• 01 Oct
  • 09:48 AM
মানুষ কষ্ট পায় না, কষ্ট তৈরি করে

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 01 Oct, 19

মানুষ কষ্ট তৈরি করে কেন? মানুষ চায় তার মনের মতো করে সবকিছু হোক, সবাই তার ইচ্ছাকে বুঝুক, গুরুত্ব দিক, মেনে নিক। ধ্রুব সত্য এই যে, আপনি যতই মনে করেন আপনার ইচ্ছাই সঠিক। আপনার ইচ্ছা মতো সবকিছু হওয়া উচিত কিন্তু আপনার কথামতো কেউই চলবে বা চলছে না। কারণ আপনার নিয়ন্ত্রণে কেউ নেই, আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে শুধু একজন আর সেটা আপনি নিজে।

বাইরের কোনো ঘটনা আপনাকে কতটা বিচলিত করবে, সে ঘটনা যতটা না দায়ী তার চেয়ে বহু বেশি দায়ী আপনি ও আপনার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বা ঘটনাটি কীভাবে দেখছেন তার ওপর। এই ধরুন-

আপনি একটি অফিসের নির্বাহী কর্মকর্তা। আপনি আপনার ৩ জন অধীনস্থকে অফিসে দেরি করে আসার জন্য ডেকে তিনজনকেই সতর্ক করলেন। আপনি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলেন যে,

★ একজন স্বাভাবিক বা সহজভাবে (বস তো এমনটি বলতেই পারেন) বিষয়টিকে মেনে নিয়ে; স্বাভাবিকভাবে তিনি অফিসের কাজ দায়িত্বের সাথে পালন করতে মনোনিবেশ করলেন।

★ দ্বিতীয় জন মন খারাপ করে বসে রইলেন (আমি তো দেরি করি না, হঠাৎ দুই এক দিনের বেশি তো হয় না কিন্তু আমাকে কেন বললেন, আমাকে অপমান করা হয়েছে)।

★ তৃতীয় জন মহিলা জুনিয়র কর্মকর্তা টিস্যু নিয়ে চোখের অশ্রু মুছলেন। না এখানে কাজ করা যাবে না। আমি তো দেরি করি না এক দিনের জন্য এমন কথা। অন্যখানে চাকরি খুঁজতে হবে (মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন)। ব্যাপারটি কী দাঁড়াল?

ঘটনা একই কিন্তু প্রতিক্রিয়া তিন, অর্থাৎ বস একটি বাক্য সবার জন্যই বললেন, কিন্তু তিনজন তিনভাবে নিলেন। একজন স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করলেন। আর একজন কাজ বন্ধ করে মন খারাপ করে থাকলেন অনেকক্ষণ আর একজন তো চোখের পানি ফেলে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন।

ঘটনাটি অতি স্বাভাবিক এবং সাধারণ অথচ এক একজনের এক এক রকম চিন্তা-চেতনা ধারণ করেন এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকার কারণে দুইজনের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক ছিল।

এ কারণেই মনোবিজ্ঞানীরা বলেন- মানুষ কষ্ট পায় না, কষ্ট তৈরি করে, কে কেমন কষ্ট তৈরি করবে সেটা তার বেড়ে ওঠা পরিবেশ, শিক্ষা, কোয়ালিটি অব ইনফরমেশন, বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে।

মানুষের শরীর ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ বস্তুগত বা শক্ত জিনিস। মানুষ শরীরে আঘাত পায়, ব্যথা পায়, কষ্ট পায়, জ্বালা যন্ত্রণা হয়, কিন্তু মানুষের মন বস্তুগত বা জড় পদার্থ নয়। এটি জ্যোতি, আলো বা ফ্রিকোয়েন্সি একে স্পর্শ করার, আঘাত করার ক্ষমতা কারও নেই। মানুষ শরীরে আঘাত পেতে পারে কিন্তু মনে কখনোই আঘাত পায় না। আঘাত বা কষ্ট তৈরি করে। আবার ধরুন-

স্বামী-স্ত্রী দাম্পত্য কলহের এক পর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীকে (নতুন বিবাহিত) বললেন আমি অফিস থেকে ফিরে যেন তোমাকে না দেখি।

এই একটি নেতিবাচক কথাটিকে স্ত্রী মনের ভেতর বিভিন্ন নেতিবাচক চিন্তা সৃষ্টি করে কষ্ট তৈরি করতে থাকে যেমন-

★ এই বাড়ির সবার সামনে আমাকে নিচু করা হয়েছে।
★ ওরা আমাকে আর মূল্য দেই নি।
★ আমার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এখানে থেকে আর লাভ কী?
★ বাবা মায়ের কাছে গেলে তাদের মন খারাপ হবে, এটি আমার অযোগ্যতা।
★ আত্মীয়-স্বজন জানলে আমার মর্যাদা থাকবে না। সুতরাং বেঁচে থেকে লাভ কী! এসব প্রতিটি চিন্তা তার নিজের তৈরি করা। You are the creator of your own thought.

নিজে কষ্ট তৈরি করতে করতে এত কষ্টই তৈরি করে যে গলার দড়ির কষ্টকেও কম কষ্ট মনে হয়। মানুষ কষ্ট পায় না, কষ্ট তৈরি করে। অথচ তাকে শুধু একটি বাক্যই বলা হয়েছে (তাও রাগের মাথায়)। অথচ বাকি সমস্ত কথাই তার কল্পনাপ্রসূত এবং নিজের বানানো কষ্ট।

গবেষকরা বলেন, মানুষ কোনো একটি ঘটনাকে নেতিবাচক চিন্তা করতে করতে পাহাড়সমান কষ্ট তৈরি করে ফেলে যে সকল চিন্তা তৈরি করে তার মধ্যে বেশিরভাগ চিন্তাই কিন্তু বাস্তবে ঘটতো না বা ঘটে না। পৃথিবীতে যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে তা এই কষ্ট তৈরি করে। কষ্টের পাহাড় তৈরি করে। কষ্টের পাহাড় থেকে লাফ দেয় অথচ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষ তার জীবনকে সফল ও আনন্দময় করতে পারে। কারও জন্য কিছু আটকে থাকে না। হলে ভালো, না হলে অল্টারনেটিভ। You can do what you need to do.

মানুষের নিয়ন্ত্রণে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি থাকে তা হলো আপনি নিজে, আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই দেখবেন সবকিছু যেন নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে। আপনার পা দুটিকে ধুলার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আপনি পৃথিবীটাকে চামড়া দিয়ে ঢেকে দিতে পারবেন না। কিন্তু আপনার নিজের ছোট পা দুটিকে চামড়া দিয়ে ঢেকে দিতে পারলেই পৃথিবীটা ঢাকা হয়ে যায়। সুতরাং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন। দেখবেন সবকিছুই যেন ঠিক মনে হচ্ছে।

পৃথিবীতে যত মানুষ রোগে মারা যায় তার মধ্যে শীর্ষ দশ রোগের মধ্যে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, ক্যান্সার প্রভৃতি। এই সকল রোগের ৭৫ ভাগ কারণ নিরানন্দ, অর্থাৎ আনন্দবোধ না করা। দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা, মানসিক চাপ, রাগ প্রভৃতি এবং সকল নেগেটিভ সাইকিক ইমপ্রেশন নির্ভর করে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর অর্থাৎ আপনার চিন্তার ওপর।

আপনার দাম্পত্য জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্রের সফলতা, ব্যবসার উন্নতি, মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ে সফলতা, সফল নেতৃত্ব এবং জনপ্রিয়তা নির্ভর করে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে আপনি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন তার ওপর। ঠান্ডা মাথায়, ধৈর্যের সাথে বিবেচনা ও মূল্যবোধের সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারাকেই বলে প্রোঅ্যাক্টিভ বা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

যার যেমন দৃষ্টিভঙ্গি। যার যেমন চিন্তা-চেতনা সে তেমনই বলবে। সে আপনাকে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে তার বক্তব্য বা সমালোচনা করবে। তাতে আপনার মনে কৌতুক বোধ আসতে পারে। শেখার অনেক কিছুই থাকতে পারে কিন্তু রাগ করা বা মনে কষ্ট তৈরি করা সত্যিই বোকামি; আপনি যদি এক ঘণ্টা মন খারাপ করে থাকেন তবে ওই এক ঘণ্টা আপনার জীবনের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। যা কোটি টাকার চেয়ে ক্ষতিকর। Happiness is not Destination, Happiness is Journey.

আপনি যদি সকালে উঠেই মনে করতে পারেন যে আজকের দিনটি আমার জন্য সেরা দিন, সুখের দিন তাহলে কালও হবে আজ, ফলে প্রতিদিনই হবে সুখের, খুশি চাওয়ার বিষয় নয় থাকার বিষয়। সুতরাং আর মনে কষ্ট তৈরি করা নয়। যে কোনো বিষয়কে আবেগ দিয়ে নয় বিবেক দিয়ে, বিবেচনাবোধ দিয়ে বিশ্লেষণ করা। মানুষ সৃষ্টির সেরা। মানুষ সেরাভাবে সবকিছুকে দেখবে শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেবে। সেরা এবং সুন্দর আচরণ করবে সেটাই স্বাভাবিক।

লেখকঃ
ওয়ায়েছ আহমেদ আরিফ,
মনোবিজ্ঞান বিভাগ (৪র্থ বর্ষ),
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়