• 22 Apr
  • 03:50 PM
"রশিদ গাছী"

শারমিন রহমান 22 Apr, 19

গল্পের বাকি অংশ...

এছাড়া আরো কত প্রতিবেশিদের মুখ দেখা যায়। এখানে কোন মানুষজন নাই। ওই প্রতিদিন বাগানের মালিকের লোক আসে রসের ভাগ নিতে, মানুষ বলতে তাদের মুখ ই দেখা যায়। গুড় বেচতে তার বাজারে যেতে হয়না। চরে এসে লোকজন গুড় নিয়ে যায়। দাম ও বেশি। রশিদ মিয়া আজ পর্যন্ত রসে একফোটা চিনিও মিশায় নি। যারা জানে রশিদ মিয়ার গুড়ের সুনাম তারা বাড়ি বয়ে এসে বেশি দাম দিয়েই গুড় নিয়ে যায়।
আাগামী বছর থেকে হয়ত পারবেনা আর গাছ বাইতে। এ বছরই ভয় করছে রশিদ মিয়ার। গাছে উঠতে গেলে বুক কাঁপে। হাত পা ঘেমে যায়,পিচ্ছিল হয়ে ওঠে। গাছ শক্ত করে ধরে রাখা কষ্ট হয়ে যায়।


আহারে বয়স, আহারে সময়। টগবগা জোয়ান পোলা তখন রশিদ। হাট কৃষ্ণপুর গ্রামের তাগড়া জোয়ান। কাবাডি খেলায় চ্যাম্পিয়ন। লাফিয়ে লাফিয়ে চলে যেন।গ্রামের কারো কাঠ কাটতে হবে, ঘর মেরামত করতে হবে, বাজার থেকে কিছু ভারি জিনিস আনাতে হবে ডাক পড়ত রশিদ মিয়ার। রশিদ মিয়ারও ভালো লাগত কাজ করতে। ভাবিরা, চাচিরা রশিদ কে ভালোবাসত খুব। রশিদ যেন সবার আত্মীয়। সেসময়ে মানুষে মানুষে কত মহব্বত ই না ছিল। ভাবিরা রশিদ রে ডেকে নিয়ে হাতে নারকেল ধরিয়ে দিত। রশিদ সে নারকেল ভেঙ্গে,কুরিয়ে দিত। ভাবিরা সে নারকেল কুরানো,চিনি দিয়ে মুড়ি মেখে দিত। বৃষ্টি নামলেই গম,চাল,মুশুড়ি ভেজে রশিদকে খবর দিত।
রশিদ মিয়ার বাপ সোলেমান গাছি, তার গুড়ের সুনাম ছিল খুব। কোন ভেজাল ছিলনা। বাপের আগ্রহেই রশিদ গাছ কাটার কাজটা শিখে নেয়। সেসময়ে গ্রামের প্রায় সবার বাড়িতেই দু চারটা করে খেজুরের গাছ ছিল। সবাই শীত আসার আগেই রশীদের বাপরে ধরত গাছ কাটার জন্য। গ্রামে তখন নুরু গাছি, কলম গাছি,তোয়ব গাছিও ছিল। গ্রামের এত গাছ একা কি কাটা যায়। তবে যারা রশিদের বাপরে দিয়া গাছ কাটাইতে পারত না তারা অন্য গাছির কাছে যাইত। রশিদ তখন মাত্র গাছ কাটা শিখে নিয়েছ। তরতর করে উঠে যেত একেকটা গাছে। কাজ শেষ করে, রসের হাড়ি হাতে আবার তরতর করে নেমে যেত। রশীদের বাবা তখন বয়স আর অসুখের চাপে বিছানা নিয়েছে। গাছ কাটা,রস জ্বাল দেয়া সব করতে হতো রশিদের। তখনই গ্রামের সবাই রশিদের বিয়ের কথা তুলে।
ঃ আরে, বাপ মরবার পড়ছে,বাপরে বউয়ের মুখ দেহাবিনা রশিদ।না বাপ মরলে বিয়া করবি?
রস জ্বাল দেয়ার মানুষের প্রয়োজন বা বাবাকে বউয়ের মুখ দেখানো যে কারনেই রশিদ বিয়ে করুক না কেন, প্রথম দেখাতেই সুফিয়াকে ভালোবেসেছিল রশিদ। কি একটা মায়া,টান তৈরি হয়ে গেল,রশিদ কিছু বোঝার আগেই। এক বাড়ির গাছ কেটেই রস নিয়ে বাড়ি আসে বউয়ের মুখ দেখার জন্য। সুফিয়া হাসে, রশিদ ধরা পড়ে যায়। সুফিয়ার কাছে ধরা পড়ে আরো বেশি করে ভালোবাসে রশিদ তারে।
সোলেমান গাছি একটু সুস্থ হয়েই বেরিয়ে পড়ে গুড় নিয়ে গ্রামে।এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে হেঁটে গুড় বিক্রি করে সোলেমান গাছি,রশিদ গাছ কাটে,রস জ্বালিয়ে গুড় করে সুফিয়াকে সাথে নিয়ে।সোলেমান মিয়া পাশে বসে শিখিয়ে দেয় গুড় বানানোর কৌশল।গুড় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সোলেমান মিয়া, হাঁক দেয়.
"মিডাই লাগব,মিডাই? খেজুরের মিডাই...ঝোলা, পাটালি, আছে দানা পড়া মিডাই।
তারপর সুরে সুরে গেয়ে উঠত,
" আসেন আসেন ভাবি,চাচি,আসেন মিয়া ভাই
কিন্যা নেন ঝোলা, পাটালি
,দানা পড়া খাঁটি মিডাই...
হ ভাই খাঁটি মিডাই।"
সুরের সাথে সাথে চলত টিনের জারে বাড়ি। মানুষ এই সুর শুনেই ছুটে আসত। সুলেমান মিয়ার গুড় যে সেরা। রশিদ বাবার নাম রাখতে পেরেছে....আজ রশিদের গুড়ের সুনামের সাথে বেঁচে আছে তার বাবার সুনামও।


৷ আর মাত্র দুদিন। রশিদ গাছি গুড় করেছে মাত্র পাঁচ কেজি। কিছু করার নেই তার।রস বেশি হয়না। একদিন রস হলে পরের দিন হয় ঝরা। ঝরা হয় ঘোলা,একটু টক। ওই টক ঝরা দিয়ে তো আর পাটালী হয় না।তাছাড়া গাছগুলো অনেক দিনের। কত রস দেবে আর? সবার দেয়ার ক্ষমতাই একসময় শেষ হয়ে যায়। তখন তার দাম ও ফুরোয়। শুধু শুধু তাকে আর কেউ রাখেনা। যেমন সেদিন বাগানের মালিক এসে বলল," রশিদ কাকা, তুমিও বুড়া মানুষ,গাছে উঠতে কষ্ট তোমার। আর গাছ ও বুড়া হয়ে গেছে। এত কম রস হইলে পোষায়? ভাবতেছি আর এক দুই বছর পর গাছ সব কেটে ফেলব। কলার বাগান করব এখানে। "
রশিদ গাছি মনে মনে হাসে, খেজুর গাছ আর তার জীবন একসূত্রে বাঁধা। তারও সময় ফুরিয়ে গেছিলো ছেলেদের কাছে। বাপ গাছি, এটা ছেলেদের শ্বশুরবাড়িতে লজ্জার কারন হয়ে দাঁড়ায়।
গাছ বাইতে না পারলে একসময় তার হাত পা শিরশির করত। কিন্তু আজ তার হাত পা কাঁপে, একটু পর পরই ঘেমে যায়, তখনই মনে হয় গাছ থেকে পড়ে যাবে।দম টেনে তুলতে বড় কষ্ট হয়। সেই সাথে বাপের মত, বংশের মত কাশি তো আছেই। হাঁপানি কয় সবাই। বাজারের দোকানের ধলা ডাক্তারের ওষুধ খায় রশিদ। এর বাইরে কোনদিন কোন ডাক্তারের কাছে যায়নি সে। এই চরে এসে শরীর বেশি খারাপ হয়ে যায়। বাতাস অনেক, ঠান্ডাও পড়ে খুব।কিন্তু না থেকে উপায় কি! রস চুরি হয়ে যায়,তাছাড়া এত ভোরে বাড়ি থেকে এখানে আসা সম্ভব নয়।

জামাল আর কামাল হন্তদন্ত হয়ে যখন চরের খেজুর বাগানে পৌছায় তখন সুফিয়া ঘুপচির ভেতরে হারিকেনে কেরোসিন ঢেলে চিমনি মুছে আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে মাত্র।
ঃ মা,মা, বাইরে আসো।
ছেলেদের দেখে সুফিয়ার বুকের ভেতর তোলপড় করে ওঠে, বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে।এইতো তার সাত মানিক ধন।
ঃ "তোরা কেমন আছস বাজান?"
ঃ তুমরা তো আমাগো ভালো থাকপার দিবানা। ক্যামায় ভালো থাকমু আমরা?
সুফিয়া কোন কথার উত্তর দিতে পারেনা। কেন, কি হয়েছে তাও জানার ক্ষমতা হারায় যেন। ছেলেরা কি বলতে এসেছে আজ? মাতৃত্বের প্রতিদান দিতে এসেছে? সুফিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
"আব্বারে কইও.. বাচ্চু মোড়লরে মিডাই ২০ কেজি দিবার। চেনি লাগলে মিশাবে, হে তো আর দেখবার আসবে না। বিশ্বাস করে হে বাজানরে। যা দেবে তাই বিশ্বাস কইরা নেবে। "
জামালের কথা শেষ হতে না হতেই কামাল বলে ওঠে, " আমি, যে অফিসে পিওনের কামডা হরি,হেইডা বাচ্চু মোড়লের অফিস। আমারে আইসা শাসায়া গেছে, আব্বা মিডাই না দিলে আমারে আর কামে যাইতে না করছে। আমি পোলাপান নিয়া না খাইয়া মরি হেইয়া চায় নি আব্বা?মিডাই দিবার কইয়ো।"
কথা শেষ করেই দুই ভাই বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। ঘুপচি থেকে একটু দূরে খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল রশিদ গাছি। ছেলেদের কথা শুনে আগায় নি সে আর। সুফিয়া আঁচলে মুখ ঢেকে বসে পড়ে। রশিদ গাছি জানে বউ তাকে কি বলবে, মা তো।সন্তানদের চেয়ে তার কাছে আর কিছুই নেই মূল্যবান। কিন্তু রশিদ গাছি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। খেজুর বাগানের মাথার উপর তখন থালার মত চাঁদ হাসছে। রশিদ বালিকাচা বের করে তাতে বালি ছিটায়,ছ্যান বের করে তাতে ধার দিতে থাকে। রাতের নির্জনতা ভেঙ্গে ছ্যান ধারানোর ক্যাচক্যাচ আওয়াজ বাড়তে থাকে।