‘অভাগিনী’

  • 14 Oct
  • 11:09 PM

আব্দুল্লাহ আল মামুন 14 Oct, 20

আমার প্রত্যেকটা বিকেল জানালার কালো গ্রিলের পাশে দাড়িয়ে বাহিরে এলোমেলো দৃষ্টিতে কেটে যায়। আমি ঠায় দাড়িয়ে রই আর ভাবি, এ ব্যস্ত জনপদের কোথাও কি আমার ঠাই হবে না?

সৃষ্টিকর্তার আকাশ তো অনেক বড়! সেই সাথে এই বিশাল পৃথিবী পতিত পড়ে রয়েছে। আচ্ছা এ বিশাল ভূ খন্ডের এমন কোন জায়গা কি বাকি নেই যেখানে আমার দুটি পা স্থির হয়ে দাড়াবে। মাটি স্তুপ আর মহুর্তের ভূকম্পে কেঁপে উঠবেনা। আকাশটা কখনো বেদনা বিধুর কালো মেঘে ছেয়ে থাকবে না।

ফজরের নামাজ পড়ার পর প্রভাতের যে মোলায়েম বাতাশ আর স্নিগ্ধ আলোকছটা ভেসে আসে দূর অজানা থেকে। সে আলোকের অপেক্ষায় আমি সারাটা রাত প্রতিক্ষা করেও প্রভাতের দেখা পাই না। কুসুমের মতো ফিকে হয়ে যাওয়া হলুদ বর্ণের সূর্যটাকে দেখে প্রতিটি সকাল ভাবি আলো আর আধারের সঙ্গমে এবার সহসাই বুঝি ফিরে পাবো মোর অরুণ রাঙ্গা প্রভাত। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর, একসময় সন্ধে নামে। দূরপাল্লার পাখিগুলো গোধূলি বরণ করে ডানা ঝাপটে ফিরে যায় নীড়ে। কিন্তু আমি যে নীড় হারা এক পাখি, ভূতের মতো কালো রাতেও যে মাথাগোঁজা'র ঠাই নেই।

বিকেলের কোমল হাওয়ার স্পর্শে শরীর মন যেই উতালা হতে যাবে ঠিক তখনই হুহু করে জানালা ভেদ করে আসা বায়ু স্মৃতির দরজায় করা নাড়ে। আমায় যেন মনে করিয়ে দেয় সোনালি সে বিকেলের কথা। স্মৃতি যে বড্ড তাড়া করে বেড়ায় ইদানিং।

ওপাশের হলুদ দালানের ছায়াটা দিগুণ হয়ে বেলকুনি ভেদ করে আছড়ে পরতো আঙ্গিনায়। রাশেদের উন্মাদনায় নিরব আঙ্গিনা ভর করতো জগৎএর যতো উল্লাস। ওর খালি পায় মেঝের উপর থপথপ হাটার ধ্বনি সেদিন আমায় অনেক ভালো রাখতো। বাঁচতে শেখাতো আমায়। বেলকুনিতে নিয়ম করে প্রতিদিন ছায়াঘেরা বিকেলে চায়ের আসর দুজনের। জগতের যতো সুখালাপ আছে তা ঠোট ভেদ করে বের করে দেয়া।

আমার হাতের চায়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ রাশেদ। আচ্ছা ও কি সত্যিই আমার প্রশংসা করতো?
আমি নাকি অনেক ভালো চা বানাই, আমার হাতের চা না খেলে নাকি বিকেলটাই মাটি হয়ে যাবে তার।

কি জানি বাবা আমার তো আবার চা খাওয়ার অভ্যেস টব্যেস নেই, কি করে যে ওতো সুন্দর করে চা বানাতাম! জানিনা, সে কি আমার প্রশংসা করার জন্য প্রস্তুত থাকতো সবসময়? হয়তো ভালোবাসাটা ছিলো অনেক গভীর তাই চা যে রকমই হোক আমার প্রশংসা করতেই হবে। আমাকে কষ্ট দিতে চায়নি কখনো মানুষটা।

মানুষের সামনে আমি তেমন কথাটথা বলতাম না। সবাই এজন্য আমাকে ক্ষেপিয়ে তুলবার জন্য "ভিজে বেড়াল" নামক কটু বাক্যে ব্যঙ্গ করতো। আমি অনেক কষ্ট পেতাম, দরজা লাগিয়ে একলা ঘরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতাম। আমিতো জানি আমার মধ্যে কোন কুটিলতা নেই, মা বাবার সহজ সরল অভিমানী ছোট মেয়েটি। তবুও কেন মানুষ আমায় ওরকম খারাপ নামে সম্বোধন করতো তা আজও বুঝতে পারিনি।

রাশেদের সাথে যেদিন বিয়ে হয় সেদিন রাতেই তাকে বলেছিলাম, দেখুন আমাকে আপনি কিন্তু আর যাই বলুন ভিজে বেড়াল বলবেন না, তাহলে কিন্তু আমি অনেক কষ্ট পাবো। রাশেদ সেদিন হো হো করে হেসে বলেছিলো, আচ্ছা ডাকবো না।
উমমম তাহলে অভিমানী বলে ডাকলে আপত্তি আছে? আমি মুখ চেপে হেসে বলেছিলাম, তা নেই।

কি করে যে আমি ওর সাথে অনবরত বকবক করে যেতাম, সেটা ভাবলে নিজেকেই বিশ্বাস করাতে পারি না। নিজেকে প্রশ্ন করে এর উত্তরটা আজও পাইনি। পাবোই বা কি করে, আমি যে অনেক চাপা স্বভাবের মেয়ে, কারো সাথে কথা বলতে পারি না। অন্য কারো সাথে কথা বলতে গেলেই কেমন যেন কথা আটকে আসে।

সেদিন বিকেলে ওকে বেলকুনিতে বসিয়ে রেখে কিচেন থেকে চা নিয়ে এসে ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে ওপাশের চেয়ারে বসে এক নাগাড়ে বকবক করেই যাচ্ছি।

রাশেদ : তোমার যে কি হয় বুঝি না, মানুষের সামনে গেলে তো বোবার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকো।

আমি : তো আমি কি করবো হু ? আপনি আর অন্য মানুষ এক নাকি?

রাশেদ : উরি বাবা! আমার ধারণা তো পুরোটাই ভুল মনে হচ্ছে। এই মেয়ে তো অনেক কথা বলতে পারে। বাচাল।

আমি : বয়েই গেছে, আমি বাচাল হতে যাবো কেন? আপনি শুধু আমাকে রাগান।

রাশেদ : আচ্ছা, তুমি অভিমানী, তুমি বাচাল, আর তুমিই আমার কথা না বলা রাগিনী, সুন্দরী প্রিয়তমা।

আমি : হি হি হি হি হয়েছেগো, চা কিন্তু জমে বরফ হয়ে গেলো হা হা হা।

কোথথেকে যে একদিন হঠাৎ উড়ো চিঠি এলো রাশেদ আর বেঁচে নেই। আমার স্বামী'টা চলেই গেছে আমার উপর অভিমান করে। হয়তো সেদিনই অস্ফুট ভাষায় ভাষায় বলেছিলো, প্রিয় চলে যাবো ওই অজানায়। সেদিন আর হাত বাড়ালেও পাবে না পাশে।

আমি ওর সাথে কথা বলতে খুব হাসতাম। একদিন রাশেদ আমাকে মজাচ্ছলে বলেছিলো, "এত হেসো না বিবি, তখন কিন্তু অভিমানী থেকে অভাগিনী হয়ে যাবা, অতি হাসলে দুঃখ আসে।"

সত্যিইতো এই যে আমার কাপালে নেমে এসেছে আজ দুঃখের কালো মেঘ। আমার শান্তির পায়রাটা আমায় রেখে কতদূর চলে গেছে। আর কোনদিন ফিরে আসবে না।

তোমার দেয়া নামগুলো না আমি অনেক যত্ন করে বুকের মাঝে ধরে রাখবো। যখন খুব অন্ধকারে একলা ঘরে থাকবো তখন তোমার দেয়া ভালোবাসার নামগুলো, অভিমানী, রাগিনী, সুহাসিনী, অসূর্যস্পশ্য, সুকেশিনী, রুপসী কন্যা, মেঘবতী বলে নিজেকে প্রায়ই ডাকি। কিন্তু তোমার মতো করে কেউ ডাকে না।

কিন্তু, হ্যাঁ আজ তোমার দেয়া নামগুলো ছাড়াও অনেকেই কতশত নাম যে দিয়েছে তা শেষ করা যাবে না। কেউ বিধবা বলে, আবার কেউ রাক্ষসী, অলক্ষী।

অনেকেতো সহ্য করতে না পেরে আমায় মুখের ওপর বলেই ফেলে, " ঘরপোড়া, স্বামীকে খেয়েছে এবার মা বাবাকে খেয়ে আমাদেরকে গিলে খাবে।"

আচ্ছা আমি কি আসলেই খুব বেশি খারাপ!...
তোমাকে হারিয়েই কি আজ স্বর্বহারা আমি? তুমি যে ঝিনুকের দহনে দামি মুক্তা। তুমি যে ছিলে আমার সর্বস্ব জুড়ে। আমার অস্তিত্ব, কেন তুমি আমায় একলা পৃথিবীতে রেখে গেলে, সাথে নিতে পারতে না?

পৃথিবীটা আমার কাছে বিষাদময়। পশ্চিমাকাশে আমার সূর্যটা ডুবে গেছে। ভরা শশীর তিমির হরণ করা, কুয়াসা ভেদ করে ইথারে ইথারে আঘাত করবে না অরুণ রাঙ্গা প্রভাত।

তুমি থাকতে তো কেউ আমাকে কটু কথা বলতে পারতো না!.... আমি মুক হয়ে রইতাম আর আমার পক্ষে তোমার প্রতিবাদী কণ্ঠ আঘাত হানতো নিন্দুকের খোলসে। আজ একটাবার কি বলবে না, "লোকসব আমার নিধিটা অনেক ভালো, তাকে তোমরা কটুকথা বোলো না। এই যে আমি তার সাথেই আছি।"

প্রিয়তম আমি যে সবার কাছে কেবল একটা বোঝা মাত্র, আমার মূল্য যে তুমি ছাড়া কেউ দিতে জানে না। তুমি নামক সত্তাটাকে হারিয়ে আজ নিঃস্ব আমি।
পরিবারের কাধে আমি যে ভীষণ এক বোঝা। সমাজের নিকট আমি যে বড়ই কুৎসিত দেখতে। আমায় দেখে যাত্রা করলে অমঙ্গল হয়, আমায় দেখে শুভ কাজে যেতে নেই। সবাই যেন এর দায় এড়াতে চায়। সবাই বাঁচতে চায়। কিন্তু আমাকে নিয়ে কেউ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে চায় না। আমি যে অভাগিনী।

এইতো সেদিন রাতে মা বাবা বলাবলি করছে আমার কি হবে!.....এই মেয়েকে নিয়ে আমরা কি করবো!...কোথায় যাবো?
দুঃখের দিনে যারাই আমার সবথেকে পাশে থাকতো, আজ তারাই আমায় নিয়ে চিন্তিত, দূরে ঠেলে দিলেই যেন বেঁচে যাবে সবাই। নির্মল হবে পৃথিবী, সুখের দোলা লাগবে সমাজের রন্ধ্রে।

প্রিয়তম, আর যাইহোক তোমাকে তো কোনদিন ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। আমি শুধুই তোমার। অনেক ভালো একটা সমন্ধ এসেছিলো নাকি সেদিন। কিন্তু আমি রিজেক্ট করে দিয়েছি, অবশ্য পাত্র পক্ষ আমাকে পছন্দও করেছিলো। মন যে মানে না, আমার অস্তিত্বে তুমি নামক সত্তা।
শুনতে কি পাচ্ছো আমার উড়ো চিঠি প্রিয়তম?