• 04 Aug
  • 09:21 PM
বিদ্যার খোঁজে বিদ্যাসাগর-এ

রাবি প্রতিনিধি 04 Aug, 19

আমি যখন প্রথম কোনো শহরে যাই, তখন সবার আগে বইয়ের দোকানের খোঁজ করি। এটা আমার বহুদিনের পুরনো অভ্যাস। পড়াশোনা করার তাগিদে রাজশাহী এসে ডেরা বাঁধতে হলো। তাই বইয়ের দোকানের খোঁজ করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়াল। রাজশাহী শহরের মনিচত্বর এলাকায় মূলত বইয়ের দোকানগুলোর অবস্থান। পাশেই রাজশাহীর ঐতহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজ। আমার বিশ্ববিদ্যালয়েও বইয়ের কিছু দোকান রয়েছে। তবে তা একজন পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য যথেষ্ট নয়। মোটামুটি ভর্তি হবার পর থেকেই শহরের বইয়ের দোকানগুলোতে আমার যাতায়াত শুরু হয়। শুধু বই নয়, বিভিন্ন বিষয়ের পত্রিকা সংগ্রহ করার জন্য হলেও আমাকে মনিচত্বরে ফিরে ফিরে যেতে হয়।

এখানে বই কিনে আমি যে খুব একটা শান্তি পাচ্ছিলাম তেমন নয়। কারণ, প্রতিটি দোকানে প্রচণ্ড রকমের ভিড় লেগে থাকে। প্রায় সবগুলো দোকানেই একাডেমিক বইয়ের রমরমা কারবার। কিন্তু আমার তো প্রয়োজন সৃজনশীল এবং মননশীল বইয়ের অফুরন্ত ভাণ্ডার। ফলে মনে মনে এমন একটা জায়গার খোঁজ করেছিলাম, যেখানে গিয়ে ধীরেসুস্থে দেখেশুনে বই কিনতে পারব। তখন পর্যন্ত বিদ্যাসাগর লাইব্রেরির খোঁজ আমার জানা ছিল না। আমার চাহিদার কথা শুনে কোনো একজন বন্ধু বলল, সোজা বিদ্যাসাগর-এ চলে যাও। তোমার যা প্রয়োজন সেখানে গেলেই পাবে।

আমি সুযোগ পেয়ে একদিন বেরিয়ে পড়লাম বিদ্যাসাগর-এর সন্ধানে। মূলত বিদ্যাসাগর লাইব্রেরি মনিচত্বরের মূল দোকানগুলো থেকে একটু দূরে, স্বতন্ত্র চেহারা নিয়ে পাঠক ও ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করে। ফলে নতুন কারো জন্যে দোকানটা খুঁজে বের করা মুশকিল। মনিচত্বরে নেমে বর্ণালী রোডের দিকে খানিকটা এগিয়ে গেলে হাতের বাঁয়ে কাঁচ দিয়ে ঘেরা একটা দোকান চোখে পড়বে, অন্যান্য বইয়ের দোকান থেকে চেহারার দিক দিয়ে একেবারেই আলাদা ; সেটাই হলো বিদ্যাসাগর লাইব্রেরি। লাইব্রেরির কাছে যেতে হলে আপনাকে পেরিয়ে যেতে হবে কয়েকটা বিরিয়ানির দোকান। ফলে তার মৌ মৌ গন্ধ নাকে গিয়ে পেটের ক্ষুধাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। বিদ্যাসাগর লাইব্রেরির বিক্রয় সমন্বয়ক সোহাগ রানা আমাকে শোনালেন একটা মজার ঘটনা। যেখানে এখন বিদ্যাসাগর এর অবস্থান সেখানেও নাকি প্রথমে বিরিয়ানির দোকানের জন্য বন্দোবস্ত হয়েছিল। মনে মনে ভাবলাম, সেটা না হয়ে বরং ভালোই হয়েছে। বিরিয়ানি হয়ত ভোজনরসিকদের সাময়িক চাহিদা মেটাতে পারত, কিন্তু আমার মতো পাঠকের চাহিদা মেটাতে হলে বিদ্যাসাগর এর বিকল্প কী!

বিদ্যাসাগর-এ প্রবেশ করলে সারি সারি সাজানো বই দেখলে প্রথমেই আপনাকে অবাক হয়ে যেতে হবে। ক্রেতারা ভেতরে গিয়ে সহজেই যাতে এই বিশাল ভাণ্ডার থেকে নিজের প্রয়োজনীয় বইটা নিজেই খুঁজে নিতে পারে সে জন্য লেখকের নাম ধরে ধরে আলাদাভাবে বইগুলো বিন্যস্ত করা আছে। একজন ক্রেতা কিংবা পাঠক একবার চোখ বুলিয়ে নিতেই কাঙ্ক্ষিত বইয়ের দেখা পেতে পারেন। সেখানে বসে বই পড়ার জন্য টুলের ব্যবস্থা আছে। সত্যিকারভাবে রাজশাহীর বুকে এমন একটি অভাবনীয় উদ্যোগের প্রশংসা না করে পারা যায় না। আমি যখনই বিদ্যাসাগর-এ প্রবেশ করি তখন দেখতে পাই, কেউ না কেউ বসে বসে বই পড়ছে। দৃশ্যটি আমাকে সীমাহীন তৃপ্তি দেয়। রাজশাহী শহরের বড় বড় মানুষের আনাগোনা বিদ্যাসাগর-এ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, সরকারি আমলা এবং আমার মতো শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল ও মননশীল বই সংগ্রহ করতে পারেন সহজেই।

বিদ্যাসাগর এর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আমজাদ হোসেনের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তাঁকে প্রশ্ন করেছি, রাজশাহীর বুকে এমন একটি বইয়ের দোকানের স্বপ্ন দেখলেন কীভাবে? তিনি জানালেন, এমন একটি পরিকল্পনা বহুদিন থেকেই বুকের ভেতর লালন করতেন। বাজারে গাইড বইয়ের রমরমা বাণিজ্য থাকলেও সৃজনশীল চিন্তার মানুষের আত্মার খোরাক মেটানোর মতো ব্যবস্থা সেখানে নেই। ফলে তিনি ব্যবসায়িক চিন্তার সাথে রুচির এমন সমন্বয় করে দাঁড় করিয়েছেন বিদ্যাসাগর এর মতো একটি প্রতিষ্ঠান। বিদ্যাসাগর-কে বহুদূর নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। রাজশাহী শহরের বহু পাঠক উপকৃত হচ্ছে বিদ্যাসাগর থাকার কারণে। আমি নিজেও প্রচুর উপকৃত হয়েছি এবং হচ্ছি। এমন সুন্দর একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য সত্যিই মোহাম্মদ আমজাদ হোসেনকে সাধুবাদ জানাতে হয়।

লেখক: আরাফাত শাহীন
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।