• 16 June
  • 02:39 PM
দাম বাড়ালেই কি কমবে সিগারেটের চাহিদা

16 June, 19

সিগারেটের দাম বাড়ার বিপক্ষে বলে অনেকের অনেক যুক্তি এবং বাক্যবাণ হজম করলাম।যাক,দেশে ধূমপান বিরোধী সচেতনতা তৈরি হচ্ছে।খুবই আশার কথা।

কিন্তু কয়েকটি প্রশ্ন আমার মনে উদয় হয়েছে -

১. যে সিগারেট এক সময় ৩ টাকা এবং ৫ টাকা শলাকা ছিল সেই সিগারেট এখন ১০ টাকা এবং ১৫ টাকা শলাকা হয়েছে।দেশে তখন কার ধূমপায়ীর সংখ্যা কি এখনকার চেয়ে কম?আমি তো দেখি মোড়ে মোড়ে সিগারেটের দোকান।সিগারেটের ব্যবসা দিন দিন লাভজনক হয়ে উঠছে বরং।দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে সিগারেটের ব্যবহার কমানো গেল না কেন?

২. সিগারেট দেশে নিষিদ্ধ নয়।তাহলে কেন ভোক্তাকে হয়রানির মধ্যে ফেলা হচ্ছে?

৩. সিগারেটের দাম বৃদ্ধির ফলে ধূমপায়ীরা নিম্নমানের কমদামী সিগারেটের দিকে ঝুকছে,যা তাদের স্বাস্হ্যের আরো বেশি ক্ষতির কারণ।যারা সিগারেট টানে তারা মরুক - এই কথা কোন দায়িত্বহীন অধূমপায়ী বলতে পারে।কিন্তু রাষ্ট্র যেহেতু সকলের তাই রাষ্ট্র তাদের স্বাহ্য ঝুঁকির ব্যাপারে কি ভাবছে?

এখন আমি এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর আমার নিজস্ব ধারণা এবং জ্ঞানের আলোকে দিচ্ছি।আপনারা ভুল হলে সংশোধন করে দিবেন।

১ নং প্রশ্নের উত্তরঃ

সিগারেটের দাম বাড়িয়ে সিগারেটের উৎপাদন এবং বিক্রয় কমানো সম্ভব নয়।বরং বাড়ানো সম্ভব! কিভাবে সেটা জানতে হলে সামান্য বিজনেস এবং সাইকোলজি মিশ্রিত করতে হবে।

অর্থনীতির চিরন্তন সূত্র হচ্ছে দাম বাড়লে চাহিদা কমে।দাম কমলে চাহিদা বাড়ে।এই চিরন্তন সূত্রে আমার কোন দ্বিমত নেই।কিন্তু একটি বিলাসী পণ্য যখন একজন ভোক্তা অধিক দামে কিনে ভোগ করে তার মধ্যে মানসিক তৃপ্তি বাড়ে।আর সিগারেট হচ্ছে সেই পণ্য যার কাজ হচ্ছে মানসিক তৃপ্তি দেয়া এবং বিলাসিতা,বোল্ডনেস,এ্যারিস্ট্রোক্রেসি,ডমিনেন্স প্রকাশ করা।আর যখন বেশি অর্থ খরচ করে একজন সিগারেট কিনে সে সেই সিগারেট পুঁড়িয়ে এই অনুভূতিগুলো আরো বেশি পায়।তাই দাম বাড়লে সিগারেটের বিক্রয় সাময়িক কমে যেতে পারে কিন্তু আল্টিমেটলি কমে না বরং বাড়ে।সারা বিশ্বব্যাপী একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়।

২ নং প্রশ্নের উত্তরঃ

এই প্রশ্নের উত্তর আমার চেয়ে আইন প্রণেতারা ভালো দিতে পারবেন।তবে সিগারেটের ফিল্টারের মান বাড়ানো,নিকোটিন কমিয়ে পরিমিত করা,একস্ট্রা ফিল্টার প্রমোট না করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সরকারের যতটা না লাভ আছে,তার চেয়ে আমি বেশি লাভ দেখি মধ্যস্বত্বভোগীদের।সরকার যদি প্রতি শলাকা থেকে অতিরিক্ত ২/৩ টাকা করে পেত সিগারেট বিক্রি করে আরো কয়েকটি পদ্মাসেতু করা যেত প্রতি অর্থ বছরে।কিন্তু সরকার ১০-২০ পয়সা অতিরিক্ত পেলেও ভোক্তাকে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত ২/৩ টাকা,যা ভোক্তাদের অধিকার খর্ব করছে।
সরকার অবশ্যই জনস্বার্থের বিষয় বিবেচনা করে দাম বাড়িয়েছে।কিন্তু ধূমপায়ীরাও জনগণ।তাদেরকে তো ব্রাশ ফায়ার করে মেরে ফেলা সম্ভব নয়।তাদের ভোক্তা স্বার্থ যাতে লঙ্ঘন না হয়েও এটাও সরকারের মনিটর করা প্রয়োজন।

৩ নং প্রশ্নের উত্তরঃ

আমার ধারণা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তাবাবুরা কিছু ভাবছেন না।এই অধিক জনসংখ্যার দেশে যত বেশি মানুষ মরবে ততই যেন ভালো!আর প্রতিটা সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে তো লিখেই দেয়া আছে ধূমপান মৃত্যুর কারণ।সুতরাং,আর কোন দায় নেই সরকারের,কোম্পানির,দোকানদারের!

তাহলে সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিলেই ধূমপানে মৃত্যু বন্ধ হয়।কিন্তু এই মৃত্যু ঘটানো সিগারেট থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের স্বপ্ন দেখছে রাষ্ট্র! বাহ্ কি অদ্ভুত দ্বিচারিতা! নাগরিকদের জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার পূর্ণ করা যে কোন রাষ্ট্রের একটি স্বার্থপর আচরণ বলতে আমি বাধ্য হচ্ছি।সরকারের পক্ষে ধূমপানকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা সম্ভব, আবার দাম বাড়ানো সম্ভব যাতে ব্যবহার কমে,আবার রাজস্ব আয় বাড়ানোর চিন্তা করাও কিভাবে সম্ভব! তার মানে কি সরকারও জানে দাম বাড়লেও সিগারেটের চাহিদা কমবে না?এটাকে কি দ্বিচারিতা বললে ভুল হবে?

সিগারেটের দাম বাড়ানোর বিপক্ষে এতগুলো কথা বলার মানে এই না যে আমি ধূমপানের পক্ষে।ধূমপান অবশ্যই ক্ষতিকর। ধূমপান,ক্যান্সার ও মৃত্যুর কারণ এটাও সত্য।ধূমপান কখনোই সমর্থন যোগ্য নয়।বিশেষ করে প্রকাশ্য ধূমপানে প্যাসিভ স্মোকাররা খুবই ক্ষতিগ্রস্হ হয়।প্রকাশ্য ধূমপানের কঠোর শাস্তি এবং বড় জরিমানা হওয়া উচিত।কিন্তু আমার মতামত হচ্ছে দাম বাড়িয়ে ধূমপান কমানো সম্ভব নয়।সরকার যদি সত্যি ধূমপান কমাতে আগ্রহী হয়,দাম না বাড়িয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।

রনো আনোয়ার,
মনোবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।