অমর সখী

  • 07 Sept
  • 10:04 AM

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 07 Sept, 21

আধুনিকতার এই স্বর্ণযুগে সখী-মিতা এই ডাকগুলো একরকম নিরুদ্দেশ। কবি সাহিত্যিকদের লেখায় বইয়ে পাওয়া যায় মাঝে মধ্যে। সেটাও কালভদ্রে। এখন চলে ফ্রেন্ড, মাম্মা, গাইস সহ আরও নানান অকথ্য সব বন্ধুত্বের সম্বন্ধ।

হ্যাঁ বলছি ৯০ দশকের সখী পাতানো আর আমাদের দেশীয় আঞ্চলিক আদি সংস্কৃতি প্রসঙ্গে।
সময়টা ইংরেজিতে ৮৭ কিংবা ৮৮ সাল হবে। প্রত্যন্ত এক গ্রামের ইউপি সদস্য তহির উদ্দিন। খানদানির একটা অসাধারণ সৌখিনতা লক্ষ্যনীয় ছিলো তার কাজকর্মে। গ্রামের মানুষজনের আস্থা ও প্রিয় ব্যক্তি তহির উদ্দিন মেম্বার। দু'জন স্ত্রী নিয়ে মোটামুটি পরিপাটি সংসার তার। দ্বিতীয় স্ত্রীর মেজো মেয়ে শাহানা। খুব আদুরে। পরীর মতো সুন্দর। সবে পাঁচ বছরে পা দিয়েছে। মেম্বার সাহেব প্রত্যহ নানান কাজে ব্যস্ত থাকায় আদুরে মেয়েকে ঠিকমতো কাছে নিয়ে স্নেহ করার ফুরসত পায় না। এ নিয়ে মেম্বার সাহেব ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিতে ভুগেন।

দাপ্তরিক কাজে একদিন পাশের ইউনিয়নে যেতে হলো মেম্বার সাহেব কে। পথে একটা ছোট্ট মেয়ে খেলছে। হঠাৎ তার মনে হলো তার আদরের দুলালি শাহানা এখানে কিভাবে এসেছে। রিতীমত ভ্যাবাচ্যাকা বনে গেলো বেচেরা মেম্বার। পরে কাছে গিয়ে জানতে পারলো সে শাহানা নয়। তার নাম আলেয়া। আলেয়া আর শাহানা প্রায় একই বয়সের হবে। দেখতে, কথাবার্তায়, আচারনে অনেক মিল শাহানার সাথে। মেম্বার সাহেব ঠিক করলেন তার দুলালির সাথে এই ছোট্ট মেয়েটার বন্ধুত্ব হলে খুব ভালো হবে। তাহলে আলেয়ার আব্বা-আম্মার সাথে আলাপ হওয়া প্রয়োজন। যেই ভাবা সেই কাজ। মোটামুটি আনুষ্ঠানিকভাবে শাহানার সাথে আলেয়ার সখী পাতানোর প্রস্তাব দিলেন তহির সাহেব। আলেয়ার আব্বা-আম্মা এই প্রস্তাবে মৌন সম্মতি জানালেন। দুই পরিবার পরস্পরের সম্পর্কে সবকিছু ভালোভাবে জেনে নিলো। এবার শুধু বাকি রইলো আনুষ্ঠানিকতার মূল পর্ব।

সঙ্গত কারনেই সখী পাতানো বা পরানোর এই অনুষ্ঠান হবে মেম্বার বাড়িতে। তাহা প্রস্তাবিত আলোচনায় সিদ্ধান্ত গৃহীত ছিলো। মহিষ, ছাগল জবাই করা হলো। বিরাট আয়োজন। আমন্ত্রিত দূর-দূরান্ত থেকে আত্নীয় স্বজন আসলো। দুই সখীকে নতুন কাপড়ে সাজানো হলো। অনেকেই ছোট্ট সখীদের দেখে খুশি হয়ে উপহার দেয়। আরও অনেক ঘটনা পর্যায়ক্রমে চলতে থাকে উৎসবের বাড়িতে। এবার খিদে মেটানোর পালা। সবাই খুব আনন্দ আর তৃপ্তি নিয়ে ভুঁড়িভোঁজ করলেন। সবশেষে একজনের হাত অপজনেরজনের হাতে রেখে দুই পরিবার এবং দুই সখী মৃত্যু অব্দি এই প্রাণের বন্ধন অটুট রাখার শপথ করে। মৌলবী সাহেব বিশেষ মোনাজাত করেন। এভাবে শুরু হয় বন্ধুত্বের নতুন এক মাত্রা। যা অকৃত্রিম, অমূল্য।
শাহানা এবং আলেয়া তাদের স্ব-স্ব পিতাকে হারিয়েছে বহু বছর কেটে গেল। কিন্তু তাদের পিতাদের পরানো বাঁধন আজও অটুট রেখেছে তাদের অমর সখীত্ব কে।
গ্রামীণ উৎসবের এই ছোট ছোট আমেজগুলো কালের কড়ালগ্রসে হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে সম্বন্ধের ডাকগুলোও হারিয়ে যাবে আমাদের জিহবা-ঠোঁট থেকে...


-মাসুদ পারভেজ