• 03 July
  • 07:04 PM
৪৯তম নোবেল জয়ী মার্কিন সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের আত্মা হনন (১ম পর্ব)

মোঃ ইকবাল হোসেন,বশেমুরবিপ্রবি 03 July, 19

২রা জুলাই আত্মহত্যা করেছিলেন মার্কিন ফিকশনকর্মী লেখক, সাংবাদিক এবং ৪৯তম নোবেল জয়ী শক্তিশালী সাহিত্যিক আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে (জুলাই ২১, ১৮৯৯ -জুলাই ২, ১৯৬১)।

“মানুষ কখনোই পরাজয় বরন করে না, প্রয়োজনে লড়াই করতে করতে ধ্বংস হয়ে যায়”– বিখ্যাত এই উক্তিটি বিংশ শতাব্দীর ১মার্ধের মার্কিন সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বিখ্যাত কালজয়ী উপন্যাস “দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড সী ” (The Old Man and The Sea) (১৯৫২) তে জীবন যুদ্ধে সংগ্রামশীল মানুষের চিত্র রূপায়ন করতে অবতারণা করেছিলেন। কিন্তু সেই অদম্য শক্তিমাল লেখক মাত্র ৬১ বছর বয়সে আত্মহত্যা করে পরকালে পাড়ি দেন।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সমগ্র জীবন কেটেছে কিঞ্চিত উচ্ছ্বাস আর অধিকাংশ সময়ে গভীর বিষণœতার মধ্য দিয়ে। শিকার করা ছিল তাঁর বড় শখ। কেউ বিশ্বাস করতে পারিনি সেই শিকার করা বন্দুক হবে তাঁর জীবন প্রদীপ নিভানোর মরণাস্ত্র। ৬২ বছর পূর্ণ হওয়ার মাত্র ১৯ দিনে আগে ১৯৬১ সালের ২রা জুলাই নিজের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে আত্ম হননের পথ বেচে নেন এই বিখ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের কালজয়ী লেখক।

জন্ম পরিচয় :

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর ইলিনয়ের, ওক পার্কে ১৮৯৯ সালের ২১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা পেশায় ছিলেন ডাক্তার আর মা সঙ্গীত শিল্পী। তাঁর নানার নামানুসারে হেমিংওয়ের নামকরণ করা হয়। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তিনি নামটি পছন্দ করতেন না। কারণ, “The Importance of Being Ernest” নাটকের প্রধান চরিত্র, আর্নেস্ট ছিল বোকা ও সহজ-সরল। আর্নেস্ট মায়ের অনুপ্রেরণাতে সেলো বাজানো শিখেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁর খুব বেশি চর্চা তিনি করতে পারেন নি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, গান শেখার কারণেই “ফর হোম দি বেল টোলস” (For Whom The Bell Tolls) (১৯৪০) রচনায় তিনি বেশ উৎসাহ পেয়েছিলেন।


প্রাথমিক শিক্ষা ও বাল্যকাল :

তিনি ১৯১৩ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ওক পার্ক এন্ড রিভার ফরেস্ট হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন বিভিন্ন খেলাধুলায়। এখানে পড়ার সময়েই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠেন। স্কুলে থাকতেই জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকতায়। যা পরবর্তীতে তাঁর লেখক জীবনের ভীত গড়ে দিয়েছিল। ট্রাপেজি এন্ড টাবুলা (Trapeze and Tabula) ম্যাগাজিনে খেলাধুলা নিয়ে নিয়মিত লিখতেন তিনি। স্কুল জীবন শেষে যুক্ত হন “দি ক্যানসাস সিটি স্টার” পত্রিকায়। লেখক জীবনে সাংবাদিকতার প্রভাব নিয়ে হেমিংওয়ে বলেছিলেন,

’’On the Star you were forced to learn to write a simple declarative sentence. This is useful to anyone. Newspaper work will not harm a young writer and could help him if he gets out of it in time.” (স্টারে আপনাকে সহজ ঘোষণামূলক বাক্য লিখতে বাধ্য করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই যে কেউ দরকারী। সংবাদপত্রের কাজটি একজন তরুণ লেখকের ক্ষতি করবে না এবং সে সময় থেকে বের হয়ে গেলে তাকে সাহায্য করতে পারে।)



সাহিত্য জীবনের সূচনা:

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ১৯১৮ সালে আমেরিকায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। হেমিংওয়ে সাংবাদিকতায় ব্যস্ত, হঠাৎ রেড ক্রসের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান ইতালির মিলানে শহরে। একজন এম্বুলেন্স চালক হিসেবে শুরু করলেন মানবতার সেবা। যুদ্ধরত অবস্থায় ইতালির এক সৈন্য মারাত্মকভাবে আহত হন, হেমিংওয়ে দ্রুত ছুটে গেলেন, তাকে এম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মর্টারের আঘাতে মারাত্মকভাবে আঘাত প্রাপ্ত হন হেমিংওয়ে। তাঁর এই সাহসিকতার জন্য ইতালির সরকার তাঁকে “ইতালিয়ান সিলভার মেডেল অব ব্রেভারী” তে ভূষিত করেন।

ইতালির সেই স্মৃতি স্মরণ করে হেমিংওয়ে বলেছিলেন, “যখন বালক হিসেবে যুদ্ধে যাও তখন অমরত্ব লাভের জন্য একটা মোহ কাজ করে। অন্য যোদ্ধারা মারা যাবে, আমি মরবো না। এমন মনোভাব থাকে। কিন্তু যখনই প্রথম বারের মত মারাত্মকভাবে আহত হবে তখনই সেই মোহ কেটে যাবে এবং ভাবতে শুরু করবে, আমিও মরে যেতে পারি”।

আহত হয়ে হেমিংওয়ে যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিল তখন তাঁর সেবায় নিয়োজিত ছিল রেড ক্রসের নার্স এগনেস ভন কোরস্কি (Agnes von Kurowsky) । রেড ক্রসে থাকাকালীন সময়েই তিনি অ্যাগণেস ভন কুরোভস্কির প্রেমে পড়েন, এগনেস রেড ক্রসের একজন নার্স ছিলেন এবং বয়সে হেমিংওয়ের চেয়ে ৭ বছরের বড় ছিলেন। হেমিংওয়ে তাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেন। দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন আমেরিকায় গিয়ে বিয়ে করবেন তাঁরা। সুস্থ হয়ে জানুয়ারিতে আমেরিকায় ফিরে গেলেন হেমিংওয়ে, অপেক্ষা করতে থাকেন এগনেসের জন্য। কিন্তু এগনেস এলেন না। হঠাৎ একটি বার্তা এলো, এগনেস হেমিংওয়ের প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এগনেস ইতালির এক সরকারি কর্মকর্তাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে প্রেমে প্রত্যাখ্যান হয়ে মানসিকভাবে প্রচন্ড ভেঙ্গে পড়েন হেমিংওয়ে।


বিবাহ ও ফ্রান্সে গমন:

তিনি লেখনীর পাশাপাশি সাংবাদিকতাকে পরিপূর্ণ পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেন। “টরেন্টো স্টার” নামক পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিলেন। ১৯২১ সালে তিনি এলিজাবেথ হ্যাডলি রিচার্ডসনকে বিয়ে করলেন। তাদের মধ্যে অল্প কিছু দিনের প্রেম ছিল। পরে দু’জন সরাসরি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। শুরু করলেন নতুন সংসার। হঠাৎ টরেন্টো পত্রিকা তাঁকে ফ্রান্সে প্রেরণ করলেন। হেমিংওয়ে প্যারিস শহরে স্থানান্তরিত হলেন। প্যারিস শহরেই জীবনের নানা রূপ দেখতে শুরু করেন হেমিংওয়ে। ১৯২৩ সালে প্যারিস থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম স্বরচিত বই Three Stories and Ten Poems । এ বছরই হেমিংওয়ে-হ্যাডলি দম্পতির প্রথম সন্তান জন জন্মগ্রহণ করে। সন্তানকে দেখতে হেমিংওয়ে টরেন্টোতে চলে যান। এ সময় তিনি সংসার জীবন নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে সংসারের দায়িত্ব পালন করতে তিনি সাংবাদিকতা থেকে ফিরে আসেন।

উপন্যাসের জগতে তাঁর প্রবেশ ঘটে In Our Time (১৯২৫) নামক ছোট গল্পের বই লিখে। প্যারিসে এসেই তাঁর পরিচয় ঘটে স্কট ফিটজেরাল্ড, জেমস জয়েস, পাবলো পিকাসো, এজরা পাউন্ডের মতো বিখ্যাত লেখকদের সাথে। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস, The Sun Also Rises|