অন্ধকারের এক আলোকশিখা- ফয়জুন্নেছা চৌধুরী

  • 23 Sept
  • 07:56 PM

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 23 Sept, 21

অন্ধকার আর কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন করে যে ক্ষণজন্মা জ্যোতির্ময়ীর আবির্ভাব, তিনি নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী। জ্ঞানে, ব্যক্তিত্বে এক প্রখর আলোকদীপ্তি নিয়ে তিনি যাপন করেছে।

ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে
বর্তমান কুমিল্লা জেলার, লাকসাম উপজেলার অন্তর্গত পশ্চিমগাঁ,(সে সময়ের হোমনাবাদ পরগনা) জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা আহমদ আলী চৌধুরী ছিলেন হোমনাবাদ-পশ্চিমগাঁও-এর জমিদার। পারিবারিক পরিবেশে গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে বাড়িতেই তিনি শিক্ষালাভ করেন। মুসলমানদের কঠিন পর্দাপ্রথার মধ্যে থেকেও ফয়জুন্নেসা আরবি, ফারসি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায়ও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

ফয়জুন্নেসা ছিলেন হোমনাবাদ পরগনার জমিদার। তিনি তার চিন্তা কাজ কর্মে ছিলেন সে সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক। সেকালের সমাজ ব্যবস্থার সবরকম বাঁধা পেরিয়ে তিনি সম্পূর্ণ কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গঠনে মনোযোগ দিয়েছিলেন।
একজন নারী হয়েও সে সময়ে জমিদারির কঠোর দায়িত্ব তিনি সফলভাবে পালন করতে পেরেছেন। তিনি নির্ভীকভাবে শাসনকাজ পরিচালনা করেন।

সমাজ সংস্কার সম্পাদনা:
নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা নবাব। তিনি সমাজ সংস্কারের অংশ হিসেবে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি জোর প্রচেষ্টা করেন। ১৮৭৩ সালে ('বেগম রোকেয়া'র জন্মের সাত বছর পূর্বেই) নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে তিনি মেয়েদের জন্য কুমিল্লায় একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। উপমহাদেশের বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের প্রাচীন স্কুলগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

শিক্ষা প্রচার সম্পাদনা:
দেশে বিদেশে শিক্ষার প্রচারে তার অবদান অনস্বীকার্য। নওয়াব ফয়জুন্নেসা (পশ্চিমগাঁয়ে) একটি অবৈতনিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসার ছাত্রদের অন্য একটি ছাত্রাবাসও ছিল। মাদ্রাসার ভালো ফলাফলে উৎসাহিত হয়ে পরবর্তিকালে তার (ফয়জুন্নেসার) বংশধরগণ ১৯৪৩ খ্রীঃ এটিকে উচ্চ মাধ্যমিক ইসলামিক কলেজে রূপান্তরিত করেন। ১৯৬৫ খ্রীঃ কলেজটি একটি ডিগ্রী কলেজে রূপান্তরিত হয়ে নওয়াব ফয়জুন্নেসা ডিগ্রী কলেজ নামে আখ্যায়িত হয়। ১৯৮২ খ্রীঃ এ কলেজটির সরকারিকরণ হয় এবং নাম হয় নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ। তাছাড়া তিনি আর তার কন্যা বদরুন্নেসা পশ্চিমগাঁওয়ে নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। মেয়েদেরকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য তিনি সব সময় উৎসাহিত করতেন। তিনি মেয়েদের জন্য হোস্টেলের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার জমিদারির আয় থেকে মেয়েদের জন্য নির্মিত এ হোস্টেলের সব খরচ বহন করা হতো। মেয়েদের জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন। তিনি পবিত্র মক্কা শরিফে 'মাদ্রাসা-ই-সওলাতিয়া ও ফোরকানিয়া সহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রচুর পরিমানে সহায়তা করেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তিনি সমস্ত নারীর জন্যই চিন্তা ও কাজ করে গেছেন। জেলার উন্নয়নে কুমিল্লার তদানীন্তন ম্যাজিসেট্রট ডগলাস জমিদারদের কাছে ঋণ চাইলে তিনি তোড়াভরতি টাকা দান হিসাবে প্রেরণ করেন।বিবিধ সম্পাদনা-
শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মেয়েদের স্বাস্থ্য রক্ষা ও সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করেন। ১৮৯৩ সালে কুমিল্লা শহরে প্রতিষ্ঠা করেন 'ফয়জুন্নেসা জানানা হাসপাতাল'। ১৮৯৩ সালে নওয়াব বাড়ির কাছেই তিনি মেয়েদের জন্য একটি স্বতন্ত্র হাসপাতাল নির্মাণ করেছিলেন। তিনি ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অনেকগুলো দাতব্য প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, এতিমখানা এবং সড়ক নিমার্ণ করে তার মানবতাবাদী ও সমাজ সংস্কারের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি নওয়াব বাড়ীর সদর দরজায় একটি দশ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৪ সালে পবিত্র হজ্ব পালন করার সময় তিনি মক্কায় হাজীদের জন্য একটি 'মুসাফিরখানাও প্রতিষ্ঠা করেন। আমাদের এদেশে তখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বিদ্যমান ছিল। নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারী জনহিতকর কাজেও প্রচুর অর্থ দান করতেন।

সাহিত্য সংস্কৃতিতে ফয়জুন্নেসা ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা নবাব ও প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যগ্রন্থ রচনাকারী মুসলিম নারী ঊনিশ শতকে মেয়েদের জুতা পরা নিষেধ ছিল। তারা ঘরের বাইরে বের হতে পারতো না। পড়ালেখা শেখার অধিকার ছিল না। বিশ্বাস হোক বা না হোক, সে সময়ে একজন বাঙালি মুসলিম নারী ‘নওয়াব’ উপাধি পেয়েছে।

শুধু কী উপাধি লাভ! সে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার দেওয়া প্রথম খেতাবের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে। ভিক্টোরিয়া প্রথমে তাঁকে ‘বেগম সাহেবা’ খেতাব দিতে চেয়েছিল। তিনি নেননি। পরে ১৮৮৯ সালে তাঁকে ‘নওয়াব’ উপাধি দেয়া হয়।

রূপজালাল’, ‘তত্ত্ব ও জাতীয়সঙ্গীত, ‘সঙ্গীতসার‘ ও সঙ্গীতলহরী’ এই চারটি ফয়জুন্নেসা রচিত গ্রন্থ। ‘রূপজালাল’ গদ্যে ও পদ্যে মিশ্রিত কাব্যগ্রন্থ। এ ধরণের কাব্যকে চম্পু কাব্য বলে। এতে সে তাঁর বিবাহ ও পরবর্তী বিচ্ছেদের কথা তুলে ধরে। ঢাকা শহরের গিরীশ ছাপাখানা হতে ১৮৭৬ সালে এটি প্রকাশিত হয়। তাঁর ‘তত্ত্ব ও জাতীয়সঙ্গীত’ (১৮৮৭) ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ক কাব্য। ‘সঙ্গীতসার‘ ও ‘সঙ্গীতলহরী’ সংগীতপ্রীতি নিয়ে রচিত গ্রন্থ।

ফয়জুন্নেসা কাজে প্রগতিশীল ছিল, তবে নারীবাদী নয়। সে কঠোর পর্দায় থেকে বাংলা, আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত এ চারটি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করে। ফয়জুন্নেসা স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘সখী-সমিতি’ (১৮৮৬)-এর সদস্য ছিল। স্বর্ণকুমারী দেবী রবীন্দ্রনাথের বোন। তাঁর মেয়ে সরলা দেবী চৌধুরানী (বা সরলা ঘোষাল) বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের বিশিষ্ট বাঙালি বুদ্ধিজীবী।

শেষজীবন:
ফয়জুন্নেছার প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় সবসময় একটা সুশৃঙ্খল নিয়ম নিষ্ঠা বিরাজ করত। তিনি শেষরাতে উঠে ওজু করে নামাজ আদায় করতেন। নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত শেষে আটটায় নাস্তা করতেন। তারপর আটটা থেকে ১১টা পর্যন্ত জমিদারির কাজকর্ম শেষ করে অন্দর মহলের পুকুরে গোসল ও সাঁতার কাটতেন। আহারাদি ও জোহরের নামাজ সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার জমিদারির কাজ করতেন। আছরের নামাজ পড়ে কিছু সময় সাহিত্য সাধন করতেন।

৭০ বছর বয়সে ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর এই মহিয়ষী নারী পরলোক গমন করেন।

১৯ শতকের যে সময় মুসলমান নারীরা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন অবরোধবাসিনী, সে সময় জ্যোতির্ময়ীর মত নবাব ফয়েজুন্নেছার রীতিমত যেন অভ্যুদয় ঘটেছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে এবং কর্মতৎপরতায় পুরুষ শাষিত সমাজের ভীতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন বেশ নিপুণভাবে। একুশ শতকে এ জ্যোতির্ময়ী নারীর কীর্তিকে, ব্যক্তিস্বতন্ত্র্যকে দেখা হচ্ছে বহুমাত্রিক আঙ্গিকে। তাই কালের ধুলির স্পর্শ থেকে আরো বেশি দূরে সরে যাচ্ছেন তিনি। হয়ে উঠছেন জ্বলজ্বলে আলোর ঝর্নাধারা। আমরা সে আলোয় স্নাত হয়ে তার জয়গান গাই। হে জ্যোতির্ময়ী, তোমারি হউক জয়।


লেখকঃ-
কে এম নেছার উদ্দিন
শিক্ষার্থী, বিএএফ শাহিন কলেজ, তেজগাঁও, ঢাকা।