• 21 Apr
  • 03:05 PM
"রশিদ গাছী"

শারমিন রহমান 21 Apr, 19

"রশিদ গাছী" (প্রথম অংশ)

শীতের মিষ্টি সকাল। শিশির ভেজা নরম রোদ মেখে হলদে পাখি,সবুজ টিয়া লাল ঠোঁটে হেসে খুন। খেজুরের শুকনো ডালে ডালে রাতের দীর্ঘ নিরবতা উড়ে যায় ঝকঝকে আকাশের কোলে। পাখির কিচিরমিচির শব্দে প্রেম জাগে মনে, রশিদ মিয়া বউকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকে আরো কিছুক্ষণ। লেপ টেনে নেয় বুকের কাছে, টেনে নেয় বউকে। এ সময়টা বড় মায়াবী মনে হয় রশিদের, পবিত্র মনে হয়। প্রথম প্রথম বউ খুব আপত্তি করত,কে দেখে ফেলে, .এত বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকা, উঠে যেত জোর করে।কিন্তু দিন যেতে যেতে বুঝতে পেরেছে, রশিদ এ সময়টাতে অন্য রকম হয়ে যায়। যেন অন্য কোন মানুষ। ভালোবাসায় বুদ হয়ে থাকে রশিদ,যেন নেশা হয়েছে এমন। সে ভালোবাসায় কোন কাম নেই। দুজন দুজনাকে জড়িয়ে শুয়ে থাকা। মুখে কোন কথা বলেনা রশিদ তখন, চোখ বন্ধ করে বউকে বুকে জড়িয়ে থাকে। যেন বুঝে নিতে চায় হৃদয়ের সব লেনাদেনা। পড়ে নিতে চায় মধ্যবিত্তের সুখ,দুঃখ। হৃদয়ে হৃদয়ে প্রেমের উত্তাপ ছড়ায়।
একদিন সুফিয়া জানতে চায়," আপনি পাগলের মত করেন কেন বিয়ান বেলা? কতাও কন না কোন.. পোলারাও বড় অইতাছে, বুঝবার পারিনা তো কিছু আপনার ভাবসাব।"
রশিদ খুব শান্ত অথচ গভীরভাবে বলেছিল," বউ, এই বিয়ানবেলার সময়টুক আমার হারাদিনের কামের বল। তুই কোনদিন না করিস না, আমারে কিছু জিগাস না আর,আমি আর কিছু কইতে পারুম না বউ।"
না, সুফিয়া আর কোনদিন কিছু বলেনি রশিদ মিয়াকে। দরকার নেই তার কিছুর জানার। তার স্বামীর চোখে যে গভীর মমতা দেখেছে সে, নষ্ট করবেনা তা কিছুতেই। কোনদিন না।

বালিকাচায় বালি ছিটিয়ে ,দা, ছ্যান এ ধার দেয় রশিদ। মোটা চালের পান্তা ভাত, রাতের জমে যাওয়া লাউ আর শোল মাছের তরকারির সাথে শুকনো মরিচ পোড়ানো দিয়ে এক থালা ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়ে রশিদ। সাথে নেয় দড়া, ঠুঙ্গি, পাওট। ঠুঙ্গির ভেতরে রশিদ গাছির পিছন থেকে উকি মারে সদ্য শান দেওয়া দা, ছ্যান। ব্যাপারির বাগে, মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে গাছ ঝোড়ে রশিদ। গাছ ঝুড়লে খেজুরের সব ডাল রশিদ নেবে এভাবেই মালিকের সাথে শর্ত করে নেয়। খেজুরের পাতা বেছে বেছে ভালোগুলো দিয়ে দেয় সুফিয়াকে, অন্যগুলো রোদে শুকিয়ে রেখে দেয়। রস জ্বাল দিতে তার অনেক কাঠ লাগে।
সুফিয়া সে পাতা বেছে খেজুর পাটি বোনে।কাজ সেরে সময় পেলেই বসে যায় পাটি বুনতে। রাতে কুপির আলোতেও বোনে খেজুর পাটি। আশেপাশের ভাবিরাও বিকেল হলে উঠানের কোনে বসে খেজুর পাটি বোনে আর গল্প করে। সুফিয়া বাজার থেকে দুই,চার টাকার রং আনায় ছেলেকে দিয়ে,গুলিয়ে খেজুর পাটির খোপে খোপে নকশা করে বসিয়ে দেয় রং।
গাছ ঝোড়ার পাঁচদিন পরে রশিদ তরতর করে একটার পর একটা খেজুর গাছে উঠে যায়। পাওট টা বেঁধে নেয় শক্ত করে গাছের সাথে, পাওটের উপর দাঁড়িয়ে চেছে তেলতেলে করে নেয় গাছ। হাড়িগুলো ধুয়ে চুন মেখে রোদে শুকাতে দেয় রশিদ। বাঁশ কাটে, চেছে চেছে নালি বানায়,যতগুলো গাছ তার থেকে কয়েকটা বেশি নালি বানিয়ে রাখে রশিদ। পরের দিন সকালে ঠুঙ্গির মধ্যে নালি, একটা ছোট কাঠ, দাা,ছ্যান নিয়ে হাতে হাড়ি নিয়ে গাছে ওঠে রশিদ। পাওট বেঁধে নেয় শক্ত করে। পাওটের উপর দাঁড়িয়ে নালি বসিয়ে দেয় খেজুর গাছে,৷ ছোট কাঠ দিয়ে ঠক ঠক বাড়ি মারে নালিতে। গেরস্ত ঘরে বসে ঠক ঠক আওয়াজে বুঝতে পারে রশিদ গাছি গাছে নালি বসায়...তার মানে কাল রস পাওয়া যাবে। সবার মনে আনন্দ,একটা নতুন ভোরের অপেক্ষা।
পরের দিন বাবার সাথে জামাল, কামালও আসে রস পাড়তে। বাবা একটার পর রসের হাড়ি নামায়। গেরস্তের সাথে রসের ভাগ হয়। যে হাড়িগুলোতে রশিদ ভাগের রস রাখে তার যে কোন পছন্দমত একটা হাড়িতে পাটকাঠি ভেঙ্গে পাইপ বানিয়ে চুমুক দেয় জামাল, কামাল।রশিদ মিয়া হাক ছাড়ে, " কি করোস, কি করোস বাজান তোরা, বাড়ি নিয়া ছেইকা খাইস! কত মাছি পড়ছে ভিতরে দেহোস না?"
জামাল আর কামাল হেসে কুটি কুটি। হাড়ির বেশি অর্ধেক রস ওরা খেয়ে ফেলেছে ততক্ষণ।সুফিয়া বাইন লেপে রাখে আগেরদিন বিকেলে, খোলা ধুইয়ে শুকিয়ে রাখে। শুকিয়ে রাখে সাদা বড় বড় দু তিনটে সুতি শাড়ি।রশিদ মিয়া রস নিয়ে বাড়ি আসে। রস ছেঁকে নেয়ার জন্য ছাকনি ধরে সুফিয়া বাইনের ওপর। রশিদ এক এক করে রস ঢেলে দেয় ছাকনির উপর। খোলা প্রায় ভরে আসে। হাড়ির দিকে তাকিয়ে রশিদ বলে" বউ,মগ নিয়া আয়, হগ্গলে মিইল্যা কাচা রস খাই। দেখ কি মিডা রস। আল্লাহ কি না পারে ক দেহি! "
রোদে পিঠ ঠেকিয়ে রসের মগে মুড়ি ভিজিয়ে খায় সবাই। কেউ কাচা রসের অর্ডার দিলে তার জন্য রেখে দেয় হাড়িতে।এক হাড়ি রস ৫০ টাকা দেয়।
জ্বলে ওঠে বাইন। রস নাড়তে থাকে সুফিয়া, একটা সময় ঘন হয়ে আসে রস। বাতাসে মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে।এবার সুফিয়া,রশিদ পালাক্রমে নাড়তে থাকে খোলার রস। নাড়া থামানো যাবেনা, থামলেই নিচে ধরে যাবে রস, গুড়ে পোড়া গন্ধ হয়ে যাবে। হাত লেগে আসে সুফিয়ার তবুও থামেনা। রশিদ বুঝতে পারে সুফিয়ার কষ্ট।বউয়ের হাত থেকে নিয়ে নেয় নাড়ানি। সুফিয়া চিৎকার করে," ওঠে ফোট উঠছে,ফোট উঠছে। রসে ফোট উঠছে। "
এবার আরো দ্রুত নাড়তে থাকে রশিদ,শীতের সকালেও দরদর করে ঘামতে থাকে। জামাল, কামাল, প্রতিবেশির ছেলেমেয়ারা দাঁড়িয়ে থাকে একটু দূরে। ফোট উঠছে শুনেই ওর হাততালি দিয়ে ওঠে। সুফিয়া চামচ দিয়ে ফোট ওঠা রস উঠিয়ে পাশেই রাখা পানির মধ্যে ফেলে দেয় গুনে গুনে। ছেলেমেয়রা দৌড়ে এসে পানি থেকে তুলে নেয় একটু জটা। জটার লোভেই দাঁড়িয়ে থাকে ওরা প্রতিদিন। রশিদ সুফিয়াকে কাপড় পেতে নিতে বলে। সুফিয়া মাটির তৈরি সাজের উপর ধোয়া সাদা সুতি শাড়ি বিছিয়ে নেয়। রশিদ ঘন হয়ে আসা গরম রস সাজে সাজে কাপড়ের ওপর ঢেলে দেয় এক এক করে। অপেক্ষা করে ঠান্ডা হওয়ার জন্য। ঠান্ডা হলে কাপড় থেকে টেনে তোলে খাঁটি পাটালি গুড়।


ঃ মিয়া, ২০ কেজি গুড় কিন্তু দিতেই হবে তোমার। তার মধ্যে ১৫ কেজি পাটালি , আর ৫ কেজি দাও নারকেল গুড়। তুমি বুড়া মানুষ তাই তোমারে বেশি চাপ দিলাম না।টাকার কথা চিনতা কইরো না তুমি।
ঃ মাতা খারাপ নি আপনাগো? এত মিডাই আমি কুনহানেরতা দিব। আমিতো রসে কোন চেনি মিশ করি না। আমার মিডাইর নাম আছে হগল জাগা। আমি এত মিডাই দিবার পারুম না বাজান।আর নারকেল দিয়া মিডাই বানানো ছাইড়া দিছি হেই কবে!
ঃ রশিদ মিয়া, তুমি মনে অয় আমারে চিনবার পারো নাই।না চেনার ই কথা।আসা হয় না গ্রামে বেশি। শোনো, পরিষ্কার কইরা শুইনা রাখো নেতারে কথা দিছি নারকেল গুড় আর পাটালি পাঠাবো.. সব জায়গায় ভেজাল আর ভেজাল। তোমার গুড় এখনো খাঁটি আছে।নেতারে খাঁটি খেজুরের গুড় না দিলে মান থাকবে,, কও মিয়া?
ঃ দেহো বাজান,আমি এত কম সময়ের মধ্যি তোমাগো মিডাই দিয়া পারব না।আর কুনো জাগা দেহো পাওনি।বয়স হইছে আমাগো।তুমার চাচীরও অসুখ।মিডাই আমি পারবনা দিবার।
ঃ আরে বুড়া, কথা এত প্যাচাস কেন? গুড় চাইছি দিবি।হ, সময় পাঁচদিন।মনে থাকে যেন সময় পাঁচদিন।কোন নড়চড় যেন না হয়!

১০০০ টাকার ২ টা নোট রশিদ গাছির মুখের উপর ছুড়ে দিয়ে, শীতের সকালের শিশিরভেজা ঘাস মাড়িয়ে, বাতাসে ধোঁয়া ছড়িয়ে ছুটে চলল ১০টা বাইক।রশিদ মিয়া পঞ্চাশে পা দেয়া বউয়ের মুখের দিকে অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকে।

আড়িয়ালখার পাড় ঘেষে কৃষ্ণপুর চরে বড় খেজুরের বাগান। বাগানের এককোণে খেজুর পাতার ছাউনি দিয়ে বানানো ঘুপচি।ঘুপচির মাটিতে খড় বিছানো, তার উপর একটা খেজুর পাতার পাটি পাতা। তারই একপাশে তিন চারটা ছেঁড়া কাথা, তেল চিটচিটে দুটো বালিশ। ঘুপচিতে ঢুকতে গেলে মাথা নিচু করে কুঁজো হয়ে ঢুকতে হয়।দরজার কড়াটাও খেজুরের পাতা, আর পাঠকাঠি দিয়ে বানানো। ঘুপচির মুখেই দুটো ইটের উপরে একটা মোটা তক্তা রাখা। সেখানে ভাতের পাতিল,কড়াই,জগ, দুটো টিনের থালা গুছিয়ে রাখা। মাথার উপরে একটা রশি টানানো,সেখানে পুরনো দুটো কাপড়,লুঙ্গি গামছা ঝুলছে।
এই চরের কয়েক মাইলের ভেতর কোন বাড়ি নেই। এ বাগানে এখন ১০০ র মত খেজুর গাছ আছে।আগে অনেক বেশি গাছ ছিল। বাগানের ভেতরে মানুষের চলাচলের অভাবে তৈরি হয়েছে শন,লতাপাতা, বুনো গাছপালার জঙ্গল। সেই জঙ্গলের কিছুটা অংশ পরিষ্কার করে রশিদ মিয়া এই ঘুপচি তৈরি করেছে।এখানেই শীতের সময়টা বউকে নিয়ে কাটিয়ে দেবে।তিন বছর থেকে এটাই করে আসছে সে। শীত শেষ হলে নিজের ভিটেয় ফিরে যায় রশিদ মিয়া। সেখানে তার দুইছেলে বউ, ছেলেমেয়ে নিয়া থাকে। দুইছেলে দুইপাশ দিয়ে বেড়া দিয়ে আটকে দিয়েছে। মাঝখানে রশিদ গাছি আর তার সুফিয়া থাকে।বুড়া বুড়ির সংসার। ওখানে থাকতে ভালো লাগে রশিদ মিয়ার। মুখ দেখা না গেলেও ওদের কথাবার্তা সব শুনতে পাওয়া যায়। এইতো সেদিন,এ চরে আসার কয়েকদিন আগের কথা..বাজার থেকে তিন কেজি ইলিশ মাছ কিনে এনেছিল জামাল। তাই নিয়ে ওর বৌর কি রাগ.এত টাকা নষ্ট করেছে বলে। চিৎকার করে বলছিল, " এত মাছ দিয়ে কি বাবা মায়ের শ্রাদ্ধ করবা তুমি?" জামালও বাবা মায়ের শ্রাদ্ধ করতে চায়নি বলে মাছ প্রতিবেশিদের কাছে অর্ধেক বেঁচে দিয়েছিল।সব কথা শুনতে পাওয়া যায় রশিদের ভিটে থেকে।সন্তান পাশেই আছে, ভালোই আছে এটাই সুখ রশিদের।

বাকি অংশ পরবর্তী পর্বে.....