আমার জীবনে আমার লড়াকু ও সংগ্রামী মায়ের গুরুত্ব’

  • 09 May
  • 11:56 PM

জাফর আহমেদ শিমুল, বিশেষ প্রতিবেদক 09 May, 21

আজ ৯ মে রবিবার। প্রতিবছর বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার সারা বিশ্বে এ বিশেষ দিনটি 'মা' দিবস হিসেবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে পালিত হয়। এ দিনটি করোনাহীন পৃথিবীতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালন করা হয়। আমার কাছে এ দিবসটি শুধুই নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। খুবই আবেগ ও উৎফুল্লতায় আবিষ্ট হবার মতো একটি দিন।

এই দিনে বিশ্বব্যাপী আয়োজন করে 'মা' দিবস উদযাপন করা হ‌য়ে থা‌কে। আমার দৃ‌ষ্টি‌তে ব্যাপারটি খুবই ইতিবাচক। প্রতিটি সন্তা‌নের প্রতি মা‌য়ের ভা‌লোবাসা,দা‌য়িত্ব যেমন এক‌দি‌নের নয়, তেম‌নি মা‌য়ের প্রতি সন্তা‌নের ভা‌লোবাসা, দা‌য়িত্বও কখনোই এক‌দিনের নয়। বরং এ‌টি চিরকালীন ও সবসম‌য়ের। ত‌বে আলাদাভা‌বে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে এক‌টি দি‌ন উদযাপন করাটা খারাপ কিছু নয় । কারণ আমরা তরুণ প্রজন্মের যারা আ‌ছি তারা সোশ্যাল মি‌ডিয়ায় অ‌নেক সরব। মাকে সরাসরি কখনোই বলা হয় না; মা 'তোমা‌কে অ‌নেক ভা‌লোবা‌সি'। কিন্তু এই দিন‌টি‌তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট‌্যাটাস দি‌য়ে হ‌লেও এই আ‌বেগ বা অনুভূ‌তিটুকু প্রকাশ ক‌রে থা‌কি। সুতরাং এ‌টি‌কে খুবই ই‌তিবাচকভা‌বেই দে‌খি। আমার কা‌ছে আমার জন্য মায়ের যে ত্যাগ ও সংগ্রাম সেটির জন্য আজ‌কের দিন‌টি সবসময় বে‌শি গুরুত্ব বহন করে।
এবার আসি আমার প্রকৃতি ধার্মিক, সংগ্রামী-ত্যাগী ও হার না মানা লড়াকু মায়ের আমার জীবনে গুরুত্ব বিশ্লেষণে।
যদিও শত শত পাতায় মায়ের অবদান লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। তবুও সচেতন ভাবে মায়ের পায়ে কলমীয় শ্রদ্ধাঞ্জলি দেবার প্রয়াসেই লিখার চেষ্টা করছি।

আমরা দুই ভাই। বাবা একজন পুরোদস্তুর ব্যাবসায়ী। আমদের জন্য বাবার কঠোর পরিশ্রম যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করলেও আমদের দুই ভাইকে ছোট বেলা থেকে সুশিক্ষিত,বিনয়ী,সৎ,বিবেকবান ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড় তুলতে মায়ের ভূমিকা-ই সবচেয়ে বেশি। আমি শিশুকাল থেকেই আমার 'সুপার মম' কে আম্মু বলেই সম্বোধন করি।
আমার আম্মুর কিশোরী বেলায় সেই সপ্তম শ্রেণী পাশ করে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া কালীন সময়েই আমার 'আব্বুজি'র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। অতি অল্প বয়সে বিবাহ হয়েছে; তাই স্বভাবতই সংসার জীবনে অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মখীন হয়েছেন। আমরা দুইভাই ছেলেবেলায় খুবই ডানপিটে স্বভাবের হওয়াতে দু'জনের মাঝে দুরত্ব তৈরী করতেই বড় ভাইয়াকে গ্রাম থেকে শহরে পাঠিয়ে দেন।
আব্বুজি ব্যাবসায়ীক কাজে প্রচুর ব্যস্ত থায়ায় আমার ও আমার ভাইয়ার পড়ালেখার যাবতীয় দেখভাল,পাঠ্যক্রমে এগিয়ে নেওয়া ও শারীরিক ও মানষিকভাবে চাঙা রেখে মনোযোগী শিক্ষার্থী হিসেবে তৈরী করার দায়িত্ব আম্মুই পালন করতেন। আমার আম্মু তাঁর শিক্ষা জীবনে অসম্ভব মেধাবী ও সাংসারিক জীবনে খুবই চৌকষ ও শক্তিশালী ব্যাবস্থাপনাসম্পন্ন ছিলেন।
আমাদের স্কুল জীবন শেষ করে ঢাকা শহরে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা, শিক্ষায় উন্নতিকল্পে গ্রামে থেকেও এক্সট্রা কেয়ারের ব্যাবস্থা আম্মুই করতেন।
কলেজ জীবন শেষ করে দুই ভাইকে আরও দক্ষ শিক্ষার্থী হিসেবে তৈরী করতে 'ব্রিটিশ কাউন্সিল' থেকে 'আইইএলটিএস'
করিয়েছিলেন।
আম্মু সবসময়ই আমাদের সমাজের শক্তিশালী ও সচেতন নাগরিক,অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও এক্সট্রোভার্ট মানুষ হতে বলতেন, তাই আমাদের দুই ভাইকেই সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগে বিশ্ববিদ্যায়ে ভর্তি করান। ভাইয়াকে 'ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ' ও আমাকে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ' এ।

স্নাতক শেষের দিকে আমাদের পরিবার প্রচন্ডরকম ভাবে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয়ে পড়ে। আমার আম্মুর জীবন-সংসার যুদ্ধ তাতেও কোনোভাবেই হার না মেনে আরও বেশি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। আগেই উল্ল্যেখ করেছি আমার লড়াকু আম্মু একজন ভালো গৃহ শিক্ষিকা ও ছিলেন। তাঁর শিক্ষকতার অর্থেই আমাদের দুই ভাইয়ের স্নাতক সম্পন্ন হয়। নইলে পরিবারের এমন অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব হতো না।

স্নাতক শেষে দুই ভাই ও এখন খালাতো ভাই মিলে একটি ব্যাবসা শুরু করি। কিছুদিন ভালোভাবে চললেও ব্যাবসায়ী হিসেবে অনভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ প্রচন্ডরকম ভাবে বিপর্যয়ে পড়ি। এবারও আম্মুর সঠিক নির্দেশনায় কোনোমতে এই বিরাট অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হই। জীবন ছন্দ তাল মিলিয়ে চলতে চলতে আবারও জীবন দূর্যোগ এসে হাজির। শিক্ষাজীবনে ও কর্মজীবন আরও উৎকর্ষ পেতে 
শিক্ষক নিবন্ধন অর্জনের নিমিত্তে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতোকত্তর করার পরামর্শ দেন আম্মু। ততদিনে আমি মূলস্রোতের গণমাধ্যমে বিভিন্ন অসৎ সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক তোপে পড়েছি। যেখান থেকে আবারও পুরনো গতি ফিরে পাওয়া প্রায়ই অসম্ভব।
সেই ভয়ংকর দূর্দিনে আমার লড়াকু জননী ত্রাতা হিসেবে হাজির। একটি ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষকতার পাশাপাশি 'ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি' তে শুরু করি পড়ালেখা। শুরু করি আবারও সেই প্রিয় প্ল্যাটফর্মে (মূল ধারার গণমাধ্যমে) কাজ। আবার এরই মাঝে সমগ্র বিশ্বব্যাপী বিরাট এক প্রাকৃতিক মহা দূর্যোগ এসে সমস্ত স্বপ্ন 
লন্ডভন্ড করে দেয়। একজন ঘনিষ্ঠ ছোট ভাইয়ের সাংগঠনিক সহায়তায় ও শিক্ষকদের সমর্থনে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে গড়ে তুলি 'ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সাংবাদিক সমতি। করোনাকালীন সময়ের আগেই গড়ে তোলা এ প্রতিষ্ঠান অতিমারী করোনাকালীন কোনো ভয়-ভীতি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আম্মুর পরামর্শে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সাংবাদিক ভাই-বোনদের দাপটের সঙ্গে কাজ এগিয়ে নিতে থাকি।পাশাপাশি শুরু করি ফ্রি-ল্যান্সিং জার্নালিজম। মাঝখানের সামাজিক ও পারিবারিক বিপদে বিরতি নেওয়া সময় সহ একজন সংস্কৃতিকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমার যে উৎকর্ষতা অর্জন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হবার যে সম্ভাবনা তৈরী হওয়া সেটিও আমার আম্মুর উৎসাহ,উদ্দীপনা,পরামর্শ ও সঠিক নির্দেশনায়-ই। আমার মাল্টি-টাস্কিং, মাল্টি-স্কিল্ড হতে পর্দার পেছনের কারিগর আমার আম্মু। আব্বুজির সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সাফল্যের স্নিগ্ধ বেলাতেও কোনোদিন আম্মুকে খুবই রঙিন, ও বিলাসী জীবন-যাপনে উৎসুক হতে দেখিনি। ত্যাগী, নিঃঅহংকারী, জ্ঞানী ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন হিসেবে নারী হিসেবেই পেয়েছি সর্বসময়ে। আম্মুর কিশোর বেলাতে 'মা' বনে যাবার সুবাদে খুবই তারুণ্যোদ্দীপ্ত ও উচ্ছল একজন সাংসারিক যোদ্ধা-নারীকে প্রথম শিক্ষিকা হিসেবেব পেয়েছি; তাঁর কাছ থেকে শিখছি, গভীর জ্ঞান ধারণ করবার চেষ্টা করছি, সাংগঠনিক কৌশল, সামাজিকতা,সামাজিক মূল্যবোধ, বিপদে ধৈর্যধারণের ও পূনরায় শক্তি সঞ্চার করে এগিয়ে যাবার দৃঢ় প্রত্যয়,ও সূক্ষ্ম ধ্যানের নির্দেশনা।
আমার শিক্ষা ও কর্ম জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার সকল মন্ত্রে আমার আম্মুর উৎসাহ,অনুপ্রেরণা ও প্রেষণা ও,খুবই কার্যকরভাবে মেধা,মগজ,মননে ও তনুতে সদাসর্বদা একজন 'সুপার মম' হিসেবে উপস্থিত ছিলো,আছে ও ভবিষ্যত জীবনে আমৃত্যু থাকবে বলেই বিশ্বাস রাখি।
মা-ই শিখিয়েছেন,
'Motherhood is the best form of a woman'
তাই মাতৃরূপ সদা সম্মানে,সম্মোহনে ধ্যানে রাখতে।

এই বিশেষ দিন বিশ্ব 'মা' দিবসে আমার 'সুপার মম' (সুফিয়া কাদের)'র প্রতি তাই শত-সহস্র-কোটি লাল সেলাম। অন্তরের অন্তঃস্থল হতে আমার মা সহ বিশ্বের সকল মা জননীর জন্য জানাই অজস্র ও সীমাহীন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।


জাফর আহমেদ শিমুল
লেখকঃ সংস্কৃতিকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মী