• 20 Sept
  • 11:11 PM
ঢাবি উপাচার্যের এক চেয়ারের দাম ৫০ হাজার টাকা

ভার্সিটি ভয়েস ডেস্ক 20 Sept, 19

আপনি জানেন কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তার বাসভবনে নিজে বসার জন্য দুটি চেয়ার ব্যবহার করেন, যার একেকটির মূল্য ৫০ হাজার টাকা?

ভিসির বাসভবনের মূল সভাকক্ষ একটি বৃহৎ টেবিলসহ ৩৮টি চেয়ার দিয়ে সাজানো হয়েছে। এসব চেয়ারের জন্য মোট ১৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, যেখানে প্রতিটি চেয়ারের দাম ধরা হয়েছে ৩৮ হাজার টাকা। আর প্রধান মিটিং টেবিলের জন্য ব্যয় ধরা করা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

শুধু চেয়ারই নয়। বাসভবনের লাউঞ্জের জন্য সতেরটি ডবল সিটার সোফা কেনা হয়েছে ১০ লাখ ৫৪ হাজার টাকায়। যার প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৬২ হাজার টাকা।

ভবনের অপর একটি মিটিং টেবিলের জন্য চারটি চেয়ার কেনা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায়। যেখানে প্রতিটির বিপরীতে খরচ হয়েছে ৪০ হাজার টাকা।

এক ক্রয়পত্রের তথ্য মতে, ভিসির বাসভবনের আসবাব পত্র মেরামত ও সংস্কারের জন্য খরচ হয়েছে ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।

তবে রাজধানী অভিজাত ফার্নিচার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে এমন ব্যয়বহুল মিটিং চেয়ার পাওয়া যায়নি।

আক্তার ফার্নিচারের প্রস্তুতকৃত সবচেয়ে ভালো মানের চেয়ারের সর্বোচ্চ দাম ২৫ হাজার টাকা বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী সাইফুল ইসলাম। অন্যদিকে পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারের সর্বোচ্চ মূল ৩০ হাজার টাকা, জানান কোম্পানির সিনিয়র ম্যানেজার মো. আলমগীর হোসেন।



জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমিতো কোনদিন দামী দামী জিনিস ব্যবহার করিনি। আমি এ সম্পর্কে কিছু জানিনা। কারণ দামী দামী জিনিসের প্রতি আমার অতো ঝোঁকও নাই।’

‘তবে এগুলো বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে করা হয়। সংশ্লিষ্ট যারা তারা বলতে পারবে।’

গত বছরের ৮ এপ্রিল মধ্যরাতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়ে ঢাবি উপাচার্যের বাস ভবণে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়।

এতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয় তা নিরুপণ এবং মেরামতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ডীন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতু্ল ইসলামকে আহ্বায়ক করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়।

কমিটির প্রথম সভায় উপাচার্য ভবনের সিভিল কাজ, বৈদ্যুতিক ও আসবাবপত্র মেরামতের জন্য মোট ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়। এর মধ্যে আসবাবপত্রের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।

কে রাহনুমা ইভেন্টস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের উন্মক্ত টেন্ডার ছাড়া সরাসরি প্রক্রিয়ায় কাজটি দেয়া হয়।

জানতে চাইলে শিবলী রুবায়াত জানান যে তিনি আহ্বায়ক থাকলেও কাজটি দেখভাল করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগ।

‘এগুলো খুব বড় কোন বিষয় না। এসব বিষয়ে কথা বলাটা ছোট মনমানসিকতার প্রকাশ। যারা এসব তথ্য দিচ্ছে তারা খারাপ উদ্দেশ্যে এসব করছে’ বলে জানান তিনি।



খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপাচার্যের বাংলোয় আসবাবপত্র সরবরাহ ও মেরামত কাজ দেখভাল ও বিলের অনুমোদন দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আক্রাম হোসেন।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কাগজ না দেখে কিছু বলতে পারবো না। আর পুরো বিষয়টি কমিটির আহ্বায়ক বাণিজ্য অনুষদের ডীন স্যারের অনুমোদনে- করা হয়েছে।“

‘আসলে বিষয়টি কাপড়ের মান এবং কাজের মানের উপর নির্ভর করে।’

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কে রাহানুমা ইভেন্টস লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেহনুমা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমরা কোন ফার্নিচার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আসবাবপত্র ক্রয় করিনি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী নিজেরা প্রস্তুত করে দিয়েছি।’

দর সম্পর্কে জানতে চাইলে, তিনি বলেন ‘এতো বেশি দামে দেয়া হয়েছিলো কিনা আমি জানি না। তবে ওইসব চেয়ারের দাম ২৮ থেকে ২৯ হাজার টাকার বেশি হবে না।’

‘বাকি টাকা ক্রয় কমিটি পারসেন্টেজ হিসেবে যোগ করতে পারে।’


বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য আবাসিক হল এবং শিক্ষকদের আবাসিক ভবনসহ সব ধরনের আবাসিক ভবন মেরামত এবং সংস্কারের জন্য বার্ষিক বাজেটে একটি বরাদ্দ দেয়া হয়।

উপাচার্যের বাস ভবনের মেরামত কাজের ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও ভবন মেরামতের ‘আবাসিক ভবন রক্ষণাবেক্ষণ’ ব্যয় খাতের টাকায় বাস্তবায়ন করা হয়।

তবে অপর এক নথিতে দেখা যায়, ভিসির বাসভবনের জন্য মেরামত কমিটির আহ্বায়ক এবং বাণিজ্য অনুষদের ডীন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম ওই অনুষদের নয়টি বিভাগ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে চাঁদা তুলেন।

উপাচার্য ভবনে হামলার চারদিন পর তিনি বাণিজ্য অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যানেদের সঙ্গে মিটিং করেন। মিটিংয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের সকলে সহায়তা কিনে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এজন্য প্রত্যেক বিভাগ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে তুলে একটি তহবিল গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থ থাকতেও কেন চাঁদা তোলা হয়েছে জানতে চাইলে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম বলেন, ‘হামলার ঘটনার পর ভিসির বাসভবনে কোন কিছু ছিলো না। তারা যাতে অন্তত রান্না করে খেতে পারে সে জন্য আমরা আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।’

জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে এ ধরনের ব্যয়কে অস্বাভাবিক মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালটির সাবেক উপাচার্যরা।

তাদের সকলেই বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে বিব্রত বোধ করেন এবং নাম প্রকাশে অসম্মতি জানান।



নাম প্রকাশে অনিশ্চুক এমন একজন সাবেক ভিসি জানান, ‘আমি জানিনা মানুষ কিভাবে এতো নিচে নামে। আর এটা নিয়ে মন্তব্য করাটাও বিব্রতকর। আমার সময় অনেক পুরনো আসবাবপত্র ছিল। এগুলো মেরামত বা নতুন কেনার কথা ভাবিনি। একজন উপাচার্য হিসেবে শিক্ষা, গবেষণায় নজর দেয়া ছিলো আমার কাজ।’
সূত্রঃ দি ডেইলি ক্যাম্পাস