• 12 Aug
  • 09:38 PM
হুমায়ুন আজাদের কবিতা ও সাহিত্যপাঠ স্মরণে

সোহানুজ্জামান,লেখক পরিচিতি: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক লেকচারার, বাংলা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় 12 Aug, 19




“আজাদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একাডেমিক কোনো কোনো দিকের যেমন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা ছিলেন, তেমনি নন-একাডেমিক ক্ষেত্রেও তাঁর বিপুল পদচারণা ছিল। একদিকে যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নির্মাণ-পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন এই সাহিত্যের নতুন অগ্রদূত, তেমনি হয়ে উঠেছিলেন সাহসী চিন্তার অভিনব অগ্রপথিক।”

হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪) এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রথাগত মাস্টার’হয়েও ‘প্রথাগত মাস্টার’হন নি; নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উৎরে গেছেন এই তকমাকে। একজন প্রথাগত মাস্টার হয়েও লেখালেখি ও স্বকীয় ভাবনার সূত্রে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র জগত নির্মাণ করে নিয়েছিলেন। প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টাররা যেরকম দুর্বল ও বাঁকা মেরুদণ্ডের অধিকারী হন, আজাদ তেমনটা ছিলেন না। এই বিষয়টি জানা যায় তাঁর ব্যক্তিজীবনের নানা কর্মকাণ্ডের সুবাদে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনাতে এমন শিক্ষক দু’ চারজনই পাওয়া যায়; আজাদ ছিলেন তাঁদের প্রধানতম, নানাদিক থেকে বিবেচনায়। আজাদ প্রতিভাবান ছিলেন। একাডেমিভাবে তিনি যেমন ছিলেন দুর্দান্ত; ঠিক তেমনি একাডেমির বাইরেও ছিলেন বেশ স্বপ্রতিভ; জ্ঞানচর্চার নানা দিক থেকে। বলে রাখা জরুরি, আজাদের এসব ভাবনার নানা উৎসারণ আমরা দেখতে পাই তাঁর কাজকর্মের মধ্যে। মনে রাখা দরকার, আজাদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একাডেমিক কোনো কোনো দিকের যেমন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা ছিলেন, তেমনি নন-একাডেমিক ক্ষেত্রেও তাঁর বিপুল পদচারণা ছিল। একদিকে যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নির্মাণ-পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন এই সাহিত্যের নতুন অগ্রদূত, তেমনি হয়ে উঠেছিলেন সাহসী চিন্তার অভিনব অগ্রপথিক।

প্রথম থেকেই আজাদ নিজেকে প্রগতিশীল দাবি করে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আবির্ভূত হন। এই ব্যাপারটা ঠিক কবে কোথায় এবং কীভাবে ঘটতে শুরু করেছিল, দিন-তারিখ ধরে তা বলা কঠিন। ব্যাপারটা গভীর গবেষণার বিষয়। তবে মোটাদাগে বললে, স্বাধীনতার আগে শুরু হওয়া তাঁর লেখকজীবন স্বাধীনতা পরবর্তী প্রায় পঞ্চাশ বছরের অধিককাল দীর্ঘস্থায়ী ছিল। এই সময়ে তিনি সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বের চর্চা করে গেছেন। প্রথম দিকে বুদ্ধদেব বসুদের মতো আধুনিকতাবাদী সাহিত্যাদর্শে নিম্মজিত থেকে সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চায় অবতীর্ণ হলেও, পরবর্তীকালে নানা পারিপার্শ্বিক চাপের মধ্য আধুনিকতাবাদী নন্দনতত্ত্ব থেকে সরে আসেন। বলে রাখা দরকার, আজাদ ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, যার মূলে ছিল ভাষাআন্দোলনের বিপুল প্রভাব, তার দ্বারা আলোড়িত হয়েছিলেন।

জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চূড়ান্ত ফলাফল স্বাধীনতাযুদ্ধের নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সমানভাবে ক্রিয়াশীল ছিল আজাদের মধ্যে, শেষদিন পর্যন্ত। আর তারই প্রভাবে বদলে যেতে থাকেন আজাদ। আধুনিকতাবাদী নন্দনতত্ত্বের বাইরে এসে তিনি এক ভিন্ন মানসে সাহিত্য ও ভাষাচর্চায় নিয়োজিত হয়েছিলেন। এর ফলেই হয়তো-বা আজাদ হয়ে উঠেছিলেন সম্পূর্ণ নতুন একজন লেখক। চিহ্নিত হয়েছিলেন প্রগতিশীল বলে। কারণ আজাদের লেখা তখন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে, এটা বলছি যুদ্ধের পরের কথা। দৈনিক থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের পত্রপত্রিকায় লিখে আজাদ পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করেন। তবে এটা যে বাঙালি নতুন দেখলো তা নয়, আগেও দেখেছে, কিন্তু আজাদের হঠাৎ এমন রাজসিক প্রগতিপন্থী আগমনে দেশ বেশ সচকিত হয়ে ওঠে। সেটা একদিক থেকে একটা আন্দোলনই ছিল বলা চলে, আজাদ তাঁর চিন্তা দিয়ে প্রভাবিত করেছিলেন অনেককেই; এখনো প্রভাবিত হচ্ছেন অনেকে।
আধুনিকতাবাদী কবিতার একটি মূল প্রসঙ্গ ব্যক্তিসর্বস্বতা বা ব্যক্তিনির্ভরতা। যেহেতু আধুনিকতার সূচনায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের একটা বড় ভূমিকা ছিল। ফলে, আধুনিকতাবাদী সাহিত্যাদর্শ আধুনিক আমলের ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়কে সবচেয়ে বেশি প্রধান্য দেয়। কিন্তু, সেই ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত আদর্শের সাথে কি আজাদের প্রগতিশীল সাহিত্যাদর্শের কোনো মিল পাওয়া যাবে? প্রগতিশীলতা তো কোনো ব্যক্তিক বিষয় নয়, সামষ্টিক চিন্তার বৃহৎ ফলাফল একত্রিত না হলে তো তা প্রগতিশীল হয়ে ওঠে না। দু’একটি কবিতা বাদ দিলে আজাদের সমগ্র কবিতাই গাসেৎপন্থী ভাবাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে হয়।

আজাদের কাব্যগ্রন্থ জ্বলো চিতাবাঘ প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে। এই কাব্যে আধুনিকতাবাদের প্রাধান্য দেখা গেছে ‘নিসর্গ-নির্মাণ-প্রকল্প’ কবিতায়। এই কবিতাতেই চোখে পড়বে রঙের ব্যবহারে ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে তোলার চমৎকার প্রচেষ্টা। তবে সেই প্রচেষ্টা ইন্দ্রিয়কে ছাপিয়ে আর এগোতে পারেনি। কিন্তু এগোনো দরকার ছিল আজদের; প্রগতিশীল মনোভঙ্গি আর আদর্শকে প্রকাশের জন্য। যেমন আজাদ বলছেন, ‘রক্তলাল হৃৎপিণ্ড হলদে ক্ষিপ্র মৃত্যুপ্রাণ বুলেট প্রবেশ;/ অগ্নুৎপাতমগ্ন দ্বীপ, চিতার থাবায় গাঁথা ব্যাধ ও হরিণ।’ এই কবিতা, আমি যা বলতে চাইছি তার সঙ্গে মিলে যায়। কেউ কেউ বলবেন. কবিতা তো ভিন্ন সাহিত্য-মাধ্যম, অন্যান্য সাহিত্য-মাধ্যম থেকে আলাদা। মানছি একথা। কিন্তু তার পরেও দেখতে পাচ্ছি, প্রগতিশীল সাহিত্যাদর্শ থেকে আজাদ সরে এসেছেন ভাববাদী রোমান্টিকতায়। বলা বাহুল্য, রোমান্টিকতাও একসময় প্রগতিবাদী চিন্তা হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। বিপ্লবীরাও এক অর্থে রোমান্টিক। রোমান্টিক ভাববাদ তাই কবিতায় থাকতে পারে, কিন্তু তাতে ব্যক্তিরই প্রাধান্য, এমনকি ব্যক্তিসর্বস্বতাই প্রধান হয়ে ওঠে। আধুনিক সমাজ ও ব্যক্তিমানসের অবক্ষয়, নৈঃসঙ্গ্য, একাকীত্ব, বিষাদ, অপ্রাপ্তির হাহাকার, যৌনতা আর প্রেমিক বা প্রেমাস্পদের জন্য তীব্র আর্তি- এসবই আধুনিকতার লক্ষণ। এই কবিতা ততটাই প্রগতিশীল যতটা ব্যক্তিক। সামষ্টিক উত্তরণের কথা এতে স্থান পায় না। হুমায়ুন আজাদও লিখেছেন ঠিক এই ধরনের কবিতা।

তবে প্রগতির কথা না থাকলেও এসব কবিতায় ভীষণ সুন্দর সুন্দর চিত্রকল্প তৈরি করেছেন আজাদ। অনেকটা পরাবাস্তববাদী প্রক্রিয়ায় নির্মিত বেশকিছু চিত্রকল্প আমাদের ইন্দ্রিয়ের অনুভবকে তীব্র করে তোলে। কিন্তু আজাদের প্রধানতম সাহিত্যাদর্শ ‘প্রগতিশীলতা’কে তা নাকচ করে দেয়। মুত্যুবোধ আর ব্যক্তিক যন্ত্রণাবোধের যুগপৎ সম্মিলন ঘটেছে জ্বলো চিতাবাঘের ‘পোশাকপরিচ্ছদ’, ‘প্রেমিকার মৃত্যুতে’, ‘পাড়াপ্রতিবেশী’ শীর্ষক নানা কবিতায়। এই ব্যক্তিক দুঃখবোধ এবং মৃত্যুচেতনা, এবং যার উদ্ভব ঘটেছে সামষ্টিক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক চাপে, তা থেকে বাঁচতেই বোদলেয়ারেরা হেঁটেছেন নিসর্গের দিকে। এরকম সবুজ বনানী প্রান্তরের কথা আছে ফেদরিকো গার্সিয়া লোরকার কবিতাতেও। কিন্তু তাঁরা দুজনেই আধুনিকতাবাদী কবি এবং এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কবি। কিন্তু বোদলেয়ার ও লোরকার নিসর্গ দেখার চোখ দিয়ে নিসর্গকে দেখার ফলে আজাদের কবিতা অনেকটাই ওই দুই কবির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছে; যে প্রগতিশীল ভাবনার জন্যে তিনি গদ্য লিখে সমাদৃত হয়েছেন, সেই প্রগতিচিন্তার কথা তাঁর কবিতায় সেইভাবে আসেনি। কবিতায় আসলে তিনি দুর্মর এক প্রেমিক, ভাবালু, আবেগাক্রান্ত। এসব দিক থেকে তাঁর কবিতাকে অবশ্যই সার্থক বলতে হবে। ফলে কবিতায় আজাদ তাঁর মূল প্রগতিশীল ভাবনা থেকে সরে গিয়ে বিচ্ছিন্নতার চর্চা করেছেন।

বোদলোয়ার তাঁর ক্লেদজ কুসুমকে যে সাহিত্যাদর্শ নিয়ে কবিতা করে তুলেছেন, ঠিক সেইভাবে তাঁর অন্তরঙ্গ ডায়েরিতেও একই সাহিত্যাদর্শ নিয়ে লিখেছেন ছোট ছোট প্রবন্ধ। কিন্তু আজাদ এই ব্যাপারটা রক্ষা করতে পারেন নি। মাঝে মাঝে আজাদের কবিতা পাঠ করলে তীব্রভাবে কীটসের কবিতার স্বাদ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, আজাদের কবিতা রোমান্টিকদের কবিতার মতোই রোমান্টিক হয়ে উঠেছিল। তাঁর কবিতা থেকে উদাহরণ দেই : ধ’সে পড়েছে অজেয় পর্বত, সূর্য ছুটে এসে ভেঙে পড়ছে/ আমার তরল মাংসে, আগুন জ্বলছে, অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ছে,/ যেখানে পাখির ডাক নেই, নেই এক ফোঁটা তুচ্ছ শিশির।/ অনেক অভিজ্ঞ আমি, মৃতদের সমান অভিজ্ঞ। এই প্রসঙ্গটা আরো বেশি স্পষ্ট হয় স্থানিকতার কথা উল্লেখ করলে। রবার্ট ফ্রস্ট তাঁর কবিতায় আমেরিকার মিড-ইংল্যান্ডকে এনেছেন। বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো এনেছেন প্যারি-ফ্রান্সকে। হিমেনেথ, লোরকা এনেছেন স্পেনের আন্দালুসিয়াকে। কিন্তু এঁরা কেউই এই সমস্ত স্থানকে শুধুমাত্র নস্টালজিক করে রাখেননি। কিন্তু আজাদ তাঁর জন্মস্থান রাঢ়িখালকে এনেছেন নিছকই নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে, যা রোমান্টিক কবিতারই ভাবাদর্শ বলা যায়।

প্রথাগত আধুনিকতাবাদীদের প্রকরণের সঙ্গেও ঠিকঠাক মিলে যায় আজাদের কবিতা। স্তবকবিন্যাস, ছন্দ নির্মাণে আজাদের কবিতায় তেমন বিশেষ কোনো বৈচিত্র্য চোখে পড়ে না। তবে চমক এনেছেন অন্য জায়গায়, কৈশোরক কবিতায়- কী বিষয়বৈচিত্রে, কী গীতিধর্মী ছন্দে, কী ভাবাবেগের দিক থেকে।

শেষ আলাপ, অর্থাৎ এই লেখাটা শেষ করি এই বলে যে, কে কেমন কবিতা লিখবেন সেটা তাঁর একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। প্রত্যেক লেখকেরই ব্যক্তিগত সাহিত্যাদর্শ থাকে। হুমায়ুন আজাদেরও আছ